Home » বারদ্রোণ মন্ডল বাড়ির পুজো : অম্লান হোমাগ্নির শিখা

বারদ্রোণ মন্ডল বাড়ির পুজো : অম্লান হোমাগ্নির শিখা

সময় কলকাতা ডেস্ক,১৫ অক্টোবর : দেবীপক্ষ চলেই এল।, আর কটা দিন পরেই দুর্গাপুজো।আকাশে বাতাসে শরতের সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে। শারদীয়ার উৎসবে মেতে উঠতে চলেছে বাঙালি। মা আসছেন মর্ত্যলোকে। পরম্পরা মেনে হবে মা দুর্গার আরাধনা। এই পরম্পরা আজকের নয়। ৮৮৭ বঙ্গাব্দে রাজা কংস নারায়ণ তাহেরপুরে যা কিনা অধুনা রাজশাহীতে দুর্গাপূজো শুরু করেছিলেন তা ছড়িয়ে পড়েছে নগরে ও প্রান্তরে। তবে কিনা প্রথমদিকে পুজো হত শুধুমাত্র রাজা,জমিদার বা বাবুশ্রেণীর অট্টালিকা বা দরদালানে।ক্রমেই বারোয়ারি পুজোর ও সার্বজনীন পুজোর চল শুরু হয়। অর্থাৎ রাজা বা জমিদার বাড়ির পুজো যা কিনা বনেদি বাড়ির পুজো হিসেবে পরিচিত তার সূচনাকাল থেকে কেটে গেছে ৫০০ বছরেরও বেশি সময়। অধিকাংশ বনেদি বাড়ীর পুজোই দেড়শো -দুশো বছর বা তারও আগেকার। এমনই এক বনেদি বাড়ির দুর্গা পুজোর আয়োজন চলছে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবারের বারদ্রোণ গ্রামে যা ১৫৮ তম বছরে পা দিয়েছে।

ফিরে যাওয়া যাক ১৭৯৩ সালের ইতিহাসের পাতায় । অর্থাৎ আজ থেকে ২৩০ বছর আগের কথা। লর্ড কর্ণওয়ালিশ সে বছর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন করেন যার ফলে জমিদার শ্রেণী শাসক শ্রেণীরূপে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে।কার্যত জমিদার প্রথা বা জমিদারী প্রথা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে প্রবর্তিত এক প্রকার ভূমি ব্যবস্থা। অধিকাংশ এলাকাকে জমিদারিতে ভাগ করে বাৎসরিক খাজনা প্রদানকারী ভূস্বামীদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। এসব ভূস্বামীরা জমিদার নামে পরিচিত ছিল। জমিদারেরা তাদের প্রজাদের কাছ থেকে ইচ্ছা মত কর আদায় করতে পারত। জমিদারদের উদ্ভবের ইতিহাস অবশ্য তারও অনেক আগের কথা। জমিদারশ্রেণীর সূচনা মোগল আমলে, প্রদেশে প্রদেশে তখন রাজন্য বর্গ বা রাজারা শাসক ছিলেন ।রাজার লোকজন আইনমতে তাঁর প্রজাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতেন। যারা নিয়মিত রাজস্ব দিতেন তাদের উচ্ছেদ করা যেত না। পরবর্তীতে মুঘল শাসনামলে হিন্দু রাজস্ব “জমা” নামে পরিবর্তিত হয়। মূলত রাজস্ব এবং জমা একই ছিল। কৃষকগণ যতক্ষণ শাসকদের রাজস্ব দিতেন প্রচলিত নিয়মে ততক্ষণ জমিতে তাদের সার্বভৌম অধিকার থাকত। জমিদাররা এই জমির সর্বময় অধিকারী না হলেও জমিদারদের রাজস্ব প্রদান করা হত। মুঘল আমলে সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে জমিদারী ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেখা দিতে থাকে । অষ্টাদশ শতকের গোড়া থেকেই জমিদাররা ক্ষমতাবৃদ্ধি পেতে থাকে, তাঁরা অভিজাত শ্রেণি বা প্রাদেশিক বা সামন্তরাজাদের তুল্য ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন ।ব্রিটিশ শাসনামলে জমিদারগণ সরাসরি ভূমির অধিকারী রাজাদের সমতুল্য হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু হতেই জমিদারগণ শুধু সার্বভৌম রাজ্যের প্রতিনিধি নয়, তারা ভূমির সার্বভৌম মালিক হয়ে উঠেন। এই অধিকার ও ক্ষমতা তাঁরা দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত একচ্ছত্রভাবে পেয়েছেন।১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে অবশিষ্ট রাজ্য বা ভারতের অর্ন্তভূক্ত হয় এবং তখন ভারতেও জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে স্বাধীনতার সময়কাল পর্যন্ত জমিদাররা ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছাতে থাকেন।

