Home » দেবাদা ও তাঁর কোচিং ক্যাম্প

দেবাদা ও তাঁর কোচিং ক্যাম্প

সময় কলকাতা স্পোর্টস ডেস্ক : অনেক কুঁড়ি ঝরে যায় পরিচর্যার অভাবে। ফুটবল মাঠেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভারা অনেকেই বিকশিত হতে পারত না দেবা দার মত শিক্ষক না থাকলে। গত পঁয়তিরিশ বছর ধরে বারাসাতের কয়েকটি ফুটবল মাঠে সকাল বিকেলে শোনা যাবে দেবাদার গলা,”ফাইট, ফাইট “। দিবাকর বসু বা দেবাদার মত মানুষরা নিঃশব্দে নিজেদের কাজ করে চলেন বলেই আজও হারিয়ে যায় নি ফুটবল।

বারাসাত ছাড়িয়ে জেলা, কলকাতা ও রাজ্যের মাঠে ময়দানে, সাইড লাইনের পাশে ” ছেলেদের “লড়াইয়ের কথা বলে উদ্বুদ্ধ করা ফুটবল শিক্ষাগুরু দেবাদার জীবনে মূলমন্ত্র নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও নাছোড়বান্দা লড়াই।মার্ক টোয়েন বলেছিলেন -‘ সত্য বাস্তবের চেয়ে ও আশ্চর্যজনক’। মতি নন্দীর ‘কোনি’ উপন্যাসের শিক্ষাগুরু ক্ষিতদা নামে পরিচিত ক্ষিতিশ সিনহা বলতেন “ফাইট, কোনি ফাইট”।উপন্যাস তথা পর্দার ক্ষিতদা লড়তেন একজনকে নিয়ে। আর দেবাদা নামে পরিচিত দিবাকর বসুর লড়াই শয়ে শয়ে ফুটবলারকে নিয়ে। ফুটবলার গড়ার কারখানা দেবাদার। মূলত গরীব ঘরের ট্যালেন্ট সার্চ করে তুলে আনেন। খুদে প্রতিভার অনেকেই আদিবাসী ছেলে।জহুরীর চোখে ফুটবল মাঠের হীরে তুলে আনার কাজ করে চলেছেন দেবাদা। লক্ষ্য,গ্রামগঞ্জের বা মফস্বলের ছেলেদের বড় ক্লাবে প্রতিষ্ঠিত করা বা দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরা। নিজের বাড়িতে গরীব ছেলেদের রেখে নিজের শেষ কপর্দক খরচ করা দেবাদা শিক্ষক হিসেবে জাতীয় শিক্ষকের সম্মান পান নি।কিন্তু গ্রাম বাংলার উঠে আসা ছেলেদের কাছে পরিচিত নাম দেবাদা। “দেবাদার কোচিং ক্যাম্প” জেলার থেকে উঠে আসা ফুটবলারদের কাছে ফুটবলের আতুরঘর।

দ্রোণাচার্য সম্মানে ভূষিত না হয়েও তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ফুটবল ময়দানের দ্রোণাচার্য।উদীয়মান খেলোয়াড় তুলে আনতে জীবন পণ করা শিক্ষক দেবদার দেখানো পথ ধরে অনেক ফুটবলারের জীবনে এসেছে সাফল্য ।সফলতার পরে তাঁরা কেউ তাঁকে মনে রেখেছে, কেউ ভুলেছে। দেবাদা সমস্ত কিছু অতীতের গর্ভে বিসর্জন দিয়ে আবার অনুশীলন শুরু করেছেন খুদে আর কচি কাঁচাদের মধ্যে থেকে দেশের ভবিষ্যতদের খুঁজে আনার তাড়নায়।

৫৫  বছরের দিবাকর বসু পেশায় বারাসাত পৌরসভার কর্মী। দেবাদার কাছে তালিম পেয়ে তাঁর হাত ধরে ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহামেডান, ডেম্পো সহ দেশের প্রথমসারির ক্লাবে খেলেছে অনেকেই। দেশের হয়ে ও খেলেছে কেউ কেউ। লেফট ব্যাক দেবব্রত রায় বা গোলকিপার অরিন্দম ভট্টাচার্য সহ আন্তর্জাতিক মানের বহু ফুটবলারই ময়দানকে দেবাদার উপহার। কিন্তু ক্রিকেটের স্যার দুখীরাম মজুমদার বা ল্যাংচাদার মত দেশজোড়া খ্যাতি তাঁর নেই।কিন্তু নিজের আয়ের সব টাকা তাঁর  ফুটবল কোচিং ক্যাম্পের ছেলেদের উন্নতির পেছনে, চোট আঘাত সারানোর জন্য ফুরিয়ে যায়। ছেলেদের নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটতে হয়।মাঝে মাঝে ছেলেদের ক্রীড়া সরঞ্জাম বা অন্য সুযোগ সুবিধার জন্য মাঝে মধ্যেই ধার করতে হয়।কিছুতেই পরোয়া নেই দেবাদার। এভাবেই তো ছাত্রদের জন্য কয়েক দশক কেটেছে।

ইদানীং  ক্রীড়াতে আরও বেশি মনোনিবেশ আর সংসারে উদাসীনতার অভিযোগ তাঁর দীর্ঘদিনের বৈবাহিক জীবনে সাময়িক ভাঙ্গন ধরিয়েছে। পরোয়া করেন নি দেবা দা। বিগত পুরসভা ভোটের সময় ব্যক্তিগত জীবনে জটিলতা বেড়েছে।দেশে ভালো মাপের ফুটবলার দিতে তাঁর লড়াই তবুও অব্যাহত।

বলাবাহুল্য,ক্রীড়াশিক্ষক হিসেবে দিবাকর বসুর মূলমন্ত্র নিষ্ঠা ও সংগ্রাম। তাই উত্তর চব্বিশ পরগণার বারাসাতের ফায়ার ব্রিগেড মাঠে প্রায় প্রতি সকালে গেলেই দেখা যাবে দেবাদাকে। দেখা যাবে বিভিন্ন বয়সী ফুটবল ছাত্রদের নিয়ে ফিটনেস ট্রেনিং, অফ দ্য বল, উইথ দা বল তাঁর কোচিং। লড়াই জারী শিক্ষাগুরু দেবাদার, শয়নে স্বপনে জাগরণে লড়াই। বারাসাত ছাড়িয়ে জেলা ও দেশের মাঠে ময়দানে দেবাদার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে ” ফাইট, বয়েজ ফাইট “।।

About Post Author