পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ১১ জুন : 2024 Lok Sabha Election চতুর্থ দফার লোকসভা ভোটে নজর কাড়তে চলেছে বর্ধমান পূর্বকেন্দ্র। ডিলিমিটেশনের পরে গড়ে ওঠা বর্ধমান পূর্ব লোকসভা কেন্দ্রে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের শস্য ভান্ডার বলে পরিচিত বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকা যেখানে প্রচুর পরিমাণে ধান ও আলু চাষ হয়। জেলা তথা রাজ্যের উল্লেখযোগ্য তাঁত বলয় এই কেন্দ্রেই। এই কেন্দ্রে তফসিলি জাতি -উপজাতি ভোটার ৩৯ শতাংশের বেশি। ২২ শতাংশের বেশি মুসলিম ভোটার। একদা বামেদের গড় ছিল বর্ধমান। জেলা ভেঙে দু টুকরো করা হয়েছে, বামেরা টুকরো না হলেও হীনবল হয়ে পড়েছে জেলা জুড়ে। ডিলিমিটেশনের পরে, ২০০৯ সালেই একমাত্র বামেরা জিতেছিল। বর্ধমান পূর্ব লোকসভা কেন্দ্রে এখন একচেটিয়া দাপট তৃণমূলের। গত বছর লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্র তাদেরই দখলেই ছিল।এবার ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তৃণমূলের প্রার্থী ডক্টর শর্মিলা সরকার, বিজেপির প্রার্থী অসীম সরকার এবং সিপিএমের প্রার্থী নীরব খাঁ। তবে কাগজে কলমে লড়াইয়ে বামেরা নেই। বামেদের শক্তি এই লোকসভা কেন্দ্রে তলানিতে ঠেকেছে। লড়াই তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে সীমাবদ্ধ বলেই প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। পরিসংখ্যান ও বাস্তব পরিস্থিতির দিকে চোখ রাখা যাক।

গত ২০১৪ সাল থেকেই কালনা, কাটোয়া, রায়না, পূর্বস্থলী উত্তর , পূর্বস্থলী দক্ষিণ , মেমারি ও জামালপুর বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে গড়ে ওঠা পূর্ব বর্ধমান লোকসভা কেন্দ্রটিতে টানা দুবার জিতেছে তৃণমূল। পূর্ব বর্ধমান কেন্দ্রের পরিসংখ্যানে কাগজে কলমে এগিয়ে তৃণমূল। কারণ ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে জয়লাভ করাই শুধু নয় সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের ছটিতেই লিড নেয় তৃণমূল। একমাত্র কাঁটা ছিল কাটোয়া বিধানসভা কেন্দ্র। কিন্তু ২০২১ সালে সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রেই জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। লোকসভা নির্বাচনে কাটোয়া বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির চেয়ে আট হাজার ভোটে পিছিয়ে থাকা তৃণমূল নহাজারের বেশি ভোটে জয়ী হয়। অর্থাৎ বিজেপির সঙ্গে ব্যবধান তারা বাড়ায় ১৭ হাজারের বেশি ভোটে। আবার বিধানসভায় রায়না কেন্দ্রে জিতলেও অস্বস্তি বেড়েছে প্রবলভাবে। লোকসভার ৩৬ হাজারের লিড এক ধাক্কায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। পূর্বস্থলী দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে জিতলেও এখানেও রয়েছে। লিড সামান্য হলেও কমেছে। অর্থাৎ কাগজে কলমে চিন্তা থাকছে রায়না আর পূর্বস্থলী দক্ষিণ নিয়ে। এরমধ্যে রায়নায় প্রবল শক্তিবৃদ্ধি করেছে বিজেপি। তবে এই লোকসভা কেন্দ্রের চারটি পুরসভা কালনা, কাটোয়া,দাঁইহাট ও মেমারি তৃণমূলের দখলে।সবগুলি পঞ্চায়েত সমিতি তৃণমূলের দখলে। গ্রাম পঞ্চায়েতে রায়নায় একটি গ্রাম পঞ্চায়েত বাম ও পূর্বস্থলীতে তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েত বিজেপির দখলে থাকলে গ্রাম পঞ্চায়েতের সর্বত্র তৃণমূলের একাধিপত্য।
