Home » বিচারের বাণী: ধনঞ্জয়ের ফাঁসি

বিচারের বাণী: ধনঞ্জয়ের ফাঁসি

পুরন্দর চক্রবর্তী ও চুমকী সূত্রধর, ৮ সেপ্টেম্বর, সময় কলকাতা : আরজি কর হাসপাতালকাণ্ডে মহিলা চিকিৎসক ধর্ষণ ও খুনে সুবিচারের দাবি উঠেছে দিকে দিকে। বাংলার মেয়েরা রাস্তায় নেমে সুবিচার চাইছেন । তাঁদের দাবি, ধর্ষণ ও খুনে বিচারের বাণী সবসময় নীরবে নিভৃতে কেঁদে এসেছে। আর এই প্রসঙ্গে একের পর এক ধর্ষণ-খুনের বিগত দিনের ঘটনা জনমানসে ঘুরে ফিরে আসছে। প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে- কামদুনি-ধনঞ্জয়-হাথরাস সহ একের পর এক ঘটনা। সেসময় সুবিচার কি পেয়েছিলেন বিভিন্ন নির্ভয়ারা? পাশাপাশি এও প্রশ্ন উঠছে, যাদের খুন বা ধর্ষণকাণ্ডে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তাঁদের সঙ্গেও কি সুবিচার করা হয়েছিল ? হেতাল পারেখ হত্যাকাণ্ড ও ধনঞ্জয়ের ফাঁসি সেরকমই একটি শিহরণ জাগানো ঘটনা। সময় কলকাতায় ধনঞ্জয় সহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা ও তদন্তের বিষয়গুলি তুলে ধরা হচ্ছে। কতটা সুবিচার পেয়েছিলেন নির্যাতিতা বা অভিযুক্তরা? অথবা কোথায় বিচারের ত্রুটি ছিল? বিশেষজ্ঞরা কী মনে করছেন, তার কোলাজ সময় কলকাতায় । আজকের প্রতিবেদনের বিষয় : ধনঞ্জয়ের ফাঁসি।

বিচারের বাণী: ধনঞ্জয়ের ফাঁসি

আরজিকর হাসপাতালে ট্রেনি মহিলা চিকিৎসকের হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনায় রাজ্যজুড়ে তোলপাড় পড়ে গিয়েছে। প্রতিবাদের ঝড়ের মধ্যে নারী সুরক্ষা-নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। তার চেয়েও বড় দাবি উঠছে সুবিচারের। এরকম নারকীয় ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেজন্য দাবি উঠছে। আর এই প্রেক্ষাপটে দাবি উঠেছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। উই ওয়ান্ট জাস্টিস বলার ফাঁকে দিকে দিকে দাবি উঠছে দোষীর মৃত্যুদণ্ড চাই। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পথে নেমে বলছেন, অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড চাই। কলাকুশলী – বিদ্বজনদের দাবিও ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের।

প্রেক্ষাপট 

সাধারণ মানুষ বা রাজনৈতিক দলের সরব হয়ে মৃত্যুদণ্ডের দাবির মধ্যেও বলা হচ্ছে দ্রুত সুবিচার যেন পায় ধর্ষিতা নির্যাতিতারা। তার জন্য আইনে পরিবর্তন চান মুখ্যমন্ত্রী মমতা -অভিষেকের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও।
তবুও এরমধ্যেও সুবিচার এবং মৃত্যুদণ্ড চাওয়ার মধ্যে একটি জায়গায় সংঘাত বাঁধছে। ইতিমধ্যেই মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে সঠিক দোষীকে দ্রুত নিশ্চিত করার মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস বারবার তুলে আনছে ধনঞ্জয় প্রসঙ্গ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ ও গায়ক কবীর সুমন, অথবা রাজ্যের কারামন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহা বলছেন দোষী সাব্যস্ত করা ও ফাঁসি দেওয়ার মধ্যে ভুল ছিল। উল্লেখ্য, সে সময় ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট সরকার। প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্য ধনঞ্জয়ের ফাঁসির ব্যাপারে অন্যতম প্রধান উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অথচ বিগত কুড়ি বছরের প্রতিটি দিন যেন বলছে ত্রুটি ছিল, ফাঁক থেকে গিয়েছিল বিচারে। সাধারণ মানুষ এবং আমজনতা বিষয়টি ভুলতে বসলেও আজও কোথাও যেন বেশ কিছু মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠে ধনঞ্জয় সুবিচার পেয়েছিল নাকি তাঁর ক্ষেত্রে সঠিক বিচার হয়নি? উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ১৪ আগস্ট ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়কে ফাঁসি দেওয়া হয় ১৯৯০ সালের হেতাল পারেখ ধর্ষণ ও খুনের মামলায়। কী ছিল হেতাল পারেখ কাণ্ডে? কী হয়েছিল?

