পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা, ১৯ জুলাই :কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব ৫৪ পূর্ণ করলেন যেদিন, সেদিনই ঘটল রেল দুর্ঘটনা। ১৮ জুলাই তাঁর জন্মদিনে উত্তরপ্রদেশের গোণ্ডায় লাইনচ্যুত হল চণ্ডীগড়-ডীব্রগড় এক্সপ্রেসের একাধিক কামরা। রেলের বেলাইন হওয়ায় একাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে উত্তরপ্রদেশের গোণ্ডা এবং ঝিলাডির মাঝে অবস্থিত পিকাউরায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে৷অতঃপর আবার উঠেছে দাবি,পদত্যাগ করতে হবে রেলমন্ত্রীকে।

রেলমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত, উত্তর প্রদেশের রেল দুর্ঘটনার পরে দাবি তুলেছেন তৃণমূলের কুণাল ঘোষ। অন্যদিকে সুস্মিতা দেব ও মহুয়া মৈত্র দায়ী করেছেন অশ্বিনী বৈষ্ণব কে। ঠিক এক মাস আগে ১৭ জুন কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনায় অন্তত দশ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তখনও তৃণমূল এবং বামেদের তরফ থেকে অশ্বিনী বৈষ্ণবের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু রেল দুর্ঘটনার নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন কে? আসফ আলি, মাথাই থেকে শুরু করে আজকের অশ্বিনী বৈষ্ণব পর্যন্ত রেল দুর্ঘটনায় পদত্যাগ করেছেন মাত্র দুজন। আর একজন পদত্যাগ করেছিলেন কিন্তু তার পদত্যাগ পত্র গৃহীত হয়নি। কে এই তিনজন বলার আগে একটি ছোট তথ্য।

১৭ জুন কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। সেই দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ পেয়েছে। রেলওয়ে নিরাপত্তা কমিশনার (CRS) এর প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রেন চালানো এবং অপারেশন কর্মীদের অপর্যাপ্ত কাউন্সেলিং সহ অনুপযুক্ত নির্দেশনা (ইন্সট্রাকসন )ট্রেনের দুর্ঘটনার কারণ ছিল।অথচ কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের পিছনে মালগাড়ি ধাক্কা মারার দু’ঘণ্টার মধ্যেই রেলের চেয়ারপার্সন জয়া ভার্মা সিনহা এবং রেলের অন্যান্য কর্মকর্তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মৃত মালগাড়ি চালক অনিল কুমার এবং সহ চালক। তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট তা বলছে না। সিসিআরএসের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, লাইনে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস থাকা সত্ত্বেও মালগাড়ির চালককে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কোনও সতর্কতা ছাড়াই সমস্ত সিগন্যাল পাশ করার জন্য একটি ভুল মেমো দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, অনিল কুমারের উপরে আরোপ হওয়া দোষ সঠিক ছিল না। প্রয়াত লোকো পাইলটের স্ত্রী রোশনি কুমারী বলেছেন, তার স্বামীর আত্মা এবার শান্তি পাবে। রাজনৈতিক শান্তি কিন্তু আসছে না। পদত্যাগের দাবি উঠছে।
দেশের যে দুজন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী বিগত আট দশকের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন তাদের নাম লালবাহাদুর শাস্ত্রী ও নীতিশ কুমার। তামিলনাড়ুর আরিয়ালুর রেল দুর্ঘটনা ১৯৫৬ সালের নভেম্বর মাসে প্রাণ নিয়েছিল ১৪২ জনের। এরপরেই ভারতের তৃতীয় রেলমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করেন। এই ঘটনার ৪৩ বছর পরে ২৮ তম রেলমন্ত্রী নীতিশ কুমার পশ্চিমবঙ্গের গাইসাল রেল দুর্ঘটনার নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। গাইসালে ২৮৮ জন মানুষ নিহত হয়েছিলেন। এই ঘটনার এক বছরের সামান্য পরে দুটি রেল দুর্ঘটনার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অটল বিহারি বাজপেয়ীর কাছে পদত্যাগ পত্র জমা দিয়েছিলেন তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু অটল বিহারি বাজপেয়ি সেই পদত্যাগ পত্র মেনে নেন নি। বিগত কুড়ি বছরে রেল দুর্ঘটনা কমেনি। বিগত এক যুগে একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই রেল দুর্ঘটনার নিরিখে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারত। ১৯৯৯ সালের গাইসাল রেল দুর্ঘটনার পরে আবার ৪৩ তম রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভুর আমলে বেশ কয়েকটি বড় রেল দুর্ঘটনা ঘটে। পাটনা ইনদোর এক্সপ্রেস কানপুরের কাছে দুর্ঘটনায় পড়ে, মৃত্যু হয় প্রায় ১৫০ জনের। এটি সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় রেল দুর্ঘটনা ছিল। তবে হিসেবের দাঁড়িপাল্লায় দেখা যাবে অশ্বিনী বৈষ্ণবের মন্ত্রিত্বকাল দুর্ঘটনার সংখ্যায় খুব বেশি এগিয়ে নেই আবার পিছিয়েও নেই – লালু প্রসাদ যাদব, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়,মুকুল রায় থেকে শুরু করে সুরেশ প্রভু বা অশ্বিনী বৈষ্ণব প্রত্যেক রেলমন্ত্রীর আমলেই দুর্ঘটনা লেগেই ছিল। প্রতি বছরের এ হেন মাস খুঁজে পাওয়া মুশকিল যেমাসে রেল দুর্ঘটনা ঘটে নি। জলভাত হয়ে গিয়েছে রেল দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি।
একথা সত্য যে, আজকের দিনে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মত রাজনৈতিক নেতা বিরল। তথাপি পদত্যাগ রেল দুর্ঘটনা এড়ানোর পথ হতে পারে না। যাত্রী সুরক্ষা কেন সঠিক নয়, কেন প্রাণ হাতে করে ট্রেনে যাতায়াত করতে হয় তার উত্তর মেলে না। তদন্ত অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে হয়। অনেক সময় তদন্তের কারণ সঠিকভাবে জানা যায় না। লোকো পাইলটকে অনেক সময় দোষারোপ করা হয় যেমন করা হয়েছিল অনিল কুমারকে। লোকো পাইলট বা ট্রেনের ড্রাইভার প্রয়াত হওয়ার পরে তাঁর হয়ে বলার থাকছে অধিকাংশ সময় কেউ থাকেনা। অন্যদিকে, রাজনৈতিক নেতারা খতিয়ান তুলে ধরেন কার আমলে কত দুর্ঘটনা ঘটেছে। হালে বিজেপি এরকম একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। রেল দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে নজরদারি প্রকাশ যে পায় না একের পর এক রেল দুর্ঘটনা তার প্রমাণ। যাত্রী সুরক্ষার বিষয় থেকে যায় উপেক্ষিত।।
#latestbengalinews
আরও পড়ুন নেলসন ম্যান্ডেলা কেন মহাত্মা গান্ধীর চেয়ে পৃথক ধারার আন্দোলন ও মতের শরিক এবং পথিক?


More Stories
পাথরের দেবতাকে পুজো না করে জীবন্ত দেবতা মোদি ও যোগীকে পুজো করার নিদান বিজেপি বিধায়কের
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
নীতিশ জমানা শেষ, বিহারের সম্রাট নতুন মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর বুলডোজার মডেল