Home » বাংলাদেশে একের পর পরিবর্তন !মুজিব-ভূমিতে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি !অনেকেই সেনা শাসন চাইছেন , কী ভাবছেন ওয়াকার উজ জামান ?

বাংলাদেশে একের পর পরিবর্তন !মুজিব-ভূমিতে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি !অনেকেই সেনা শাসন চাইছেন , কী ভাবছেন ওয়াকার উজ জামান ?

সময় কলকাতা ডেস্ক:- বাংলাদেশে একের পর পরিবর্তন। বঙ্গবন্ধুর দেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইউনুসের শাসনকালে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি ! সেনাশাসন নিয়ে পূর্বের অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো না হলেও এই পরিস্থিতিতে অনেকেই সেনা শাসন চাইছেন। কী ভাবছেন সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান ? কেনই বা এমন পরিস্থিতি তৈরি হল ওপার বাংলায় ?

আচমকাই অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছে সেনাবাহিনী

বাংলাদেশের পরিস্থিতি হঠাৎ করে পরিবর্তন হয়েছে। ঢাকার পরিস্থিতি বেজায় থমথমে। আচমকাই অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছে সেনাবাহিনী। শহরে সেনার তৎপরতা আগের থেকে তুলনায় বেড়ে গিয়েছে। নতুন করে সেনাবাহিনী মোতায়েন হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি ভেতরে সেনাবাহিনী টহল দেওয়া শুরু করেছে। সবার মুখে একটাই কথা, এতো পট পরিবর্তনের সাক্ষী থেকে দেশ, তবুও এমন পরিস্থিতি বিগত কয়েক মাসে দেখা যায়নি। চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশালের মতো বিভাগীয় শহরগুলিতেও সেনার তৎপরতা বেড়েছে। অনেকের মতেই, সেনা বাহিনী ইউনুস সরকারকে হটিয়ে দেশের ভার নিজেদের হাতে নিতে পারে। সেই কারণে ঢাকার লাগোয়া ক্যান্টনম্যান্টগুলি থেকে সেনাবাহিনীকে ঢাকায় আনা হচ্ছে। এই তৎপরতা এমন সময় শুরু হয়েছে যখন শেখ হাসিনাকে সরানো ছাত্র নেতৃত্বের সঙ্গে সেনাবাহিনীর তীব্র বিরোধ তৈরি হয়েছে আওয়ামী লিগকে নিয়ে। সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান আওয়ামী লিগকে নিয়ে নির্বাচন করতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
তবে ছাত্র নেতৃত্ব বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি সেই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতায় নেমেছে। শুক্রবার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর ফেসবুক পোস্ট নিয়ে। বর্তমানে তিনি ছাত্রদের নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক। আওয়ামী লিগের একাংশকে সামনে রেখে দলের পুনর্বাসনের চেষ্টা হচ্ছে বলে এক ফেসবুক পোস্টে বিস্ফোরক দাবি করেন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। এদিকে, শুক্রবার সন্ধ্যায় সাংবাদিক বৈঠক ডেকে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সরব হয় ছাত্ররা। হাসনাত আবদুল্লাহ, নাহিদ ইসলামরা অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনী রাজনীতিতে নাক গলাচ্ছে। আওয়ামী লিগকে ময়দানে ফেরাতে চাইছে সেনাবাহিনী।