হেতাল পারেখ ধর্ষণ ও খুন

১৯৯০ সালের ৫ মার্চ, কিশোরী হেতাল পারেখকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুন করা হয়। পারেখ পরিবার যে আবাসনে থাকতেন, সেখানের নিরাপত্তারক্ষী ছিল ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়। ঘটনার পর থেকেই সে পলাতক ছিল। বাঁকুড়ার কুলডিহি গ্রামের বাসিন্দাকে অবশেষে গ্রেফতার করে খুন ও ধর্ষণে মামলা রুজু করা হয়। তদন্তের পাশাপাশি ১৪ বছর ধরে ট্রায়াল কোর্ট, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে ধনঞ্জয়ের বিচার চলে। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ এই মামলার তদন্ত করে। আদালতে ধনঞ্জয়ের বিরুদ্ধে আনা খুন ও ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। হেতাল পারেখ হত্যাকাণ্ডকে রেয়ার অফ দ্যা রেয়ারেস্ট আখ্যা দিয়ে আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়। ৩৪ বছর আগের এই হত্যা ও খুনের কাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি। কেবলমাত্র পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়কে হাইকোর্টে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সুপ্রিম কোর্টে সেই ফাঁসি রদ হয়নি। ২০০৪ সালে তাঁর ফাঁসি হয়ে যায়। স্রেফ পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁর ফাঁসি কী সঠিক সুবিচার ছিল? প্রকৃত অর্থেই কি দোষী ছিল ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় ?

হেতাল পারেখ ও ধনঞ্জয় 

হেতাল পারেখ ছিল কলকাতার বউবাজারে ওয়েল্যান্ড গোল্ডস্মিথ স্কুলের ছাত্রী। ভবানীপুরের আনন্দ অ্যাপার্টমেন্টের তিন তলায় একটি ফ্ল্যাটে বাবা-মা ও দাদার সঙ্গে থাকত সে। ১৯৮৭ সালে পারেখরা এই ফ্ল্যাটে আসে। ধনঞ্জয় এই ফ্ল্যাটের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা এজেন্সির নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন।

ঘটনার দিন কী হয়েছিল ?

ঘটনার দিন কী হয়েছিল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। যা হয়েছিল তা পরবর্তীতে অনেক ক্ষেত্রেই বিরোধিতা করা হয়। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। গবেষকরাও পরবর্তীতে প্রকাশ পাওয়া তথ্যের বিরোধিতা করেন।