ভোটের ঠিক শেষ পর্বে একাধিক ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে রায়নায়। বিজেপি কর্মীদের মারধরের অভিযোগ রয়েছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার পায়ের তলায় জমি শক্ত বা ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে তৃণমূল এবং বিজেপি ও তৃণমূল বাদানুবাদ ও সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। সিপিএম ও বামেরা শান্ত এবং নীরব। সিপিএম প্রার্থী নীরব খাঁ বলছেন, সিএএ, এনআরসি ও ধর্ম দিয়ে বিজেপি রাজনীতি করছে। তিনি এও বলছেন,তৃণমূল দুর্নীতিগ্রস্ত। তিনি জানিয়েছেন, মানুষের রুজি রুটি, তাঁত শিল্পীদের দুর্দশা,কৃষকদের দুর্দশা মোচনের জন্য তাঁর লড়াই। মানুষের দুঃখমোচনের কথা, পূর্ব বর্ধমান কেন্দ্রের ভোটারদের পাশে থাকার কথা তিনি বললেও লড়াই যেন শর্মিলা সরকার ও অসীম সরকারের মধ্যেই এসে আটকে রয়েছে। তবুও নীরব খান ফ্যাক্টর হতেই পারেন। জয় পরাজয়ের নির্ণায়ক শক্তি হতেই পারেন।
কবিয়াল অসীম সরকার আবার দুর্নীতির কথাই বলছেন। তাঁর মতে, তৃণমূল সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি করেছে, নারী ধর্ষণ করেছে। মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধেই ভোট দেবে। ভোটে কারচুপি না হলে বঙ্গে শুধুই পদ্ম ফুল ফুটবে।
নির্বাচনী রাজনীতিতে এবং বয়সে নবীন শর্মিলা সরকার পেশায় চিকিৎসক। তিনি প্রচারের মধ্যেও চিকিৎসা করছেন।তবে তিনি প্ৰখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি বলছেন, তৃণমূল অনেক কাজ করেছে তবুও অনেক কাজ বাকি। তিনি জিতলে জোর দিতে চান শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায়।তবে তিনি প্রচারে নেমে প্রায়-অসম্ভব, চমক জাগানো কোনও প্রতিশ্রুতি দিতে চান নি। অনেকক্ষেত্রে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন,অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব।

চিকিৎসক শর্মিলা সরকার বলছেন,জনসমর্থন পাচ্ছেন। জিতবেন বলেই তাঁর মনে হয়েছে। বর্ধমান পূর্বকেন্দ্র আগেও চিকিৎসককে মনোনীত করেছে। ২০০৯ সালে এই কেন্দ্রে চিকিৎসক বাম প্রার্থী অনুপ সাহা জয়ী হয়েছিলেন। অন্যদিকে অসীম সরকারের মতে, মানুষের বিবেক জেগে উঠেছে। তাঁর বক্তব্য, তৃণমূলের বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে বিজেপির হাতিয়ার দুর্নীতি। কিন্তু বর্ধমান পূর্ব কেন্দ্রে সেই হাতিয়ার সেভাবে কাজ করবে কিনা সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। অসীম সরকারের নিচু তলার কর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হীনতা এর অন্যতম প্রধান কারণ। দ্বিতীয় কারণ রায়না ও পূর্বস্থলী দক্ষিণ নিয়ে তৃণমূলের চিন্তা থাকলেও তারা ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের চেয়ে ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটে বর্ধমান পূর্ব কেন্দ্র জুড়ে ভোট সার্বিক অঙ্কে বেড়েছে। তবুও ভয় রয়েছে। রয়েছে জামালপুর, মেমারি সহ একাধিক জায়গায় গোষ্ঠী কোন্দল বেশ বড় আকারেই রয়েছে। তবুও বিজেপির গোষ্ঠী কোন্দল যে নেই তাও নয়। বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী ও মতুয়া সংঘাধিপতি শান্তনু ঠাকুরের সঙ্গে কবিয়াল অসীম সরকারের সখ্যতা কমলেও বর্ধমান পূর্বের বেশ কয়েকটি বিধানসভা কেন্দ্রে বেশ কিছু মতুয়া সম্প্রদায় ভুক্ত মানুষ আছেন যাদের ভোট পাবেন মতুয়া হাব থেকে উড়ে আসা অসীম সরকার। প্রধানমন্ত্রী মোদি ম্যাজিক, তৃণমূলের ‘ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভোটের আহ্বান কতটা কাজ করবে অসীম সরকারের পক্ষে? তৃণমূলের সর্বব্যাপী গোষ্ঠী কোন্দল ও অসীম সরকারের দিকে ঝুঁকে থাকা কিছু সংখ্যক মতুয়া ভোট এবং রায়না, পূর্বস্থলী দক্ষিণের মত দুয়েকটি বিধানসভা কেন্দ্র এলাকায় বিজেপির শক্তি বৃদ্ধির জোরে কি আদৌ কবিয়াল অসীম সরকার বর্ধমান পূর্ব কেন্দ্রে জুড়ে বসতে পারবেন কি?