হাসনাতের দাবি

শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাতে মুখ্য ভূমিকা নেওয়া হাসনাতের দাবি ‘উত্তরপাড়া’ এবং ভারত আওয়ামী লিগকে ফেরাতে তৎপর। হাসনাতের দাবি, সেনা কর্তাদের একাংশ তাঁকে বলেছেন, রিফাইন্ড আওয়ামী লিগকে ভোটে দাঁড়াতে দেওয়া উচিত। অবাধ নির্বাচনের জন্য এটা দরকার। ছাত্রদের নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাতের এই ফেসবুক পোস্ট নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে তুমুল শোরগোল শুরু হয়। সে দেশে উত্তরপাড়া বলতে ক্যান্টনমেন্ট বা সেনা সদরকে বোঝায়। হাসনাত সেই পোস্টে লিখেছেন, সেনা কর্তাদের একাংশ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রস্তাব দেয় নতুন আওয়ামী লিগকে মেনে নিতে। তিনি জানান, দেশে থাকা আওয়ামী লিগের নেতা সাবের হোসেন চৌধুরী এবং শিরীন শারমিন চৌধুরীর নেতৃত্বে নতুন আওয়ামী লিগের আত্মপ্রকাশ ঘটবে বলে তাঁকে জানানো হয়। তিনি অবশ্য সেনার প্রস্তাবে রাজি হননি। সাবের হোসেন চৌধুরী সাবেক মন্ত্রী এবং শিরীন শারমিন জাতীয় সংসদের প্রাক্তন স্পিকার। হাসনাত দাবি করেছেন, সেনা কর্তারা তাঁকে বলেছেন, আওয়ামী লিগের ওই নেতারা আওয়ামী লিগ থেকে বেরিয়ে আসবেন৷ তাঁরা শেখ হাসিনার জমানার নিন্দা করবেন৷ তাঁরা হাসিনা জমানার অপকর্মের জন্য ক্ষমা চাইবেন।
তাঁরা শুধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে রাজনীতি করবেন। হাসনাত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নুর তাপসের নামও করেছেন। ঘটনাচক্রে তিন নেতাই শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ। ফজলে নুর তাপস আওয়ামী লিগ নেত্রীর আত্মীয় এবং যুব লিগের সভাপতি। শিরীন শারমিন চৌধুরীকে হাসিনা প্রকাশ্যে তাঁর মেয়ে বলে উল্লেখ করে থাকেন। সাবের হোসেন চৌধুরীও নেত্রীর ঘনিষ্ঠ। হাসনাতের এই দাবির পরই রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে, হাসনাতের কথা সত্যি হয়ে থাকলে সাবের হোসেন চৌধুরী, শিরীন শারমিনদের বিষয়ে শেখ হাসিনা কি অবগত? আওয়ামী লিগ কি ভেঙে যাচ্ছে? হাসনাতের এই তাত্পর্যপূর্ণ পোস্ট নিয়ে চর্চা একদিকে চলছে, তার পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে, আচমকাই অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছে সেনাবাহিনী। শহরে সেনার তৎপরতা আগের থেকে তুলনায় বেড়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে সে দেশে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে তাতে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাওয়া অসম্ভব নয়, মনে করছেন অনেকেই।

তেমন পরিস্থিতি এড়াতে হলে সেনা শাসনই একমাত্র বিকল্প বলে অনেকেই মনে করছেন

তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হল, গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তীব্র হয়েছে মহম্মদ ইউনুস সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার একটি মন্তব্যের পর। একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, গত বছর ৫ অগাস্ট শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে শেখ হাসিনার সরকারের পতন না হলে তারা সশস্ত্র পথে সরকারকে উৎখাত করার পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন। সেই মতো প্রস্তুতি নেওয়া ছিল এবং সশস্ত্র রাস্তায় হাঁটার ডাক দিতে আগাম ভিডিও বিবৃতি রেকর্ড করা ছিল। ইউনুসের এই উপদেষ্টার কথা বর্তমানে ভিন্ন মাত্রা পেয়ে গিয়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারানোর পর বারে বারে অভিযোগ করেছেন, অস্ত্র হাতে তাঁর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। তিনি ক্ষমতায় থেকে গেলে দেশ রক্তে ভাসত। কারণ আন্দোলনকারীদের হাতে বিপুল অস্ত্রসস্ত্র ছিল।
উপদেষ্টা আসিফের কথা অনুযায়ী তাদের কাছে অস্ত্র মজুত ছিল। অনেকেই বলছেন, সেই অস্ত্রের জোরেই ছাত্রদের নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধেও সুর চড়িয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ হল উপদেষ্টা আসিফ এমন সময় রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের সম্ভাবনার কথা বলেছেন, যখন সেনা বাহিনী দেশে বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছিল। একই সময় সেনার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানকারী ছাত্র নেতৃত্ব অভিযোগ করে সেনা বাহিনী আওয়ামী লিগকে রাজনীতিতে ফেরাতে চাইছে। আওয়ামী লিগকে রাজনীতিতে ফেরানো নিয়ে আপত্তি তুলেছে দুই উগ্র ইসলামিক দল জামায়াতে ইসলামি এবং হেফাজতে ইসলাম। তারাও সেনা বাহিনীর উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়েছে শেখ হাসিনার দলকে কোনও অবস্থাতেই রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া যাবে না।