যা হয়েছিল বলে বলা হয়েছিল…

প্রাথমিকভাবে এই নৃশংস কাণ্ডের পরে যে তথ্য আদালতে তদন্তকারী দল পেশ করে, সেখানে জানা যায়, ঘটনার দিন আবাসনের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল ধনঞ্জয়। ১৯৯০ সালের ৫ মার্চ, ধনঞ্জয় সকালের শিফটে অর্থ্যাত সকাল ৬টা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছিল। হেতাল তাঁর আইসিএসসি ( ICSE ) পরীক্ষার জন্য সকাল সাড়ে সাতটার সময় বাড়ি থেকে বেরোয়। পরীক্ষা শেষে সে বাড়ি ফিরে আসে। বিকেলে ফ্ল্যাটে তার মায়ের সঙ্গে ছিল শুধু হেতাল। হেতালের মা বিকেলে আশেপাশের একটি মন্দিরে গিয়েছিলেন। তিনি জানান, মন্দির থেকে ফেরার পর, বারবার ধাক্কা দেওয়া সত্ত্বেও তিনি তার বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারেননি। অন্য ফ্ল্যাটের কয়েকজন চাকরকে দরজাটি খুলতে বলেন তিনি। দরজা খুলতেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য নজরে আসে। পারেখ দম্পতির বেডরুমের সাথে লিভিং রুমের সংযোগকারী দরজার কাছে হেতালকে তার মুখে এবং মেঝেতে রক্তের দাগসহ মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। তার পোশাক উন্মুক্ত ছিল। স্থানীয় দুই চিকিৎসক হেতালকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন।

ধনঞ্জয় বধ 

তাৎপর্যপূর্ণভাবে, হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ধনঞ্জয়কে এলাকায় দেখা যায়নি। এই বিষয়টি সামগ্রিকভাবে তাঁর বিরুদ্ধে যায়। পুলিশের তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন তিনি। অবশেষে পুলিশ তাঁকে তাঁর গ্রাম থেকে থেকে গ্রেফতার করে। শুরু হয় মামলার নতুন পর্ব, যা শেষ হয় ধনঞ্জয়ের মৃত্যুদণ্ডে। কারণ, আদালতে প্রমাণিত হয়েছিল, ধনঞ্জয় প্রথমে ১৪ বছরের হেতাল পারেখকে হত্যা করে তারপর তার শবের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। আদালতের এই প্রমাণ পরবর্তীতে প্রমাণিত হয় যে, বিষয়টি মিথ্যার ওপরে দাঁড়িয়েছিল। ধনঞ্জয় ফাঁসিকাঠে ঝোলার পরবর্তী সময় গবেষণায় তা প্রকাশ পেয়েছে। হেতালের বয়স এবং ময়না তদন্তের রিপোর্ট সম্পূর্ণ অন্যকথা বলে। আদালতে তদন্তকারীরা বলেন, খুনের কাছাকাছি সময়ে ধনঞ্জয়কে হেতল পারেখদের ফ্ল্যাটের কাছাকাছি এলাকায় দেখা গিয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে, হেতালদের ফ্ল্যাটে ঢুকতে বা সেখান থেকে তাকে বেরোতে কেউ দেখেনি। তার বিরুদ্ধে ট্রায়াল কোর্ট, হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টে প্রধান যে যুক্তি খাড়া করা হয় তা হল :
খুনের পর সে নিরুদ্দেশ হয়েছিল এবং এই দুই ব্যাপারে ধনঞ্জয় আদালতে সত্যি কথা বলেনি। ব্যাস মৃত্যুদণ্ড হয়, তা বহাল থেকে যায় এবং ২০০৪ সালে ৩৯ বছরের ধনঞ্জয়কে একদল তদন্তকারীর অনুমানের ভিত্তিতে ফাঁসি কাঠে ঝুলে পড়তে হয়।

