Home » Lok Sabha Election 2024: কেষ্টহীন বীরভূমে ত্রিমুখী লড়াইয়ে কোন শিবির এগিয়ে?

Lok Sabha Election 2024: কেষ্টহীন বীরভূমে ত্রিমুখী লড়াইয়ে কোন শিবির এগিয়ে?

সময় কলকাতা ডেস্ক, ১০ মে: অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনে চতুর্থ দফায় দেশজুড়ে মোট ৯৬ টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ। তার মধ্যে রয়েছে বাংলার মোট ৮ কেন্দ্র। সেই কেন্দ্রগুলির মধ্যে অন্যতম বীরভূম লোকসভা কেন্দ্র।  এই লোকসভা কেন্দ্রটি বর্তমানে রয়েছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে। তিনবার এই আসন থেকে জয়ী হয়েছেন শতাব্দী রায়। এই আসনে ভারতীয় জনতা পার্টি প্রথমে প্রার্থী করেছিল রাজ্যের প্রাক্তন আইপিএস অফিসার দেবাশিস ধরকে। কিন্তু সরকারী চাকরি ছাড়ার পরও ‘নো ডিউজ’ সার্টিফিকেট না পাওয়ায় তার প্রার্থীপদ বাতিল হয়। তার জায়গায় বিজেপি এই আসন থেকে প্রার্থী করেন দেবতনু ভট্টাচার্যকে। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস এবারের নির্বাচনে লড়ছে জোট বেধে। এই আসনে বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী মিল্টন রশিদ।

এই লোকসভা কেন্দ্রটি গঠিত হয়েছে বীরভূম জেলার পশ্চিম এলাকা নিয়ে। ১৯৬২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত এই আসনটি তফশিলিদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। যদিও ২০০৯ সালের পর থেকে তা সাধারণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৫২ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত এই আসন ছিল কংগ্রেসের দখলে। কিন্তু পঞ্চম লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রটি হাতছাড়া হয় হাত শিবিরের। তারপরের দশবছর এই কেন্দ্রটি ছিল বামেদের দখলে। প্রথমে গদাধর সাহা ও পরে ডা. রামচন্দ্র ডোম এই আসন থেকে জিতে পৌঁছে যান দেশের আইনসভার নিম্নকক্ষে। কিন্তু ২০০৯ সালে এই আসনে প্রথম খাতা খোলে তৃণমূল কংগ্রেস। জয়লাভ করেন অভিনয় জগৎ থেকে রাজনীতিতে পা রাখা শতাব্দী রায়। সিপিএমের ব্রজ মুখোপাধ্যায়কে ৬১ হাজার ৬১১ ভোটে হারিয়ে জয়ী হন শতাব্দী। পরের দুটি লোকসভা ২০১৪ সালে সিপিএমে কামরে এলাহীকে ৬৭ হাজার ১২০ ভোটে হারিয়ে দেন তিনি।

২০১৯ সালে এই কেন্দ্র থেকে ৮৯ হাজার ৭১১ ভোটে জয়ী হন শতাব্দী রায়। গত দুবার সিপিএম দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও এই নির্বাচনে তৃণমূলের সঙ্গে লড়াই হয় বিজেপির। বিজেপির দুধকুমার মণ্ডলকে পরাজিত করেন তৃণমূলের অভিনেত্রী সাংসদ। গতবারের লোকসভা ভোটের হিসাব অনুযায়ী এই কেন্দ্রের মোট ভোটার ১৯ লক্ষ ৯৬ হাজারের বেশি। তার মধ্যে গ্রামের ভোটার প্রায় ১৪ লক্ষ। তারমধ্যে পোলিং হওয়া বৈধ ভোটের ৪৫.১৭ শতাংশ পেয়ে জয়ের হ্যাটট্রিক করেন শতাব্দী। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই কেন্দ্রে রাজ্যের শাসক শিবিরের ভোট বেড়েছিল প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। মোট ৬ লাখ ৫৪ হাজার সত্তর ভোট পেয়েছিলেন শতাব্দী। প্রায় সাড়ে ২০ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে দ্বিতীয়স্থানে উঠে আসে পদ্ম শিবির। বিজেপি প্রার্থী দুধকুমার মণ্ডল পেয়েছিলেন ৩৯ শতাংশ ভোট। ৫ লক্ষ ৬৫ হাজার ১৫৩ ভোট গিয়েছিল বিজেপির ঝুলিতে। এই লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে চারটিতে এগিয়ে গিয়েছিল পদ্মশিবির। পাশাপাশি, একদা বামদূর্গ বলে পরিচিত এই আসনে বামফ্রন্টের ভোট কমেছিল প্রায় ২৪ শতাংশ। তাদের প্রার্থী রেজাউল করিম ৯৬ হাজার ৭৬৩ ভোট পেয়ে ছিলেন তৃতীয় স্থানে। চতুর্থ স্থানে শেষ করেছিল কংগ্রেস। ৭৫ হাজারের কিছু বেশি ভোট পেয়েছিলেন কংগ্রেস প্রার্থী ইমাম হোসেন।

