পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :মনীষীদের মধ্যে মৈত্রী ও মতান্তরের রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস।কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যেও ছিল মৈত্রী, হয়েছিল মতান্তর। তাঁদের মধ্যে বিরোধ থাকলেও মানসিক সংঘাতের সে অর্থে বহিঃপ্রকাশ ছিল না। জানতেন শুধু মুষ্টিমেয় কাছের মানুষ। দুই মনীষীর স্নেহের পাত্র ছিলেন অপর এক মনীষী দিলীপকুমার রায় ।দুই দিকপাল মহাপুরুষের সংঘাত থামাতে উদ্যোগী হয়েছিলেন কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সুযোগ্য পুত্র দিলীপকুমার রায়।তাঁর প্রচেষ্টায় আপাতদৃষ্টিতে সখ্যতা গড়ে উঠলেও থেকে গেছিল মানসিক দূরত্ব।

১৮৯৭ সালের ২২ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন দিলীপ কুমার রায়। তিনি ছিলেন প্রকৃতঅর্থেই এক প্রতিভাধর বিস্ময় পুরুষ। একাধারে তিনি ছিলেন সঙ্গীত সাধক তথা গায়ক,সাহিত্যিক, বিজ্ঞান মনস্ক এবং ঋষিসুলভ মনীষী।তাঁর বিখ্যাত বই যথা মধুমুরলী, বহুবল্লভ, স্মৃতিচারণ, অঘটন আজো ঘটে প্রভৃতি আজও পাঠকের কাছে সমাদৃত।১৯১৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিতে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি। অতঃপর ক্রেমব্রিজ কলেজে যান গণিতের উচ্চ শিক্ষা নিতে।ফরাসি জার্মান ইতালিয় ভাষা শিক্ষা ও পাশ্চাত্য সংগীত শেখেন। ১৯২২ সালে দেশে ফিরে আব্দুল করিম খাঁ, ফইয়াজ খাঁ, পন্ডিত ভাতখন্ডের তালিম নেন দিলীপকুমার।১৯২৮ সালে পুঁদুচ্চেরির অরবিন্দ আশ্রমে যান। অরবিন্দ প্রয়ানে আশ্রমও ছাড়েন।নেতাজি সুভাষ ছিলেন দিলীপ কুমারের বাল্য বন্ধু।দেশনায়ক জহরলাল ছিলেন তাঁর কাছের মানুষ, ছিল সুসম্পর্ক।
বিভিন্ন ঘরানার গানে প্রথা ভেঙে তিনি স্বতন্ত্র রীতির যেন ছিলেন প্রবর্তক।তার রেকর্ড করা গানের সংখ্যা প্রায় ১০০। তিনি ধরাবাঁধা গতে রচনা বা গানে বিশ্বাসী ছিলেন না,তিনি ছিলেন নতুনের দিশারী।তথাপি রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র উভয়েই তাঁর লেখার সমালোচনা করলেও তাঁর গানের গুনমুগ্ধ ছিলেন যার উল্লেখ মেলে দিলীপকুমারের আত্মকথনে।

দিলীপ কুমার রায়ের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়,রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র সম্পর্কে বলেছিলেন যে কথাসাহিত্যিক গল্প ভালো জমাতে পারেন।তাঁদের সুসম্পর্ক থাকলেও বিধাতা যেন অলক্ষ্যে হেসেছিলেন।রবীন্দ্রনাথ – শরৎচন্দ্রের সংঘাতের সূত্রপাত হয় গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনকে ঘিরে। রবীন্দ্রনাথ অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন করেন নি।কবিগুরুর অসহযোগ আন্দোলন বিরোধিতার তীব্র প্রতিবাদ করেন শরৎচন্দ্র। রবীন্দ্রনাথ সরাসরি কিছু বলেননি।পরবর্তীতে শরৎচন্দ্রের “পথের দাবী” বাজেয়াপ্ত হওয়ার পরে শরৎচন্দ্র চেয়েছিলেন তাঁর পক্ষে সহায়ক ভূমিকা নিন রবীন্দ্রনাথ। সে বিষয়ে তিনি কবিগুরুর শরণাপন্ন হন। রবীন্দ্রনাথ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন শরৎচন্দ্রের আবেদন।চিরতরে দূরত্ব তৈরি হয় ও তার অবসানে উদ্যোগী হন দিলীপকুমার রায়।

সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু এসময় রবীন্দ্রনাথকে শরৎচন্দ্রের চেয়ে বড় মাপের ঔপ্যনাসিক বলে বর্ণনা করলে শরৎচন্দ্র এবিষয়ে বলেন- কে বড় কে ছোট তা নিয়ে তিনি কখনও ভাবেন নি এবং রবীন্দ্রনাথের প্রতি সাহিত্যিক হিসেবে সম্মান প্রদর্শন করেন। ইতিপূর্বেও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে শরৎচন্দ্র তাঁর গুনমুগ্ধ দিলীপ কুমার রায় কে বলেছিলেন যে কবিগুরু বড় মনের মানুষ। জনৈক সমালোচককে তিনি বলেছিলেন,”আমি লিখি তোমাদের জন্য, আর রবীন্দ্র নাথ লেখেন আমাদের জন্য।”
দিলীপকুমার রায় ” নিষ্কৃতি ” র অনুবাদের পূর্বে রবীন্দ্রনাথকে শরৎচন্দ্রের রবীন্দ্র প্রসঙ্গে মূল্যায়ন জানান। রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র সম্পর্কে প্রশংসাসূচক বাক্য লেখেন।কবিগুরু দিলীপকুমার কে বলেন তিনি জানতেনই না বুদ্ধদেব বসুর সমালোচনার কথা।তথাপি আমৃত্যু দুঃখ রয়ে গেছিল শরৎচন্দ্রের মনে।তিনি দিলীপকুমারের কাছে স্বীকার করেন, “রবীন্দ্রনাথকে যৌবনে এক আধটা আক্রমণ করেছি বটে “। যৌবনের ভুলের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করে তিনি দিলীপকুমার রায়কে পরামর্শ দেন,” কাউকে ব্যথা দিও না।’
মুখে যাই বলুন -রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাখ্যান-জনিত ব্যথা বড় নিদারুনভাবে বেজেছিল শরৎচন্দ্রের মনে। এ প্রসঙ্গে দিলীপ কুমার রায়ের উক্তি স্মরণীয়,” মহাজনের ব্যাথা মহৎ হয়ে থাকে। ”

মৈত্রী- মতান্তরের ঘটনাক্রমের পরিসমাপ্তিতে শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর পরে সমালোচকদের লেখায় রবীন্দ্রনাথ ব্যথিত হয়েছিলেন তাঁর উল্লেখ মেলে দিলীপকুমার রায়ের লেখায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্নেহাস্পদ দিলীপকুমার রায়কে বলেছিলেন, “শরৎ আমার আগে চলে গিয়ে আমায় শুধু ব্যাথাই দেয় নি দিলীপ, ভয় পাইয়ে দিয়েছেও কম নয় “.. শরতের দুর্দশা দেখে মনে হয়.. ম’লেও আমার বুঝি হাড় জুড়োবে না, আমার মুখেও না জানি কত শত লোক কত কথা চাপিয়ে দেবে, তখন আমার প্রতিবাদ করারও জো-টি থাকবে না তাই আমার মরতে ভয় করে সত্যি বলছি।”।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
বেজি কি সাপের বিষে কাবু হয় না?