বিরুদ্ধ প্রমাণ! ‘অনুমানে’ মৃত্যুদণ্ড 

হাইকোর্টের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পরে সেই রায় বহাল থাকার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, “আপিলকারী নিখোঁজ ছিল কেন? আপিলকারী কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যকে কোনও চ্যালেঞ্জ করা হয়নি যখন তারা সাক্ষ্য দেয় যে তারা ১৯৯০ সালের ৫ থেকে ৮মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে আপিলকারীকে ব্যর্থভাবে অনুসন্ধান করেছে বা তাঁকে গ্রেফতারের জন্য তাঁর গ্রামে অভিযান পরিচালনা করেছে।” পলাতক হওয়ার পরিস্থিতিটি আপিলকারীর কাছে তার বিবৃতিতে 313 CrPC ধারার অধীনে রাখা হয়েছিল কিন্তু সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়ার পরিবর্তে, তিনি আলিবাই অত্থ্যাত্ সময়ের ব্যাখ্যা করার আবেদন নিয়ে এগিয়ে আসেন।
তিনি বলেছিলেন যে, দুপুর ২টার পরে তিনি একটি সিনেমা হলে ছবি দেখতে আনন্দ অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়েছিলেন।
এবং তারপর মনোরমা স্কুলে ফিরে আসেন এবং তার জিনিসপত্র সংগ্রহ করে এবং কিছু ফল কিনে তার ভাইয়ের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তার গ্রামের দিকে যাত্রা করেন।
আলিবাইয়ের এই বিলম্বিত আবেদনের সমর্থনে আপিলকারীর দ্বারা কোনও প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট এর আগে জানায়, প্রসিকিউসন প্রতিষ্ঠিত সমস্ত পরিস্থিতি “আপিলকারীর অপরাধের অনুমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তার নির্দোষিতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। তাই ট্রায়াল কোর্ট ও হাইকোর্টের সঙ্গে একমত হয়ে তাকে 302, 376 এবং 380 আইপিসি ধারার অধীনে অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করছি। ” অর্থাৎ তাৎপর্যপূর্ণভাবে রায় দেওয়ার ঠিক প্রাক্কালে সুপ্রিম কোর্ট আপিল কারীর অপরাধের অনুমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কথাটির উল্লেখ করে। আর প্রশ্ন এখানে। “অনুমানের” ওপরে দাঁড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড ?
ধনঞ্জয় খুন ও ধর্ষণের দায় নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও এই মৃত্যুদণ্ডের রায়ে অনেক ফাঁকফোকর থেকে গিয়েছে বলে গবেষকরা মনে করেন।

গবেষকরা কী জানিয়েছেন ?

আরজিকর হত্যাকাণ্ডের বিষয় সামনে আসতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা চন্দ্রনাথ সিনহা ধনঞ্জয়ের ফাঁসি নিয়ে কী বলছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক গবেষণা। এই গবেষণাগুলির মধ্যে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ধরা হয় গবেষক সমাজকর্মী পরমেশ গোস্বামী, দুই অধ্যাপক দেবাশিস সেনগুপ্ত এবং প্রবাল চৌধুরীর গবেষণা। তাঁদের গবেষণার তথ্য সম্বলিত গ্রন্থ ‘আদালত মিডিয়া সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি’ এমন কিছু বিষয়কে তুলে ধরেছে, যাকে এখনও পর্যন্ত ধনঞ্জয় হত্যাকাণ্ডের রায়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ বলে গণ্য করা হয়। এই বিশ্লেষণ এবং অন্য বেশ কিছু বিষয় উঠে এসেছে পরবর্তীতে যেখানে ধনঞ্জয়কে দোষী সাব্যস্ত করার বিরোধিতার তত্ত্ব রয়েছে।

তদন্তে অসঙ্গতির আশঙ্কা”