১৭৯৩ সাল থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে বহু জমিদারির উত্থান ও ঘটে।এই সময়ের মধ্যে ডায়মন্ড হারবারের বারদ্রোণ গ্রামের মন্ডল পরিবারের উদ্ভব হয় জমিদার হিসেবে পরবর্তীতে যারা ব্যবসায়ী হিসেবে অর্থ উপার্জন করেন। তারও আগের উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে তারা জমিদার পরিবার হিসেবে সমৃদ্ধি লাভ করেন। ব্রিটিশ শাসনের সময়কালে, ১৮৬৬ সালে, তারা সাড়ম্বরে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। সে সময় জমিদার ছিলেন গোলক চন্দ্র মন্ডল।জমিদারী প্রথার রমরমার সময় ১৯৫০ সাল পর্যন্ত এখানে পুজো হত সাবেকি রীতি মেনে। ১৯৫০ সালের পর নিষ্ঠা আছে, আচার আছে,চারদিন ধরে নিরবিচ্ছিন্ন প্রজ্জ্বলিত হোমের অগ্নিশিখার মধ্যে মা দুর্গার আরাধনা রয়েছে, কিন্তু জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের সাথে সাথে হারিয়ে গিয়েছে অনেক কিছু। নেই গানফায়ার, নেই দই- চিড়ের প্রায় বানভাসি দরিদ্র ভোজনের নাম দূরদুরান্তের নর- নারায়ণের আতিথেয়তা, নেই পাঁঠাবলি। তারমধ্যেও কুমারী পুজো, সন্ধি পুজো এবং রীতি মেনে চারদিন পুজো হয়। এখনও সাধ্যমত মানুষকে মন্ডল পরিবারে মিলন উৎসবের সৌরভ নিয়ে আসে ১৫৮ বছরে পা দেওয়া বারদ্রোণ গ্রামের মন্ডল পরিবারের পুজো।

সপ্তমীতে কলাবউএর স্নান থেকে কুমারী পুজো, সন্ধি পুজো পর্যন্ত নিরন্তর আনন্দে কাটে নবমী নিশি অবসানে মায়ের বিদায়ে উমার বিদায় লগ্নে মন খারাপের জন্মদিন। যে মন খারাপ দূর হয়ে আবার আনন্দ দানা বাঁধে শরতের আশ্বিনে।

দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে যে মহোৎসব আগে হত তার পরম্পরা আজও বারদ্রোণে চলে আসছে ।আজও সপ্তমীর হোমের আগুন নেভে দশমীতে – দশমীর দিন মায়ের নিরঞ্জনের পর থেকে আবার প্রতীক্ষার শুরু। দেবীপক্ষ সমাগত, বারদ্রোণের জমিদারবাড়ির ইট কাঠের রন্ধ্রে রন্ধ্র জমে থাকা বনেদিয়ানার সুবাসে মিশেছে পুজোর ঘ্রান। মন্ডলবাড়ি এখন উমা-মায়ের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

এক সময় শুধুই রাজা, জমিদার ও বাবু সম্প্রদায় দেবী দুর্গার পুজো করতেন আর জনসাধারণ দেবী দর্শন করত অট্টালিকায়। পুজো এখন ধনী সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বনেদি বাড়ির পুজোর আভিজাত্য কিছুটা খর্ব হয়েছে তবুও বারদ্রোণ মন্ডল বাড়ির বনেদি পুজোয় মা দুর্গা আজও পরম্পরা মেনে হন পুজিতা, দুর্গাপুজো এখানে আজও ঐতিহ্যর পুজো, এখানে আজও চারদিন ধরে অম্লান হোমের আগুন, পুজোর চারদিন আজও এক উজ্জ্বল মিলন- উৎসব।।

About Post Author