Home » স্ত্রীকে স্বামীর ধর্ষণ নিয়ে আইনি বিতর্ক চলছেই

স্ত্রীকে স্বামীর ধর্ষণ নিয়ে আইনি বিতর্ক চলছেই

সময় কলকাতা ডেস্ক,২৬ ডিসেম্বর :

বৈবাহিক ধর্ষণের বিষয়ে কর্ণাটক সরকারের অবস্থান নিয়ে আলোচনা আইনের ক্ষেত্রে কার্যত এক বৈপ্লবিক রূপ  নিতে চলেছে।কর্ণাটক সরকারের বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ রুপে স্থির করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় এসে পৌঁছেছে এবং বর্তমানে প্রয়োজনীয় আলাপচারিতা ও শুনানি আদালতে উল্লেখযোগ্য মোড় নিচ্ছে। রাজ্য সরকারের অবস্থান এই বিতর্কে একটি স্বাগত হস্তক্ষেপ যখন কেন্দ্র এখনও আইন প্রণয়ন করার বিবেচনা করছে।সমস্যাটি জটিল, বিশেষ করে যেহেতু এই বিষয়ে প্রভাবশালী সামাজিক ঐকমত্য  বিবাহকে এতদিন একটি রক্ষণশীল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে এসেছে।

সম্প্রতি  কর্ণাটক সরকার তার স্ত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে একজন বিবাহিত পুরুষকে বিচারের মুখোমুখি করার সমর্থনে এগিয়ে আসে।সুপ্রিম কোর্টের সামনে দায়ের করা একটি হলফনামায়, রাজ্য সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা এই বছরের মার্চ মাসে কর্ণাটক হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের সাথে একমত নয়, আইনের ব্যতিক্রমকে অস্বীকার করে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীর দায়ের করা ধর্ষণের অভিযোগ বাতিল করতে অস্বীকার করে। যদিও মার্চ মাসে  কর্ণাটক হাইকোর্ট  একটি উল্লেখযোগ্য রায় দান করেছিল। মার্চ মাসে কি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল কর্ণাটক হাইকোর্ট?

মার্চ মাসে কর্ণাটক হাইকোর্টের বিচারপতি এম নাগপ্রসন্ন তাঁর নির্দেশে বলেন,” বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি পুরুষকে বন্য জন্তুর মতো আচরণ করার কোনো বিশেষ ছাড়পত্র দেয়নি, দিতে পারে না, আমার মতে দেওয়া উচিতও নয়।” তিনি আরও বলেন,পুরুষের ক্ষেত্রে যদি কোনো আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয়ে থাকে, তা হলে সেই পুরুষ স্বামী হলেও তাঁর শাস্তি হওয়া উচিত।একই সঙ্গে হাইকোর্ট অবশ্য এ কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, বৈবাহিক ধর্ষণ অপরাধ বলে গণ্য হওয়া উচিত কি না, সে ব্যাপারে এখানে কিছু বলা হচ্ছে না। সেটা স্থির করার কাজ আইনসভার। একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছেন, আদালত তার চার্জ গঠনের ব্যাপারেই মতামত জানাচ্ছে। যদিও এর পাশাপাশি আদালত তার নিজ দৃষ্টিভঙ্গি খুব গোপনও রাখেনি।
বিচারপতি বলেন, স্বামীর দ্বারা যৌন নিগ্রহের ঘটনা একজন স্ত্রীর জীবনে গুরুতর ছাপ ফেলে। তার শরীর ও মনে এর প্রভাব পড়ে। তার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়। তাই তার মতে, আইনপ্রণেতাদের উচিত ‘স্তব্ধতার কণ্ঠস্বরকে’ শোনা।বিচারপতি নাগপ্রসন্ন বলেন, দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় স্বামীকে ছাড় দেওয়ার বিষয়টিকে তিনি ‘পশ্চাদ্‌মুখী’ বলে মনে করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে নারী ও পুরুষের সমানাধিকার স্বীকৃত আছে। স্ত্রী বলে তার শরীর ও মনের মালিক নন স্বামী। সুতরাং যে কাজ অন্য পুরুষ করলে অপরাধ, তা স্বামী করলে আইনসম্মত হওয়া উচিত নয়।