হেতাল পারেখ খুন হয়েছিল ফ্ল্যাটের ভেতরে। দুপুরের পর খুনের সম্ভাব্য সময়ে সেখানে হেতালের মা ছাড়া আর কেউ উপস্থিত থাকতে পারেন বলে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। যদি তাই হয় সেক্ষেত্রে হেতালের মায়ের খুনের সময় উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এই তথ্যকে ভিত্তি করলে একই যুক্তিতে হেতাল পারেখের মা-কেই প্রধান সন্দেহভাজন বলে ধরতে হবে। পরবর্তীতে, অন্য কেউ সন্দেহভাজন হতে পারে। অথচ ধনঞ্জয়কে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, শুধুমাত্র ফ্ল্যাটের ভিতরে তার উপস্থিতির তথ্য ছিল এমন কয়েকটি সাক্ষ্য প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে, যার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে, যারা ধনঞ্জয়কে ঘটনাস্থলে চোখেও দেখেননি। সুপ্রিম কোর্টও হাইকোর্টের সব রায়ের সঙ্গে একমত হতে পারেনি। তবুও তাঁর ফাঁসি বহাল থাকে। বলা হয়, যাদের শুনানিতে সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তারা ধনঞ্জয়ের কেউ শত্রু নয়। ধনঞ্জয় খুন করে থাকতে পারে এমনটাই বলা হয় কারণ হেতালকে উত্ত্যক্ত করতো ধনঞ্জয়। অথচ খুনের সময় তাঁকে দেখা যায়নি। ধনঞ্জয়কে বাঁকুড়ার গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করার আগে এবং খুনের বেশ কিছু সময় আগে থেকে সে কোথায় ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি আদালত। এক্ষেত্রে যে তত্ত্ব ধনঞ্জয়ের নির্দোষিতা সম্পর্কে প্রথমে কাজ করতে থাকে, তা হল বাড়ির লোক ছাড়া কারও পক্ষে অল্প সময়ের মধ্যে ওই কাণ্ড ঘটিয়ে আবাসন থেকে চোখে না-পড়ার মতো চেহারা নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া কঠিন। ধনঞ্জয়কে সে সময় কেউ চোখেই দেখেনি। হেতালকে উত্ত্যক্ত করার কাহিনী ছাড়া ধনঞ্জয়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে অন্যতম বড় প্রমাণ হয়ে ওঠে কেন সে ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ হয়েছিল। “কেন”র উত্তর না পেয়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দেওয়া হয়।

মেডিক্যাল সায়েন্স কী বলছে!

হেতালের পোস্টমর্টেম এবং ফরেনসিক রিপোর্ট ইঙ্গিত দেয়, মৃত্যুর আগে তার যৌন মিলনের ঘটনায় জবরদস্তি ছিল না। সেক্ষেত্রে ধর্ষণের জন্য খুনের প্রসঙ্গ ওঠে না। বরং স্বেচ্ছায় যৌন মিলনের কথা প্রকাশ হয়ে পড়ায় বাড়ির লোকের বিদ্বেষ এবং প্রতিহিংসার ইচ্ছা জন্মে থাকতে পারে। জানা যায়, মৃতদেহ সকলের সামনে “আবিষ্কার” হওয়ার আগে ফ্ল্যাটের সদর দরজা ভাঙার জন্য হেতালের মা যশোমতী দেবীর আচরণ বলছিল, তিনি যেন জানতেন হেতাল জীবিত নেই। অন্যদের সামনে দরজা ভাঙতে তিনি উদ্যোগী ছিলেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা আর ইন্টারকম কিংবা টেলিফোনে মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা তিনি করেননি। মৃতদেহ দেখেই হেতলের মা একা হাতে পাঁজাকোলা করে সেই দেহ তুলে নিয়ে হাসপাতালে যাবেন বলে লিফটে ওঠেন। লিফটটিতে তারপরে তিনি একা দেহ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকেন। সবচেয়ে বড় কথা, পুলিশকে সে সময় ফোন করা হয়নি। হেতাল খুন ‘আবিষ্কার’ হওয়ার পর পুলিশ ডাকতে তিন ঘণ্টারও বেশি দেরি করে পারেখ পরিবার। তার আগে মৃতদেহ বহুবার টানাহ্যাঁচড়া আর খুনের জায়গা দিয়ে বহু লোক চলাফেরা করেছে। পুলিশ আসার পর হেতলের মাকে কিছুটা আড়াল করা হয়েছিল, যদিও খাতায় কলমে খুনের অভিযোগকারিণী তিনিই। খুনের দিন সাতেকের মধ্যে হেতালের মাকে মুম্বই পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যশোমতী দেবী ৪ বার অসুস্থতার অজুহাতে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া এড়ান। এরমধ্যে দুবার তিনি আদালতে হাজির থেকেও সাক্ষ্য দেননি। অন্যদিকে, ধনঞ্জয়ের বাড়ি থেকে যে হাতঘড়ি উদ্ধার হয়, প্রকৃতপক্ষে তাঁর ছিল না বলেও তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। একটা সাজানো ঘড়ি হেতালের মা লালবাজারে গিয়ে সনাক্ত করে আসেন সিরিয়াল নম্বর না মিলিয়েই। পরে পারেখরা চিঠি দিয়ে আদালতের কাছে সাড়ে তিনশো টাকার সেই ঘড়ি ফেরত চান। পুলিশ অকুস্থলে পৌঁছনোর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ধনঞ্জয়কে পলাতক এবং সম্ভাব্য অপরাধী বলে ঘোষণা করে দেওয়ার পিছনে পারেখ পরিবারের হাত ছিল। ধনঞ্জয় কেন খুন করে থাকতে পারে, তার একটা কারণ দাঁড় করানোর জন্য নথিপত্র তৈরিতে হেতালের বাবা অংশ নিয়েছিলেন। হেতালকে ধনঞ্জয়ের উত্যক্ত করার গোটা “কাহিনী” পুলিশকে জানিয়েছিল তার বাড়ির লোক। আর কেউ এব্যাপারে কিছুই জানত না। এ বিষয়ে সঠিক সাক্ষ্য প্রমাণও ছিল না।