এই লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে মোট সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র। কেন্দ্রগুলি হল- দুবরাজপুর, সিউড়ি, সাঁইথিয়া, রামপুরহাট, হাঁসন, নলহাটি ও মুরারই। গত লোকসভা নির্বাচনে সাতটি আসনের মধ্যে চারটিতে পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। কিন্তু ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে হারিয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয় ঘাসফুল শিবির। দুবরাজপুর ছাড়া বাকি ছয়টি কেন্দ্রে এই আসন থেকে জয়লাভ করেন তৃণমূলের প্রতীকে লড়াই করা প্রার্থীরা। আরও একটি লোকসভা নির্বাচন। বিদায়ী সাংসদ শতাব্দী রায়ের উপর আবার আস্থা রেখেছেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চতুর্থ বার জয়ের লক্ষ্যে ময়দানে নেমে পড়েছেন অভিনেত্রী সাংসদ। গ্রামে গ্রামে ঘুরে জনসংযোগ করেন। নিজের মেয়াদের পনেরো বছরের কাজ ও রাজ্য সরকারের জনমুখী প্রকল্পকে হাতিয়ার করেছেন শতাব্দী।  তবে রাজনেতিক মহলের ধারণা, বীরভূমের লড়াই এবার সহজ হবে না। তার পিছনে কাজ করছে বেশ কয়েকটি অঙ্ক। প্রথমত, অনুব্রত মণ্ডলের অনুপস্থিতি। বীরভূমের তৃণমূলের জেলা-সভাপতি তথা দাপুটে নেতা অনুব্রত বা কেষ্ট মণ্ডল বর্তমানে জেলবন্দি। গত কয়েক বছর ধরে দলের হয়ে ভোট পরিচালনার দায়িত্ব থাকত তার উপরেই। ভোট এলেই বিরোধী দলের কর্মীদের গুড় বাতাসা, পাঁচন টনিক দেওয়ার পাশাপাশি এলাকাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেন কেষ্ট। গরুপাচার মামলায় কেন্দ্রীয় এজেন্সির হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর এই জমি ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তৃণমূলের জন্য। গত দশবছরের তুলনায় এই নির্বাচনের আগে বীরভূমে অনেক বেশি সময় দিতে দেখা গিয়েছে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। জনসভা থেকে কেষ্ট মণ্ডলের দরাজ প্রশংসাও করেন মুখ্যমন্ত্রী। যদিও নির্বাচনী প্রচারে বেরিয়ে অনুব্রতকে বীরভূমের রাজনীতে অপ্রাসঙ্গিক বলে কটাক্ষ করেন বিজেপি প্রার্থী দেবতনু ভট্টাচার্য। তিনি সাফ জানিয়ে দেন ‘অনুব্রত ফ্যাক্টর বলে আর কিছু নেই। পাশাপাশি লাল মাটির দেশে প্রথম বারের জন্য পদ্ম ফোটার ব্যাপারেও আশাবাদী তিনি।

আরও পড়ুন: Lok Sabha Election 2024: কবিগুরুর বোলপুর কেন্দ্রে কুর্সির লড়াই, অনুব্রতহীন গড়ে দুর্গ রক্ষা হবে তৃণমূলের? নাকি রাঙামাটিতে ফুটবে পদ্ম? হারানো জমি ফেরাতে পারবে বামেরা?

বীরভূমে প্রকট হয়েছে তৃণমূলের গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব। অনুব্রত গ্রেফতার হওয়ার পর একাধিক গোষ্ঠী মাথাচাড়া দেয়। বিভিন্ন গোষ্ঠীর লড়াই রাজ্যের শাসক দলের কপালের ভাঁজ চওড়া করবে বলে মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। পাশাপাশি তৃণমূলকে চিন্তায় রাখবে কংগ্রেস প্রার্থী মিল্টন রশিদ। গতবারে লোকসভা নির্বাচনে বিশেষ কিছুই করতে পারেনি তৃণমূল। কিন্তু এবার বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী মিল্টন রশিদ। তিন প্রার্থীর মধ্যে তিনিই বীরভূমের ভূমিপুত্র। আবার সংখ্যা লঘু মুখও। কোভিড মহামারীর সময় নিজের কাজের মধ্যে দিয়ে প্রচারের আলোয় এসেছিলেন মিল্টন। গত লোকসভা নির্বাচনে বাকি চার বিধানসভা কেন্দ্র থেকে হারলেও হাঁসন ও মুরারই থেকে বিপুল ভোট পেয়েছিলেন। এই ভোটের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল সংখ্যালঘু ভোট। কংগ্রেস সেই সংখ্যালুঘু সম্প্রদায়ের একজনকে প্রার্থী করায় তৃণমূলের সংখ্যা লঘু ভোট ব্যাঙ্কে থাবা বসানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কংগ্রেস প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করার পরই ময়দানে নেমে পড়েছেন মিল্টন। মানুষের মধ্যে তিনিও পৌঁছে যাচ্ছেন জনসংযোগ করতে। এক সময়ে লাল দূর্গে যদি নিজেদের ভোট পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয় কংগ্রেসের জোটসঙ্গী সিপিএম। সেক্ষেত্রে লড়াই দ্বিতীয় বা তৃতীয় না জয়কে পাখির চোখ করছে কংগ্রেস প্রার্থী। এ বারও কী জয়ের ধারা অব্যাহত রেখে চতুর্থ বারের জন্য সাংসদ হবেন শতাব্দী রায়। এই উত্তর মিলবে ৪ জুন।

About Post Author