পুরন্দর চক্রবর্তী : তিনি আমাদের কাছে প্রকৃত অর্থেই বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই। ১৯৫৫ সালে রাইকমল সিনেমা মুক্তি পেতেই বাংলা চলচ্চিত্র খুঁজে পেল এমন এক নায়িকাকে তিনি তাঁর ৮৫ তম জন্মদিনেও রয়ে গেছেন দর্শকদের মনের মনিকোঠায় । তিনি কাবেরী বসু, যাঁর চন্দ্রানী মুখের হাসির পেছনে লুকিয়ে ছিল গভীর দুঃখ ও কান্না।
উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর আমি সে ও সখা অথবা সত্যজিৎ রায়ের অরণ্যের দিনরাত্রি চলচ্চিত্র আজও দর্শকদের চোখে ভাসে। খুব বেশি চলচ্চিত্র তিনি যে করেছেন এমনটা নয়।খুব কম সময়ে এত দাগ ফেলে যেতে খুব কম শিল্পী ফেলেছেন।৩৯ টি বসন্ত দেখে না যেতে পারা কাবেরী বসু দর্শকদের চোখে রূপকথার নায়িকা হয়ে থাকলেও তাঁর জীবনের একটা বড় অধ্যায় কেটেছে শুধু শোক আর রোগ যন্ত্রণার মধ্যে।

১৯৩৮ সালের ২৮ মার্চ জম্ম তাঁর।কাবেরী বসুর গায়ের রং কালো হওয়ায় তাঁর বাড়ির নাম দেওয়া হয় ভুতু। শ্যামলবরণী কাবেরী রবীন্দ্রনৃত্যে পারদর্শী ছিলেন। মাত্র ষোলো বছর বয়সে রাইকমল সিনেমায় আত্মপ্রকাশ। এক বছরের সামান্য বেশি সময়ে প্রায় একটানা কয়েকটি সফল বাণিজ্যিক উপহার দেওয়ার পরে অজিত চট্টোপাধ্যায়কে বিয়ে করে সিনেমা জগত ছেড়ে পরিপূর্ণ ভাবে সুখী ঘরণী হয়ে ওঠেন আর স্বামীর সঙ্গে প্রবাসী হয়ে যান। দুই কন্যা আর এক পুত্রকে নিয়ে সুখের সংসার গড়ে তোলেন অজিত -কাবেরী।চোদ্দো বছরের বিবাহিত জীবন এক লহমায় একটি পথ দুর্ঘটনায় অবসান হয়ে যায়। এই চোদ্দো বছরের মধ্যে অরণ্যের দিনরাত্রিতে আবার ফিরে আসেন দর্শকের কাছে। আবার প্রস্থান এবং ১৯৭০ সালের ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় যা তাঁর জীবনে নিয়ে আসে এক অতলস্পর্শী অন্ধকার।

দার্জিলিং যাওয়ার পথে তাঁর গাড়ি দুর্ঘটনাগ্রস্থ হয় যে গাড়িতে তিনি ছাড়াও ছিলেন স্বামী ও ছোট মেয়ে টিনা ও এক সদ্য পরিচিত যুবক। গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েছে বুঝে স্বামী অজিত কন্যাকে নিয়ে ঝাঁপ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করলেও পাথরে লেগে তাঁর মাথার খুলি চুরমার হয়ে যায়। কাবেরী ও যুবক সহ গাড়ি পড়ে খাদে। মেয়েকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে যে পরের দিন মারা যায় ঘটনার আকস্মিকতার ‘শকে’। কাবেরীর গাড়ি উদ্ধার হয়। একের পরে এক অস্ত্রোপচারের পরে পরে কিছুটা হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে থাকেন কাবেরী। কেটে যায় কিছুটা সময়। চিকিৎসার খরচ ও এক পুত্র ও কন্যাকে নিয়ে সংসার।আর্থিক স্বচ্ছলতা কমে আসে। ফলশ্রুতি,অশক্ত শরীরে চলচ্চিত্র জগতে ফেরেন কাবেরী। প্রথমে শরীর টানত না। এমনও হয়েছে শুটিং করতে গিয়ে সংজ্ঞা হারিয়েছেন। তবুও হাল ছাড়েন নি,শেষের কয়েকটা বছর কয়েকটি সিনেমায় তাঁর দক্ষতার সাক্ষর তিনি রেখেছিলেন। কাজের জীবন নতুন করে বড় হওয়ার ফাঁকে তাঁর জীবন ছোট হয়ে আসতে থাকে।৭৬ সালের শেষ দিকে পাকস্থলীর ক্যান্সার ধরা পড়ে। পরের বছর ফেব্রুয়ারীতে তাঁর শোকসন্তপ্ত জীবনে ইতি পড়ে যায়। মাটিতে স্বর্গ নেমে আসার স্বপ্নের অবসান হয়ে যায় বড্ড অসময়ে।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
বেজি কি সাপের বিষে কাবু হয় না?