 

এই মামলায় ৩৭৫ ধারাকে সামনে এনেই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন স্বামী। অন্য দিকে স্ত্রী অভিযোগ এনেছিলেন ৩৭৬ (ধর্ষণ) এবং ৩৭৭ (অপ্রাকৃতিক যৌন আচরণ) ধারায়। দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞা নির্ধারিত আছে। ৩৭৬ ধারায় রয়েছে ধর্ষণের শাস্তিবিধান। ৩৭৫ ধারায় ব্যতিক্রম-তালিকা ২-এ ধর্ষণের আওতা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে স্বামীকে। এই মামলায় স্বামীর আইনজীবী হাসমত পাশা সেই যুক্তিই দিয়েছিলেন হাইকোর্টে। কিন্তু বিচারপতি বলেন, কোনো ছাড়ই নিরঙ্কুশ হতে পারে না।

স্ত্রীর অভিযোগ ছিল, বিয়ের পর থেকেই স্বামী তাকে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। এমনকি, কন্যার চোখের সামনেও তিনি স্ত্রীকে অপ্রাকৃতিক যৌন আচরণে লিপ্ত হতে বাধ্য করেছেন। বিশেষ আদালত তার অভিযোগের ভিত্তিতে স্বামীর বিরুদ্ধে ৩৭৬, ৪৯৮ক, ৫০৬-সহ একাধিক ধারায় চার্জ গঠন করেছিল।

ভারতীয় দণ্ডবিধির 375 ধারা যা ধর্ষণকে সংজ্ঞায়িত করে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম তৈরি করে: “কোন পুরুষের তার নিজের স্ত্রীর সাথে যৌন মিলন বা যৌন ক্রিয়াকলাপ, স্ত্রীর বয়স আঠারো বছরের কম নয়, ধর্ষণ নয়।”বিবাহিত পুরুষদের জন্য এই অনাক্রম্যতা একজন স্ত্রীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের করতে বাধা দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে কর্ণাটক হাইকোর্টের রায় একটি নতুন রেখা এঁকেছে।বিদ্যমান আইনকে স্বীকার করে বিচারপতি এম নাগপ্রসন্নের আদেশ বিধানের পিছনে “বয়স-পুরাতন…পশ্চাদপন্থী” চিন্তাভাবনা কাজ করেছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে,রায়ে আইন প্রণেতাদের ” স্তব্ধতার  কণ্ঠস্বর” শোনার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং অভিযুক্ত স্বামী হলেও “ধর্ষণ একটি ধর্ষণ” বলে ধরে রেখেছে।

সুপ্রিম কোর্ট কর্ণাটক হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেছে কিন্তু মামলাটি বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে বিতর্ককে পুনরুজ্জীবিত করেছে।এই রায়ের আগে, 2018 সালে, গুজরাট হাইকোর্টও বৈবাহিক ধর্ষণের অনাক্রম্যতা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিল কিন্তু বিবাহিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ বাতিল করে দেয়।
এই বছরের মে মাসে, দিল্লি হাইকোর্ট একটি এরকম মামলায় এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ গ্রহণ  করা হয়।দিল্লি হাইকোর্ট এই মামলায় একটি বিভক্ত রায় প্রদান করে যেখানে এটি বৈবাহিক ধর্ষণের অনাক্রম্যতার সাংবিধানিকতা পরীক্ষা করে।সুপ্রিম কোর্ট কর্ণাটক হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেছে কিন্তু মামলাটি বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে বিতর্ককে পুনরুজ্জীবিত করেছে।।

 

About Post Author