Home » নেতাজি সুভাষচন্দ্রের প্রেম ও দাম্পত্য রসিকতা

নেতাজি সুভাষচন্দ্রের প্রেম ও দাম্পত্য রসিকতা

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা  :নেতাজি সুভাষচন্দ্রের প্রেম ও দাম্পত্য জীবনের চৰ্চা আজও অব্যাহত। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও তাঁর স্ত্রী এমিলি শেঙ্কল বহু দূরথেকে তাঁদের জীবনচর্চা ও পরিশিলীত যে জীবন যাপন করেছিলেন তা নেতাজির জন্মের ১২৫ বছর পরেও প্রাসঙ্গিক। স্বাধীন ভারতের স্বপ্নে বিভোর সংগ্রামী নেতাজি সুভাষচন্দ্রের জীবনে প্রেম ও টুকরো হাসির উৎস হয়ে এসেছিলেন এমিলি। ভিন দেশের দুই বাসিন্দা জুড়ে গেছিলেন হৃদয়ে। তাঁদের আলাপচারিতায় থাকত হাল্কা হাস্যরসের অনুভূতিও ।

“‘ আমরা অস্ট্রিয়াতে নতুন শিলিং পাচ্ছি রবারের তৈরি। কেউ একজন জিজ্ঞেস জিজ্ঞেস করলেন, “কেন?”..” দেখুন কারণ ওগুলো আপনি খুশিমত টেনে বাড়াতে পারেন। আর যদি শিলিং পড়ে যায় তো পড়ার শব্দ ও শুনতে পাবেন না। রসিকতার উৎস হচ্ছে এই যে শোনা যাচ্ছে শিলিং-এর দাম পড়ে যাওয়ার কিছুটা সম্ভাবনা আছে। “নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর জানতে চাওয়া রসিকতার উত্তরে ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বর মাসের চিঠিতে ভিয়েনা থেকে এমনটাই লিখেছিলেন এমিলি শেঙ্কল। তাঁদের বৈবাহিক জীবন ভরে ছিল এরকমই নির্মল আনন্দে যার বহিঃপ্রকাশ ও প্রমাণ এভাবেই বারবার মিলেছে। সুক্ষ রসবোধ ও রঙ্গ রসিকতার আভাস মিলেছে তাঁদের একে অন্যকে লেখা চিঠিতে।তবে তাঁদের পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার মুলে ছিল উভয়ের ভারতপ্রেম।তীব্র দেশাত্মবোধের মধ্যেও জীবনকে উপলব্ধি করার বিষয় প্রকাশ পেয়েছে তাঁদের উল্লেখ করা হাস্য পরিহাসে।

উল্লেখ্য,সুভাষ চন্দ্র বসু ও এমিলি শেঙ্কল পরস্পরের সাথে পরিচিত হওয়ার প্রায় সাড়ে তিনবছর পরে বিয়ে করেন। ১৯৩৪ সালের জুন মাসে ভিয়েনাতে তাঁদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়।, কৃষ্ণা বসুর লেখা থেকে জানা যায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সঙ্গী এ সি এন নামবিয়ারের ভাষায় নেতাজি ছিলেন এক ভাবনার মানুষ এবং তা হচ্ছে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা। নামবিয়ারের মতে, ” ব্যতিক্রম কেবল – যদি ব্যতিক্রম শব্দটি ব্যবহার হয় – মিস শেঙ্কলের প্রতি ভালোবাসা। দেখুন উনি সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন ছিলেন, মগ্ন ছিলেন এমিলির প্রতি ভালোবাসায়। ”

সুভাষ চন্দ্র বসু জন্মেছিলেন ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি। তাঁর বয়স যখন চল্লিশ অতিক্রম করেছে তখন তিনি অস্ট্রিয় তরুণী এমিলিকে বিয়ে করেন। পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী,১৯৩৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর সুভাষচন্দ্র ও এমিলি গোপনে বিয়ের পর্ব সম্পন্ন করেন। এমিলির বয়স তখন ২৭।বসু পরিবারের তরফে জানতে চাওয়া হয়েছিল কেন বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছে? এমিলি শেঙ্কল এর ব্যাখ্যায় বলেন, সুভাষচন্দ্রের কাছে ‘ দেশই ছিল ‘প্রথম ‘ তাই জনসমক্ষে বিষয়টি ঘোষণা করলেই অপ্রয়োজনীয় হইচই হবে।
এক জায়গায় এমিলি লিখেছেন যে- ব্লিজিসেন করার সময় চামচেতে সিসে গলিয়ে ঠান্ডা জলে ফেলে দিলে তা আকার নেয়। এমিলি সেরকম করতে গেলে সেক্ষেত্রে ভারতবর্ষের মানচিত্রের আকার নেয়। নতুন বছর পালন করার আগেরদিন,৩৬ সালে ভিয়েনায় যে ব্লিজিসেন  সংস্কার পালন করা হয় তা এমিলির জীবননাট্যকে প্রতীকী করে তুলেছে । ভারতবর্ষ যে ‘তাঁর প্রথম ভালোবাসা ‘ তার প্রকাশ পেয়েছে এমিলির ভাবনায় ও মার্জিত পরিহাসে।

