Home » লছিপুর এক নরকের নাম

লছিপুর এক নরকের নাম

সময় কলকাতা ডেস্ক: লছিপুর জায়গাটি পশ্চিমবঙ্গ এবং ঝাড়খন্ড সীমান্ত লাগোয়া এন এইচ ২ অর্থাৎ দুই নম্বর জাতীয় সড়কের উপর অবস্থিত। আসানসোল থেকে নিয়ামতপুরের দিকে গেলেই রাস্তার পাশেই পড়বে লছিপুর।রাস্তার পাশেই বিশাল গেট তাতে লেখা দিশা জনকল্যাণ কেন্দ্র লছিপুর। দিনের বেলায় যাওয়ার সময় কেউ নজর করলেই দেখতে পাবেন শান্ত একটি পাড়া। গেটের ভিতরে আছে দোকান আর ছোট ছোট অসংখ্য বাড়ি আর কুটির শিল্পের কয়েকটি কেন্দ্র যেখানে হাতের কাজ সহ অন্যান্য কুটির শিল্পের কাজ শেখানো ও উৎপন্ন করা হয়। দিনের শেষে সূর্যি মামা যেই নিজে গা ঢাকা দিয়ে জগৎ সংসারকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করল ঠিক তখনই লছিপুর এই শান্ত পাড়ায় একে একে জ্বলে ওঠে অসংখ্য আলো, শুরু হয় ব্যস্ততা। রাতের লছিপুর হয়ে যায় এক মায়ানগরী ,এক মিনা বাজার।

মিনা বাজার বলার কারণ লছিপুরে অবস্থিত দিশা জনকল্যাণ কেন্দ্র। যেখানে মূলত যৌনকর্মীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে সরকারের তরফ থেকে। সেই লছিপুর রাতের  হয়ে যায় দুষ্কৃতীদের স্বর্গরাজ্য। পাশেই ঝাড়খন্ড সীমান্ত, ঝাড়খন্ড সহ বর্ধমান, বাঁকুড়ার দুষ্কৃতীরা রাতে জমা হয় এই লছিপুরের নিশ্চিন্ত ডেরায়। গেটে থাকে নামমাত্র পুলিশ যদিও তাদের সঙ্গে দুষ্কৃতীদের অবৈধ সংযোগের কথা বারবার উঠে এসেছে প্রকাশ্যে। কিছু টাকার বিনিময়ে পুলিশ এসব দেখেও চোখ বুজে থাকে এই অভিযোগ উঠেছে বারবার। ফলে অন্যত্র অপরাধ করে রাতের বেলায় লছিপুরে নিশ্চিন্তে একটা রাতের জন্য গা ঢাকা দেওয়াতে অপরাধীরাও হয়ে উঠেছে অভ্যস্ত।

পুলিশের সঙ্গে লছিপুরের যৌনপল্লীর দালালদের যে অবৈধ যোগাযোগ রয়েছে সেটা প্রকাশ্যে এসেছিল ২০০৭ সালে। সংবাদপত্রের শিরোনামে উঠে এসেছিল নিয়ামতপুর আউট পোস্টের শিবরাত্রির অনুষ্ঠান। যে অনুষ্ঠানে পুলিশের সামনেই চটুল গানে নৃত্য করেছিল লছিপুরের যৌনকর্মীরা। রাজ্যজুড়ে পড়ে গিয়েছিল শোরগোল। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লছিপুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ২১ জন নাবালিকাকে। যাদের জোর করে যৌন কাজে ব্যবহার করার জন্য ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। অর্থাৎ লছিপুরের এই যৌনকর্মীদের দালালদের সঙ্গে পুলিশের একটা অবৈধ যোগাযোগ বরাবরই ছিল। তাই গেটে পুলিশ থাকলেও রাতের লছিপুরে ঘটে অসংখ্য অসামাজিক কাজ।

যৌনকর্মীদের পুনর্বাসন এবং মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য তৎকালীন আসানসোলের পুলিশ আধিকারিক সৌমেন মিত্রর তত্ত্বাবধানেই মূলত শুরু হয়েছিল দিশা জনকল্যাণ কেন্দ্র। তারপর পেরিয়ে গেছে বহু বছর দিশা জনকল্যাণ কেন্দ্রে যৌনকর্মীদের বিভিন্ন ধরনের কুটির এবং হস্তশিল্পের ট্রেনিং দেওয়া হয় পাশাপাশি দুর্বার সমিতির পক্ষ থেকে তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হত। কিন্তু বর্তমানে লছিপুরের যৌনকর্মীদের কোনরকম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় না ,বন্ধ হয়েছে ২০১৭ সাল থেকেই। সারা বিশ্বের মানুষ যখন স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন ,এইচআইভি এর বিরুদ্ধে লড়াই চলছে বিশ্বজুড়ে তখন লছিপুরের যৌনকর্মীদের কনডোম ছাড়াই যৌন কর্মে লিপ্ত হতে হয়। কারণ দীর্ঘ যুগ ধরেই কনডোম সরবরাহ বন্ধ লছিপুরে ।

এখনও পর্যন্ত লছিপুর চবকা সিতারামপুর, এই তিন যৌনপল্লীতে ১১৫০ জন যৌনকর্মী থাকেন। যাদের মধ্যে ৪৭ জনের এইচআইভি ধরা পড়েছে। তাদের না হচ্ছে চিকিৎসা না হচ্ছে স্বাস্থ্যের পরীক্ষা কারণ যারা এই চিকিৎসার ব্যবস্থা করত অর্থাৎ দুর্বার সমিতি, তাদের কাছে সরকারি অনুদান এখন বন্ধ।দুর্বারের এক কর্মকর্তার বক্তব্য ২০১৮ সালের পর থেকে সরকার এক প্রকার অনুদান বন্ধ করে দিয়েছে। দুর্বার সমিতির নামে খোলা হয়েছিল দুটো আলাদা একাউন্ট একটি খুলেছিল সরকারের তরফ থেকে তারপর থেকে দুটো একাউন্টে টাকা আসা প্রায় বন্ধ। অর্থের অভাবে তারা যৌনকর্মীদের কোন পরিষেবায় দিতে পারছেন না। ফলে যৌনকর্মীরা দিনের পর দিন চলে যাচ্ছেন আরো অন্ধকারে। ইতিমধ্যে প্রায় ১৪ জন যৌন কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এইচআইভি পজেটিভ টেস্ট না করার কারণে বোঝা যাচ্ছে না যে আর কত জনের মধ্যে এই রোগ বাসা বেধেছে। বারবার সরকারের কাছে আবেদন করেও কোন সদুত্তর মেলেনি।

সরকার বিগত বহুদিন ধরেই কণ্ডোমসহ স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে প্রতিদিন বাড়ছে যৌনকর্মীদের মধ্যে সংক্রমণ। আস্তে আস্তে নরকে এ পরিনত হচ্ছে লছিপুর। প্রায় একই অবস্থা চবকা এবং সিতারামপুরের। এখনই যদি সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেয় তাহলে আগামী দিনে হয়তো পৃথিবীর বুকে এক জীবন্ত নরক এ পরিনত হবে লছিপুর।

About Post Author