Home » দেব ও হিরণের মধ্যে কে জিতবেন? ভোটের আগে ঘাটালে পাল্লা ভারি কার?

দেব ও হিরণের মধ্যে কে জিতবেন? ভোটের আগে ঘাটালে পাল্লা ভারি কার?

পুরন্দর চক্রবর্তী ও চুমকী সূত্রধর , সময় কলকাতা,২৪ মে : ঘাটালে লোকসভা ভোটের দিকে চোখ বঙ্গের। সম্মুখ সমরে দুই নায়ক। ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রের ভোট, বাংলা চলচ্চিত্রের দুই নায়কের লড়াই নিয়ে আলোচনা করলে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের আলোচনা হবে না তাও কি হয়? শিলাবতী, ঝুমি ও কংসাবতী নিয়ে আলোচনা হবে না তাও কি হয়? বর্ষা আসতেই এই তিন নদী ফুলে ফেঁপে ওঠে। রূপনারায়ণ দিয়ে সেই নদীর জল বেরিয়ে না গেলে ঘাটালের বিস্তীর্ণ অংশ প্লাবিত হয় বন্যায়। ঘাটাল ভেসে যায়, পথঘাট চলে যায় জলের তলায়। ডাঙ্গা বলে প্রায় কিছুই থাকেনা। নৌকা দিয়ে চলে পারাপার। বন্যার এই রূপ প্রতিবছর ঘাটালবাসীর সঙ্গী। দুর্ভোগ থেকে প্রায়ই মুক্তির পথ খোঁজার কথা ওঠে। দুর্ভোগ থেকে বাঁচার রাস্তা খুঁজতে বিভিন্ন খসড়া রিপোর্ট পেশ হয়। আবার সবকিছু তলিয়ে যায় জলের তলায়। শুধু পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল নয়, পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়াও জলের মধ্যে দিন কাটায় বন্যায়। নিস্তার মেলে না জল-যন্ত্রণা থেকে। অথচ পঞ্চাশের দশক থেকেই বন্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য উঠে এসেছে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের কথা। কী আছে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানে? ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান বলছে, ঘাটালকে ঘিরে থাকা মূল নদী এবং শাখা নদীগুলির নিয়মিত ড্রেজিং করে জলধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে বন্যার হাত থেকে ঘাটালকে রক্ষা করার কথা । মাস্টার প্ল্যানে পাম্প হাউস তৈরির অনুমোদন রয়েছে চন্দ্রকোনা-ঘাটাল-দাসপুর-সহ পাশ্ববর্তী এলাকায়। কংসাবতী ও শিলাবতীতে নদীপথ সংস্কারের পাশাপাশি স্থানীয় খালগুলিতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, খাল সংস্কার ও সেই সঙ্গে ঘাটালের নদী ও খাল গুলিতে লক গেট বাসানোর কথা রয়েছে ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানে। লক্ষ্য এক ও অভিন্ন। ঘাটালকে প্লাবনের হাত থেকে রক্ষা করা।