নেতাজি সুভাষ তাঁদের পত্র বিনিময়ে কিঞ্চিৎ গম্ভীর হলেও,যেন আঘাত না লাগে সেভাবেই খুব মেপে রসিকতা করেছেন। একজায়গায় সুভাষচন্দ্র এমিলিকে বলেছেন, ভারতবর্ষই যে শুধু সংস্কারের জালে আটকে আছে তা নয় এবং তার প্রমাণ মিলছে এমিলির পালন করা সংস্কারেও । একবার এমিলির চিঠি দেরিতে আসায় সুভাষচন্দ্র বলেন -আকর্ষনীয় চিঠির জন্য ধন্যবাদ।তবে তা একটু দেরিতে এসেছে। পাশাপাশি ডাক-তার বিভাগের বিলম্বে তিনি শ্লেষ গুপ্ত না রেখে  বলেন -রয়টারকে ধন্যবাদ যে পরের দিন আমরা পুরো বিষয় পেয়ে যাই।


এমিলি আবার চিঠিতে মজার ছলে নেতাজিকে জানান,স্বপ্ন দেখেছি হিমালয় পর্বতমালার মধ্যে আছি কিন্তু দার্জিলিং নয়।উল্লেখ্য তখন নেতাজি থাকতেন দার্জিলিং শহরে।
শীতকালে রোদ দেখার ইচ্ছে নিয়ে নেতাজির করা ব্যঙ্গকে মেনে নিয়েছেন এমিলি শেঙ্কল। এমিলির মতে বরফ ভালো কিন্তু ঠান্ডা ভালো নয়।আবার বেতার যন্ত্র নিয়ে এমিলি তাঁর বাবার নাপসন্দ মনোভাব প্রসঙ্গে রসিকতা ভরে জানিয়েছেন, বাবা গজগজ করেন আর তাঁরা রেডিও শুনে চলেন।
নেতাজি সুভাষ ও এমিলির পত্রে-আলাপচারিতায় উঠে এসেছে দেশ ও বিশ্বের রাজনৈতিক পরিবেশ। এসেছে হরিপুরা কংগ্রেস ও গান্ধী গোষ্ঠীর বিরোধিতা প্রসঙ্গ। এসেছে গম্ভীর চৰ্চা। তারমধ্যে ক্ষনিকের রসিকতা হিসেবে উজ্জ্বল ভাবে বর্ণিত হয়েছে ভিয়েনিজ কাফের চুটকি, সর্বোপরি পরস্পরের স্বাস্থ্যর কুশল বিনিময়।

সুভাষচন্দ্র ছিলেন দেশমাতৃকায় নিবেদিত প্রাণ। নেতাজির বৃহত্তর ভালোবাসা ছিল দেশ। অকপটে স্বীকার করে যাওয়া এমিলি প্রেমের উর্দ্ধে তাঁর কাছে ছিল দেশ।তাঁর অন্তর্ধানের মধ্যে তিনি বুঝিয়ে গেছেন দেশ ছিল তাঁর কাছে সকলের উর্দ্ধে। অথচ,কি করে ভুলে যাওয়া যায়,নেতাজির এমিলিকে লেখা ভালোবাসায় পরিপূর্ণ চিঠির আবেগ। এমিলিকে উপহার স্বরূপ পাঠানো তাঁর টাইপরাইটারের অর্থ ছাড়াও বিভিন্ন সামগ্রী এবং এমিলির সযত্নে তাঁর জন্য রক্ষা করা পোশাক – সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল প্রেম।

স্বামী স্ত্রী বা প্রেমিক প্রেমিকা হিসেবে ত্যাগের মধ্যে তাঁরা মহান হয়ে আছেন। ত্যাগের যে বীজ সুভাষচন্দ্র এমিলির চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়েছিলেন তাই পালন করেছেন এমিলি । সুভাষচন্দ্র নিজের নিঃসঙ্গতার উল্লেখ করে এমিলিকে জানিয়েছিলেন ” এমন একদিনও যায় না যেদিন আপনার কথা ভাবি না। সবসময়েই আপনি আমার সঙ্গে রয়েছেন। ” সব জেনেই তাঁরা চরম অনিশ্চিত এক দাম্পত্য জীবন মেনে নিয়েছিলেন।দেশের স্বাধীনতায় উৎসর্গীকৃত সুভাষ -এমিলির প্রেমকথা তাঁদের ভাববিনিময়, তাঁদের রসবোধ,উইটে জড়িয়ে আছে। এমিলি সেঙ্কল ও সুভাষচন্দ্র বসুর যাপন ও প্রেম ভারতের স্বাধীনতার স্বার্থে স্বার্থত্যাগের মধ্যে দিয়ে তাই হয়ে উঠেছে ভাস্বর।।

About Post Author