গোয়েন্দাদের সূত্র বলছে

লুঠ হওয়া অস্ত্রের বেশিরভাগই জামায়াতে ইসলামি, হেফাজতে ইসলাম, হিজব-উত তাহিরির মতো উগ্র ইসলামিক দলগুলির নেতা-কর্মীদের হাতে আছে। গৃহযুদ্ধ শুরু হলে যাদের ঠেকানো কঠিন হবে। এই পরিস্থিতিতে সেনা বাহিনীর প্রশাসনকে নিজেদের কব্জায় না নিয়ে শক্ত অবস্থান নেওয়া কঠিন। তবে বর্তমান সেনা প্রধান ওয়াকার উজ জামান বাহিনীকে আরও সক্রিয় করলেও ক্ষমতা হাতে তুলে নেওয়ার ব্যাপারে এখনও কোনও আভাস দেননি। তিনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, সেনার হাতে ক্ষমতা তুলে নিতে আগ্রহী নন তিনি। যদিও দেশের পরিস্থিতির অবনতি হলে সেনা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না বলেও জানিয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয় হল, অতীতে সেনা শাসন নিয়ে মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে থাকত। এখন অনেকেই চাইছে যত দ্রুত সম্ভব সেনাবাহিনী দেশের ভার নিজেদের হাতে তুলে নিক।

বাংলাদেশে দীর্ঘ সেনা শাসনের ইতিহাস রয়েছে

এখনই সেনার ক্ষমতা দখলের আদর্শ সময়। বাংলাদেশে দীর্ঘ সেনা শাসনের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার কয়েক মাস পরেই ক্ষমতা দখল করেন সেনা প্রধান জিয়াউর রহমান। ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপি গঠন করেন তিনি। ১৯৮১ সালে তিনি বিক্ষুব্ধ সেনার হাতে নিহত হওয়ার পর কয়েকমাসের মাথায় দেশের শাসনভার কব্জা করেন আর এক জেনারেল মহম্মদ এরশাদ। ১৯৯০-এ গণ আন্দোলনের মুখে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর বিএনপি দু-দফা এবং আওআমী লিগ এক দফা দেশ শাসন করে। ২০০৬-এ বিএনপি-র দ্বিতীয় দফার সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশে অস্থির পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথম তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টা হয়ে সরকার পরিচালনা করেন। কিন্তু পরের বছর অর্থাৎ ২০০৭-এর ১১ জানুয়ারি তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে গিয়ে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। তারপর বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির প্রেক্ষিতে গঠিত হওয়ায় ওই সরকারকে এক এগারোর সরকারও বলা হয়ে থাকে। সেই সরকার ছিল সেনা নিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশের সংবিধানে তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ছিল, যা এখন নেই। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেরও সংবিধানে কোনও অস্তিত্ব নেই। তাই এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লিগ সহ বাংলাদেশের অনেক দল চাইছে এক এগারোর সরকারের মতো সেনা বাহিনী দেশ নিয়ে আরও সক্রিয় হোক।
সেনা শাসনে বাংলাদেশের মানুষের অভিজ্ঞতা ভাল নয়
যদিও দীর্ঘ সেনা শাসনে বাংলাদেশের মানুষের অভিজ্ঞতা ভাল নয়। বহু আন্দোলন সংগ্রামের বিনিময়ে দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ফিরেছিল। কিন্তু দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেকেই মনে করছেন, সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকারই এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভাল বিকল্প। বিশেষ করে দেশকে বেআইনি অস্ত্র মুক্ত করতে সেনার হাতে ক্ষমতা নেওয়া প্রয়োজন বলে অনেকেই মনে করছে। এদিকে, আওয়ামী লিগ নেতারা চাইছেন সেনা বাহিনী যদি ক্ষমতা দখল নাও করে তদের উচিত দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে সেনা আইন অর্থাৎ মার্শাল ল লাগু  করে দেওয়া। যদিও এই মুহূর্তে দেশের বৃহত্তম দল বিএনপি সেনা শাসনের পক্ষপাতী নয়। তারা মনে করছে সেনার হাতে ক্ষমতা গেলে নির্বাচন দু-তিন বছরের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে। ততদিনে আওয়ামী লিগ নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারবে। সেক্ষেত্রে বিএনপি-র ক্ষমতায় ফেরা কঠিন হয়ে যেতে পারে। তবে পক্ষে-বিপক্ষে হাজারো যুক্তি থাকলেও ভবিষ্যতে কী হতে চলেছে বাংলাদেশে, তার উত্তর সময়ই দেবে।

About Post Author