বর্তমানে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রূপায়ণ করার কথা আরও একবার বলছেন ঘাটালের দুবারের সাংসদ দীপক অধিকারী যাকে বঙ্গ একডাকে দেব নামে চেনে।দুবারের সাংসদ দেবের প্রতিপক্ষ বিজেপির প্রার্থী হিরণ বলছেন,প্ল্যান রুপায়িত করতে দশবার জন্ম নিতে হবে দেবকে। বাস্তবেই দীর্ঘদিন ধরেই ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে যা চলছে তা দেখে ঘাটালের মানুষের মনে হতেই পারে চাঁদের পাহাড় থেকে হীরে আনার চেয়েও যেন কঠিন ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান কার্যকর হওয়া । সারাক্ষণ কাগজ, পুঁথি পত্রে আর লাল ফিতের ফাঁসে আটকেই আছে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান তো আর আজকের কথা নয়। নাই নাই করে ৭৫ বছর হয়ে গেল। ১৯৫২ এবং ১৯৫৭ সালে ঘাটালের সিপিআই সাংসদ নিকুঞ্জ বিহারী চৌধুরী সেই কবে পঞ্চাশের দশকে প্রথম ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের কথা উচ্চারণ করেছিলেন । ১৯৫৯ সালে কেন্দ্রীয় মানসিংহ কমিটি পরিদর্শন করেও যায় ঘাটাল। রূপায়িত হয়নি ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। অতঃপর কত ভৌগোলিক রাজনৈতিক চিত্রের পরিবর্তন হয়েছে। ডিলিমিটেশনের ফলে ঘাটাল ও পাঁশকুড়া লোকসভা কেন্দ্র পরিবর্তিত হয়েছে।ঘাটাল এবং পাঁশকুড়ার সাংসদ পদে এসেছেন গীতা চৌধুরী এবং গুরুদাস দাশগুপ্তের মত বরেণ্য সিপিআই নেতা – নেত্রীরা। বারবার ঘাটাল কে প্লাবন থেকে রোধ করার কথা খালি মুখে বলা হয়েছে। প্রতিশ্রুতি বয়ে গিয়েছে বন্যার জলে। ১৯৮৩ সালে মন্ত্রী প্রভাস রায় শিলান্যাস করে বসেন ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের। দশ বছরেও কাজ হতে না দেখে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রূপায়ণ সংগ্রাম কমিটি গঠন করে স্থানীয়ভাবে শুরু হয় আন্দোলন। কাজের কাজ কিছুই হয়নি।২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রকল্পের রূপায়নে প্রথমে রাজ্য ডিটেলড প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরি করে। ২০১১ সালে তৎকালীন সেচমন্ত্রী মানস ভূঁইয়া ২০১৫ সালে এনিয়ে উদ্যোগ নেন।কেন্দ্র এই প্রকল্পে শিলমোহর দেয়। তবুও থমকে থাকে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ছটি বিধানসভা সবং পিংলা, ডেবরা, ঘাটাল, কেশপুর ও দাশপুর পশ্চিম মেদিনীপুরে। পূর্ব মেদিনীপুরে কেবলমাত্র রয়েছে পাঁশকুড়া পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্র। এই সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে গড়ে উঠেছে ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্র। সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রে অন্য বিভিন্ন ইস্যু থাকলেও পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল বলয় জুড়ে এলাকার ভোটারদের কাছে বড় ইস্যু ঘাটালের বন্যার দুর্ভোগ। তাই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখেই ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের কথা কিন্তু কে রুপায়িত করবেন ঘাটার মাস্টার প্ল্যান? দিদি নাকি মোদি ? এই কৃতিত্বের হক কে নেবেন ভোটের আগে তা নিয়েও চলছে তরজা। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এপ্রিলের শেষেই ঘোষণা করে দিয়েছেন ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রূপায়ন করবে রাজ্যই। এ কথা ঠিক যে, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান এর রূপায়ণের প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রের দেওয়ার কথা ছিল ৭৫ শতাংশ টাকা এবং রাজ্যের দেওয়ার কথা ছিল ২৫ শতাংশ টাকা।পরে একে সংশোধিত করে কেন্দ্র ও রাজ্যের এই প্রকল্পে বরাদ্দ টাকায় পরিবর্তন আনা হয়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সে কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, ‘‘ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানে ৬০ শতাংশ টাকা দেওয়ার কথা কেন্দ্রের। কিন্তু সেই টাকা কেন্দ্র দেয়নি। মুখ্যমন্ত্রী ফেব্রুয়ারি মাসে বলেছিলেন, কেন্দ্র টাকা না দিলেও রাজ্য নিজেই টাকা দেবে। ১৫০০ কোটি টাকায় আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রাজ্য কাজ শুরু করে দেবে।’’

ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে চলছে তরজা। ভোটেও উঠে আসছে সেকথা। প্রশ্ন তুলছেন বিজেপি প্রার্থী হিরণ। তাঁর প্রশ্ন, ১০ বছরে একবারও সংসদে দেব ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের কথা বলেছেন কি? ২০২২ সালে কেন্দ্র প্রকল্পটি ‘ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বর্ডার এরিয়া’ প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেয় রাজ্য সরকারকে। রাজ্য সেই প্রস্তাবে সম্মতি জানায়। গত বছর ‘ইনভেস্টমেন্ট ক্লিয়ারেন্স’ দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। টাকা বরাদ্দ হয় নি। অবশেষে ভোটের আগে আবার ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্র জুড়ে প্রচারে ও আলোচনায় সেই ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় , ভোটের ঠিক আগে, দাসপুরের সভা থেকে বলেন , ১ হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট আগামী তিন চার বছরের মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যাবে। অর্থাৎ ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান দিয়ে মাস্টার স্ট্রোক স্রেফ প্রতিশ্রুতির মধ্যেই এখনও সীমাবদ্ধ। এরমধ্যে বামেরা বলছে, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে বিজেপি তৃণমূলের সেটিং চলছে। মানুষের দুর্ভোগ কাটছে না। রয়েছে মূল্যবৃদ্ধি বা বেকারত্বের সমস্যা যার থেকে মানুষের নজর সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।তবে বামেরা যতই যুক্তিপূর্ণ কথা বলুন, ঘাটালের মানুষের নজর কিন্তু বামেদের দিক থেকে সরে গিয়েছে ।কেশপুর সহ ঘাটাল লোকসভার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একদা সিপিএমের রাজত্ব,ছিল দৌরাত্ম্যও । ছিল হাড়হিমকরা দিন। সেসবদিন অতীত। ২০০৯ সালে প্রয়াত সিপিআই নেতা গুরুদাস দাশগুপ্ত জিতেছিলেন ঘাটালে। ২০১৪ সালে জিততে না পারলেও বাম প্রার্থী সন্তোষ রানা সাড়ে তিন লক্ষ ভোট টেনেছিলেন। তারপরে যেন ঘাটালে তলিয়ে যায় বামেরা। ২০১৯ সালে সিপিআই প্রার্থী তপন গাঙ্গুলী এক লক্ষ ভোট ও যোগাড় করতে পারেননি। ২০২৪ সালে ও বাম প্রার্থী তিনি। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু বাম ভোটার থাকলেও বামেদের প্রভাব নেই ঘাটালে যা ফিরবে বলে মনে করার মত রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি পায়নি বামেদের । ফলশ্রুতি লড়াই এখন দুই চিত্র তারকার। লড়াই তৃণমূল বনাম বিজেপির।

২০১৯ সালে পুলিশ আধিকারিক ভারতী ঘোষ কে বিজেপি এই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছিল। এক ধাক্কায় তিনি বিজেপির ভোট বাড়িয়ে নিয়েছিলেন ৩৪ শতাংশ। তৃণমূলের ভোট ২০১৪ সালের থেকে সামান্য কমলেও দেব জয়ী হন প্রায় ১ লক্ষ ৮ হাজার ভোটে।এই লোকসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন বিধানসভা অঞ্চলে তৃণমূলের দাপট। সবংয়ের বিধায়ক হিসেবে রয়েছেন বর্ষিয়ান রাজনৈতিক নেতা মানস ভূঁইয়া। একমাত্র ঘাটাল বিধানসভা ছাড়া বাকি ৬টি বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেস ২০২১ সালে জয় পেয়েছিল। ২০২৪ সালে লোকসভা ভোটের প্রচারে একদিকে তৃণমূল সাংসদ থাকাকালীন দেবের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরছেন বিজেপি প্রার্থী হিরণ, অন্যদিকে দেব ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের পাশাপাশি ভালোবাসার কথা বলছেন। তবে একথাও ঠিক ঘাটাল শুধু কি ভালোবাসা আর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভুলবে?

এনিয়ে কোনও সন্দেহ নেই বিধানসভা ভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন বিজেপি তথা হিরণ এবারের ভোটের প্রচারে তৃণমূল তথা দেবের চেয়ে খুব পিছিয়ে নেই। দেব তাঁর প্রচারে পাঁশকুড়া রেল সেতু এবং ডেবরা রেল সেতুর কথা বলছেন তবে সবকিছুর উপরেই জায়গা করে নিয়েছে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। অন্যদিকে, বিজেপি প্রার্থী হিরণ বলছেন, কেন্দ্র নয় রাজ্যই আটকে রেখেছে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। হিরণের কথায় কতটা প্রভাবিত হবেন ঘাটালবাসী? মোদি ও স্থায়িত্বের প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিজেপির দিকে কতটা ঝুঁকবেন মানুষ সে কথাও সময় বলবে। তবে মাস্টার প্ল্যানের স্রেফ প্রতিশ্রুতি দিয়ে উত্তরণের পথ নাও খুঁজে পেতে পারেন দেব , কথায় চিড়ে নাও ভিজতে পারে। আর এই আশঙ্কা থেকে দেব বলছেন, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও তিনি ঘাটালে ঢুকবেন না যদি না ডিসেম্বরের মধ্যে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের কাজ শুরু হয়।আট মাস সময় চেয়েছেন দেব। কবিগুরু বলেছেন,বাঁচান বাঁচি, মারেন মরি। বলো ভাই, ধন্য হরি। ঘাটালের ভোট নিয়ে রাজনৈতিক মহল বলছে যে, হরি এখন ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান।।

আরও পড়ুন পুরুলিয়া : মোদি ও রাম কি শান্তিরামের বিরুদ্ধে বাঁচাতে পারবে জ্যোতির্ময়কে?

About Post Author