অনার কিলিং?

পারেখ পরিবারের তরফে হেতলের মায়ের বাড়ি থেকে বেরনো আর হেতলের বাবার বাড়ি ফেরার সময়ের তথ্য সঠিক কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও আদালতেও সেই বিবৃতি বজায় রাখা হয়। হেতালের পেটে হজম না-হওয়া যে খাবার পাওয়া গিয়েছে, তাতে খাওয়ার পর বা খাওয়া চলতে চলতে মায়ের সঙ্গে সংঘাতে খুন হওয়ায় সম্ভাবনার তত্ত্বের সমর্থন মেলে। হেতাল খুন হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে তার বাবা ৬২ বছর বয়সে, মধ্য কলকাতার নতুন কেনা ৪ কামরার ফ্ল্যাটবাড়ি আর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা ছেড়ে, তাড়াহুড়ো করে সপরিবারে পাকাপাকি ভাবে মুম্বই চলে যান। তখনও হেতাল মামলার সাক্ষ্য নেওয়া শুরু হয়নি। সেই সময় হেতলের দাদার পরীক্ষা সামনে ছিল। এমন কী গোপনীয়তা ছিল যে, মুম্বই যাওয়ার পরও পারেখরা আদালতে মিথ্যা বলেছেন যে, তাঁরা পদ্মপুকুরের ফ্ল্যাটেই থাকেন। পারেখ পরিবার সংবাদ মাধ্যম থেকে বরাবর দূরে থেকেছে। কলকাতা ও মুম্বইয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছে। আশ্চর্যজনকভাবে, ধনঞ্জয়ের দোষ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে উদ্যোগ নেওয়ার বেলায় এই উদাসীনতা দেখা যায়নি। হেতালের বাবার জেরার সময় ধনঞ্জয়ের উকিল এক অদ্ভুত প্রশ্ন করেছিলেন। প্রশ্নটা ছিল, মৃত্যুর কয়েক মাস আগে হেতল রাধেশ্যাম নামে এক পরিচারকের পিঠে ওঠার চেষ্টা করেছিল কিনা, আর সেই নিয়ে রাধেশ্যাম ছাঁটাই হয়েছিল কিনা। হেতালের বাবা এই ঘটনা অস্বীকার করেন। রাধেশ্যাম কাজ থেকে বরখাস্ত হয়েছিল এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। পড়শিরা জানিয়েছিলেন, খুনের আগের দিন মা-মেয়ের উঁচু গলায় কথা কাটাকাটির আওয়াজ পেয়েছিলেন। যৌন মিলনের ঘটনা হেতলের বিদ্রোহের ইচ্ছা থেকেও ঘটে থাকতে পারে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার অনেক পরেই হেতাল বাড়ি ফিরেছিল। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে দীর্ঘ সময় সে কোথায় ছিল তার কোনও ব্যাখ্যা নেই। তদন্তকারীরা সেই ফাঁক বজায় রেখেছেন। হেতাল বাইরে থেকেই যৌন সংসর্গ করে বাড়ি ফিরেছিল সম্ভবত অনেকটা দেরিতে। হেতলের মা বাড়িতে একা অপেক্ষা করছিলেন। এরকম বলা যেতেই পারে, পরিস্থিতি বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত ছিল। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, হেতাল পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল স্কুলের ড্রেস পরে। মৃত্যুর সময় তার পরনে ছিল কালচে রঙের হাফ-হাতা ব্যাগি টি-শার্ট আর গোলাপী মিডি স্কার্ট। অর্থাৎ বাড়ি ফিরে সে জামা পাল্টেছিল। অথচ সিজার লিস্ট থেকে জানা যায়, হেতালের নিম্নাংশের অন্তর্বাসে রক্তের দাগ ছাড়া অন্য দাগ খালি চোখেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ফরেনসিক পরীক্ষায় জানা যায়, নিম্নাংশের অন্তর্বাসে বীর্যও পাওয়া গিয়েছে। হেতলের ছেড়ে রাখা এই অন্তর্বাস তার মায়ের চোখে পড়ে থাকতে পারে এবং অন্তর্বাসের চিহ্ন আসলে কীসের তা অনুমান করে হেতলের মা-এর হাতে মেয়ের বাইরের কারও সঙ্গে যৌন সংসর্গ করার প্রমাণ প্রকট হয়ে থাকতে পারে। হেতালের মা এক্ষেত্রে হেতালকে আক্রমণ করতেই পারেন। হেতাল পারেখের খুনের ব্যাপারে ভবানীপুর থানা প্রথম খবর পেয়েছিল হেতালের বাবার কাছ থেকে। খবর পেয়ে জেনারেল ডায়েরি নথিভুক্ত করা হয়। এতে সময় লেখা হয়েছে রাত ৯.১৫। অর্থাৎ ততক্ষণে ঘটনার বহুঘন্টা পার হয়ে গিয়েছে। তাতে ধনঞ্জয়ের নাম উল্লেখ ছিল না। এই জেনারেল ডায়েরিকে এফআইআর বলে ধরা হয়নি। পরে পুলিশের খাতায় হেতালের মায়ের জবানবন্দি বলে চিহ্নিত নথিকে এফআইআর বলে গণ্য করা হয়। প্রথমে বলা হয়েছিল, হেতাল পারেখ খুন হয়েছিল ১৪ বছর বয়সে। প্রকৃত তথ্য হল, খুনের সময় হেতালের বয়স ছিল ১৮ বছর। সবচেয়ে বড় বিষয় তদন্তে বলা হয়, খুন হয়েছিল আগে, পরে ধর্ষণ। অর্থাৎ আদালতে বলা হয়, মৃতদেহের সঙ্গে যৌন সংসর্গ করা হয়েছিল। ময়নাতদন্তের ফল প্রকৃত তথ্য তুলে ধরে। এখানেই সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি দেখা যায়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী হেতলের যৌন-সঙ্গম হয়েছিল মৃত্যুর আগে। তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল কিনা তা জানার জন্য অন্য কোনও তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়নি। বলা হয়, হেতাল পারেখকে খুন করা হয়েছিল গলায় রুমালের ফাঁস দিয়ে। আসল তথ্য: পুলিশ কুকুর কোনও রহস্য ভেদ করতে পারেনি। এফআইআর-এও এই রুমাল উধাও। প্রত্যক্ষদর্শী নেই, খুনের প্রধান অস্ত্র নেই, সময়ের মধ্যে বিরাট ফাঁক, সর্বোপরি ময়নাতদন্তকে অস্বীকার করে তদন্ত নিজের ধারায় এগিয়ে গিয়ে ধনঞ্জয়কে দোষী সাব্যস্ত করে দেয়। নাটা মল্লিক ফাঁসির রজ্জু পরিয়ে দেন ধনঞ্জয়কে।

 খুন ও বিচার!