রাজনৈতিক মহল মনে করছে, বর্ধমান পূর্ব কেন্দ্রে খাতায় কলমে যেভাবে তৃণমূল এগিয়ে,এবার লোকসভা নির্বাচনে সম্ভাব্য জনসমর্থনের পাল্লায় শর্মিলা সরকার বেশ কিছুটা এগিয়ে। অঘটন না হ’লে বর্ধমান পূর্ব কেন্দ্র থেকে হ্যাটট্রিক করতে চলেছে তৃণমূল। মনে রাখা দরকার তৃণমূলের বিদায়ী সাংসদ সুনীল কুমার মন্ডল গতবার ৮৯ হাজার ভোটে নিকটতম বিজেপি প্রতিদ্বন্দ্বী পরেশ চন্দ্র দাস কে হারিয়ে দিয়েছিলেন। বিজেপি পঁচিশ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে। ২০১৪ সালেও সুনীল কুমার মন্ডলজয়ী হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে এই কেন্দ্রে রানার্স আপ সিপিএমের ভোট প্রায় ২৩ শতাংশ কমে যায় ২০১৯ সালের ভোটে । অথচ ২০০৯ সালের পর থেকে তৃণমূলের শক্তি কখনই ক্ষয় হয়নি বর্ধমান পূর্ব লোকসভা কেন্দ্রে বা এই কেন্দ্রের অন্তর্গত অধিকাংশ বিধানসভা ক্ষেত্রগুলিতে। বরং প্রতিটি লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভোট শতাংশের হিসেবে সামান্য হলেও বেড়েছে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিল বামেরা ।অতঃপর বামেদের ক্ষয় শুরু হয়। হিসেব বলছে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিজেপির ভোট যে পরিমানে বেড়েছিল প্রায় একই অনুপাতে বামেদের ভোট কমে যায়। স্বাভাবিকভাবেই, এবারের লোকসভা নির্বাচনে বামেদের শক্তি বাড়লে বিজেপির যে আখেরে খুব একটা লাভ হবে না বরং ক্ষতি তা গাণিতিকভাবে সত্য। একথা সত্যি যে বর্ধমান পূর্ব কেন্দ্রের সাংসদ ও কালনার বিধায়ক ঘর ছেড়ে বিজেপিতে গেছিলেন এবং বিদায়ী সাংসদ আবার তৃণমূলে নিজেই ফিরে আসেন যদিও তৃণমূল তাকে এবারের নির্বাচনে গুরুত্ব দেয়নি। এখন দেখার বিপক্ষের অনুকূলে থাকা পরিসংখ্যান, প্রতিপক্ষের ছয় বিধায়ক, এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তি সম্পন্ন সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রধান প্রতিপক্ষ মহিলা চিকিৎসককে পিছনে ফেলে আদৌ বর্ধমান পূর্ব লোকসভা কেন্দ্রে জয়ের কবিগান লিখতে পারেন কিনা কবিয়াল? তবে ভোটের ঠিক আগে পরিস্থিতি ও হাওয়া যা, জয়ের বিষয়ে অনেকটাই এগিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ডক্টর শর্মিলা সরকার।।


More Stories
ব্রাজিলের জনবহুল এলাকায় আচমকাই ভেঙে পড়ল যাত্রীবাহী বিমান, পাইলট-সহ বিমানের ৬২ জন যাত্রীর মৃত্যু
অধীর চৌধুরী নিজে ডুবলেন, ইন্ডিয়া জোটকে ডোবালেন, বাঁচালেন এনডিএ ও বঙ্গ বিজেপিকে
INDIA Alliance: সরকার গঠন নয়, আপাতত ঐক্যবদ্ধ বিরোধী হিসাবেই সংসদে বসতে চায় ইন্ডিয়া জোট