Home » কালী নামের কবচমালা

কালী নামের কবচমালা

 

তুহিন চক্রবর্তী,সময় কলকাতা:  মা কালী সনাতন ধর্মে অত্যন্ত জাগ্রত। ভক্তের কাছে তিনি মা কালী। তিনি করালবদনী ত্রিনেত্রা। উগ্রা এলোকেশী চতুর্ভূজা। শবরূপী মহাদেবের হৃদয়পরি অধিষ্টিতা। কালী শব্দের আক্ষরিক অর্থ কী? কেন তার নাম কালী?তার চতুর্ভূজা মূর্তির রহস্যই বা কী? তন্ত্রমতে কেন দেবাদীদেবের হৃদয়ে অধিষ্ঠান তার? আসুন জানার চেষ্টা করি।

তান্ত্রিক ও জ্ঞানী পন্ডিত দের মতে এবং তন্ত্র ও শিব পুরান মতে কালী শব্দের অর্থ হলো কাল। কাল অর্থাৎ সময়। অর্থাৎ যিনি জন্মদাত্রী, মোক্ষ দাত্রী প্রাণ দাত্রী, জন্ম মৃত্যু প্রলয় প্রতিটি সময়কে যিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন। দেবী কালী জন্ম মৃত্যু, পালকত্রী, ও প্রলয়কারিণী প্রতিটি সময়ের নিয়ন্ত্রক বলেই তার নাম ‘কাল’ যুক্ত ‘ঈ’ কালী।ঈ উচ্চারণ এখানে ঈশ্বরী বা স্বগুণ নির্গুণ ব্রহ্মকে উপলব্ধি করার জন্য।কালীর বর্ণ কালো কেন তার মধ্যেও রয়েছে রহস্য। তন্ত্র ও মহা অনির্বাণ তত্ত্ব বলছে যে-শ্বেত পীতাদি বর্ণ  কালো বর্ণে বিলীন হয়ে যায়। ঠিক তেমনি যারা ব্রহ্ম জ্ঞান তন্ত্র জ্ঞান লাভ করছেন তারা নির্গুণা কল্যাণময়ী কালশক্তির সঙ্গে কালো বর্ণ নিরুপন করছেন। যেহেতু কাল বা সময়, সময় চক্র সম্পূর্ণ কৃষ্ণবর্ণে ঢাকা তাই কালী কৃষ্ণ বর্ণা। দেবী কালীর কৃষ্ণ বর্ণের ব্যাখ্যা এমনটাই মেলে।

দক্ষিণা কালীর নামের ব্যাখ্যা অবশ্য স্বতন্ত্র। বেলুড়মঠ বা দক্ষিনেশ্বর মন্দিরে রামকৃষ্ণদেব থেকে স্বামী বিবেকানন্দ, সাধক তোতাপুরী সকলেই মাকে ডাকতেন মা দক্ষিণা কালী বলে।  আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে নবদ্বীপের বিশিষ্ট তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ এই দক্ষিণা কালী মূর্তির প্রচলন করেন।দক্ষিণ পদ আগে বাড়ানো থাকে, দয়া দাক্ষিণ্য প্রদান করেন তাই দক্ষিণা কালী।

পুরানমতে কালীর নামের ব্যাখ্যা ভিন্ন।মহাকাল সংহিতা বা শিব পুরান মতে দক্ষিণ দিকে যমের অবস্থান। তাই কালী নামে ভীত হয়ে যম পলায়ন করে। তাই দক্ষিণ দিকে দেবীর মুখমন্ডল তাই ত্রিজগতে এই কল্যাণী মাতা দক্ষিণা কালী নামে পরিচিতা। পুরুষের নাম দক্ষিণ। অর্থাৎ পুরুষ দক্ষিনাঙ্গ স্বরূপ। স্ত্রী বা নারী হলো শক্তি শক্তি হলেন বামা। বামা অর্থাৎ বামাঙ্গ স্বরূপ। অর্থাৎ দেবী কালী স্ত্রী পুরুষ উভয়েই আছেন। অর্থাৎ বামশক্তি কে জাগরিত করে তিনি পুরুষকে জয় করে স্বয়ং দক্ষিণানন্দে নিমগ্না হয়ে থাকেন বাম ও দক্ষিণ দুই অংশই তার প্রভাব ও শক্তিতে পূর্ণ হয়। আর তখন এই করালবদনী কল্যাণী সদানন্দ রূপিণী দেবী জীবকুলকে মোক্ষ দান করেন তাই তার নাম দক্ষিণা কালী। এই দেবীর আরাধনায় সাধক পুন্য নিষ্ঠা ও মোক্ষ লাভ করে থাকে। এই দেবীর পূজা এখন সবার ঘরে ঘরে। কথিত আছে মহাকাল যজ্ঞে সর্বপ্রথম জিজ্ঞাহুতি ও দক্ষিণা দান করা হতো দেবী কালী কে, আর সেখান থেকে দেবীর দক্ষিণা কালী।

পুরান মতে দেবীর কালীর মূর্তির বৈশিষ্ট হলো মায়ের ডান উর্ধ হস্তে তিনি প্রদান করছেন বরাভয়। নিম্ন ডান হস্তে প্রদান করছেন মোক্ষ, জীব কুলকে প্রদান করছেন আরোগ্য, দয়া মায়া, নির্বাণ ও মুক্তি। দিচ্ছেন প্রণামৃত। তার উর্ধ বামহস্তে প্রজ্বলিত খড়্গ শত্রু হানি ও বিনাশের প্রতীক। নিম্ন বাম হস্তে ধরেছেন মুণ্ড অর্থাৎ জীবকুলের দূরবুদ্ধি, অসৎ চিন্তা, পাপবুদ্ধি সবকিছুকে মুন্ডের কেশে ধারণ করে তিনি মুষ্টিবদ্ধে আবদ্ধ করেছেন। লাল জিভা রজসের প্রতীক। কোমরে হস্ত বন্ধন মোহমুক্তি ও উন্মুক্ত স্তনযুগল মাতৃস্নেহ, নির্বাণ মুক্তির প্রতীক।সর্বোপরি দৃষ্টান্ত দেবীর পদতলে দেবাদিদেব মহাদেব এটা সকলেই জানি যে মহাকালীর সাথে মহাকালের একসাথে থাকা সৃষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখে। তাই তাকে বলা হয় ঘোরদ্রঙ্গষ্ঠাঙ করালাস্যাঙ পিন্নণত পয়ধরাম। শবোরূপ মহাদেব হৃদয়পরি সংস্থিতাম।

About Post Author