সময় কলকাতা ডেস্ক, ৮ জানুয়ারি: ধীরে ধীরে তলিয়ে যেতে বসেছে হিমালয়ের বুকে গজিয়ে ওঠা জনপদ যোশীমঠ। বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই ভারত চীন সীমান্তবর্তী রাস্তা সহ বাড়িঘর হোটেল ,অফিসে দেখা দিয়েছে ফাটল। এক একটা দিন যাচ্ছে আর ফাটল ক্রমশ চওড়া হচ্ছে। আর সেই সঙ্গে চওড়া হচ্ছে কপালে চিন্তার ভাঁজ। কিন্তু কেন এই অবস্থা? কি হতে পারে যোশীমঠের অবস্থা? এ প্রশ্নই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের মনে?
যোশী মঠ, হিমালয়ের কোলে বেড়ে ওঠা একটি জনপদ। উত্তরাখন্ড রাজ্যের চামোলী জেলার এই জনপদ নৈসর্গিক দৃশ্যে ভরপুর। ৬১৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই জনপদ কার্যত হিমালয়ের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার গেট ওয়ে। বদ্রিনাথ তীর্থযাত্রীদের প্রথম বেস ক্যাম্প হয় এই যোশী মাঠে। তীর্থযাত্রীদের আগমন যত বেড়েছে ততই হিমালয়ের বুকে আস্তে আস্তে বড় হয়েছে এই যোশী মঠ অঞ্চল। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে প্রকৃতির রোষের কারণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে যোশীমঠ। কার্যত আস্ত একটি জনপথ তলিয়ে যেতে বসেছে হিমালয়ের গর্ভে।
সম্প্রতি ফাটল ধরেছিল ভারত চীন সীমান্তবর্তী সংযোগকারী রাস্তায়। বিগত এক সপ্তাহের মধ্যে যোশী মাঠের একাধিক বাড়ী রাস্তাঘাট মন্দির মসজিদসহ অফিস আদালতেও দেখা দিয়েছে ফাটল। প্রতিদিন সেই ফাটল ক্রমশ চওড়া হচ্ছে। যোশীমঠ মলারি সড়কে যে ফাটল দেখা দিয়েছে বিশেষজ্ঞদের মতে সেই রাস্তা তলিয়ে যেতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। ইতিমধ্যেই বিশেষজ্ঞদের তিনটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বিশেষজ্ঞরা সরকারকে জানিয়েছে অবিলম্বে যোশীমঠ থেকে সাধারণ মানুষদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত অন্যত্র। পাশাপাশি ভেঙে ফেলে দেওয়া উচিত সেই সমস্ত বাড়িঘর, যে বাড়িঘরে ইতিমধ্যে দেখা দিয়েছে ফাটল। যোশীমঠ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভূবিজ্ঞানীরাও। হিন্দু ধর্ম নেতা দাবি করেছেন, যোশীমঠের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে, কেন্দ্রের উচিত জাতীয় বিপর্যয় হিসেবে ঘোষণা করা। যোশীমঠ এর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি। বর্তমানে কি অবস্থা যোশীমঠের।
পুরসভার হিসেব অনুয়ায়ী এখনও পর্যন্ত ৫৬১ টি বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে এবার তা ক্রমশ বড় হচ্ছে। এর মধ্যে ১৫৩ টি বাড়ি রবিগ্রামে, ১২৭টি বাড়ি গান্ধীনগরে, ৭১টি বাড়ি মনোহরবাগে, ৫২টি গাড়ি শিংধরে, ৫০টি বাড়ি পারসারে, ২৯টি বাড়ি আপা বাজারে, ২৭টি বাড়ি সুনীলে, ২৮টি বাড়ি মারওয়াড়িতে, ২৪টি বাড়ি লোয়ার বাজারে। আর এখানেই প্রশ্ন উঠছে কেন এমন অবস্থা হল? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ের এই এলাকাটি সিসমিক জোন ভি-তে পড়ে। তাই এসব এলাকা ধস প্রবণ। আবার একদল বিশেষজ্ঞের মতে যোশীমঠ যে জায়গায় অবস্থিত, অতীতে সেই জায়গায় প্রবল ধস নেমেছিল। অর্থাৎ ধসের উপরেই তৈরি হয়েছিল যোসীমঠ। আবার একদল বিশেষজ্ঞর মতে অপরিকল্পিত নগর উন্নয়নের জন্য যোশীমঠ অঞ্চল তার ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছে না। শহরের তলায় বিভিন্ন জলের লাইন অপরিকল্পিত হওয়ার কারণেও শহরটি ধসপ্রবণ হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি একটি ট্যানেল তৈরি হচ্ছে সেই ট্যানেলের কারণেও শহরটি অধিক মাত্রায় ধস প্রবন হয়ে পড়েছে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের। ওপরে একদম বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে শহরে দেখা দিয়েছে ফাটল। শহরাঞ্চল বৃদ্ধির জন্য যত্রতত্র কেটে ফেলা হয়েছে গাছ। বৃক্ষ নিধনের কারণে ধসপ্রবণ এলাকায় মাটির ধারন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় শহরটি ধস প্রবণ হয়ে পড়েছে। যোশীমঠ পৌরসভার চেয়ারম্যান শৈলেন্দ্র পাওয়ার জানিয়েছেন সাধারণ মানুষদের সতর্ক করা হচ্ছে পাশাপাশি এখনও পর্যন্ত ২৯ টি পরিবারকে স্থানান্তর করা হয়েছে। জোশীমঠ অঞ্চল পরিদর্শন করার পর মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানিয়েছেন যে সকল পরিবারকে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার কথা চিন্তা করছে সরকার। রবিবার সকালেও ভারতীয় সেনার ক্যাম্পেও দেখা দিয়েছে ফাটল ফলে প্রবল চিন্তায় সেনাবাহিনীর জওয়ানরা।
ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে তাহলে কি দেবভূমি যোশীমঠে প্রলয় আসন্ন? কারণ পুরান মতে যেদিন মহাবলী বজরংবলীর হাতে ফাটল দেখা দেবে সেদিনই হবে দেব ভূমির শেষ দিন? ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের মধ্যে জল্পনা শুরু হয়েছে তাহলে কি শেষ দিন আসন্ন দেব ভূমির? যদিও পৌরাণিক এই মতকে গুরুত্ব দিতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা তাদের মতে অবিলম্বে যোশীমঠ থেকে সাধারণ মানুষদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত অন্যত্র, পাশাপাশি ভেঙে ফেলে দেওয়া উচিত সেই সমস্ত বাড়ি ঘর যা প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে নষ্ট করছে। ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে। যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে কেন্দ্র ও রাজ্যের অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণেই আজ বিপন্ন হতে চলেছে যোশীমঠ। পরিকল্পনা চলছে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলা করার। কিন্তু রয়ে যাচ্ছে একাধিক প্রশ্ন। এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কারা রাজ্য -কেন্দ্র প্রশাসন নাকি সাধারণ মানুষের অপরিকল্পিত চিন্তাধারা। পশ্চিমবঙ্গের শৈল শহর দার্জিলিঙে ও ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে, অপরিকল্পিত নির্মাণ। আগামী দিনে কি আমাদের রাজ্যে ও এই পরিস্থিতি তৈরি হবে ? সে ভাবনাই ভাবতে শুরু করেছে দার্জিলিংয়ের সাধারণ মানুষ?


More Stories
বিজেপি বিপক্ষ দল ভাঙাতে কত কোটি টাকা দিচ্ছে বলে অভিযোগ?
আক্রান্ত হলেন ককরোচ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে
ভারতে তেলের দাম কি কমছে?