জীবনের শেষক্ষণ পর্যন্ত ধনঞ্জয় নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু, মানুষ তাঁর কথা বিশ্বাস করতে চায়নি। ফাঁসির দিন গ্রামের বাড়ির অন্ধকার ঘর থেকে বাইরে বের হননি ধনঞ্জয়ের বৃদ্ধ বাবা। ষাট পেরনো সেই ব্রাহ্মণ পুরোহিত ধনঞ্জয়ের ফাঁসির পর বাড়ির মন্দিরে কালীর থানে প্রার্থনা করেছিলেন যেন মৃত্যুর পর ভাল থাকে তাঁর ছেলে। তবে, তিনি বলেছিলেন একদিন এই বিশ্ব চরাচরেই প্রমাণিত হবে তাঁর ছেলে কতটা নির্দোষ ছিল। ধনঞ্জয়ের বৃদ্ধ বাবা আজ আর বেঁচে নেই। তবে ধনঞ্জয়ের পরিবার কোনদিন বিশ্বাস করেনি তাঁরা সঠিক বিচার পেয়েছেন বলে। তাঁর ভাই বিকাশ চট্টোপাধ্যায় কিছুদিন আগেও বলেছেন, যাঁদের অর্থবল রয়েছে তাঁরা চাইলে সব পারে!” । মৃত্যুর কুড়ি বছর কেটে গিয়েছে। ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে নধনঞ্জয়ের পরিবার। বাঁকুড়ার অখ্যাত গ্রামটির বাসিন্দারা ধনঞ্জয়ের প্রসঙ্গে মনে করেন তারা বিচার পাননি, সুবিচার পায়নি ধনঞ্জয়। ১৯৯০ সালে ১৮ বছরের কিশোরী হেতাল পারেখকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে ১৪ বছর কারাবাসের পর ২০০৪ সালের ১৪ আগস্ট ফাঁসি হয় ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের। ধনঞ্জয়ের ফাঁসির খবরকে কেন্দ্র করে সেই সময় সংবাদের শিরোনামে ছিল বাঁকুড়ার ছাতনার কুলডিহি গ্রাম। কিন্তু, সন্দেহ নেই হারিয়ে গিয়েও এখন রাজ্যবাসীর মনে ঘুরে ফিরে আসছে ধনঞ্জয়। হতে পারে ধনঞ্জয় দোষী ছিলেন? কিন্তু হেতালের মা যশোমতী পারেখও তো সন্দেহের উর্ধ্বে ছিলেন না। অল্প বয়সী হেতাল পারেখের মৃত্যু নৃশংস এবং মর্মান্তিক। কেউ নিশ্চিতভাবেই খুন করেছে, যে কেউ খুন করে থাকতে পারে। দোষীকে চিহ্নিত করে সুবিচার হওয়া অবশ্যই জরুরি ছিল, যে নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এবং অনুমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দোষী সাব্যস্ত করে ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায়। কেঁদে ফিরেছে কুলডিহির বাতাস। আরজিকর কাণ্ডে বা কামদুনির উল্লেখে তো বটেই, যে কোনও খুন-ধর্ষণকাণ্ডে বা যে কোনও মহিলার অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে উপযুক্ত তথ্য প্রমাণের অভাবে সুবিচারের বদলে অবিচার হতে পারে তা যেন আজও বলছে হেতাল পারেখ হত্যাকাণ্ড এবং ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুদণ্ড।।

About Post Author