Home » চোগ্যালের দেশে : সিকিম যাত্রার অভিজ্ঞতা

চোগ্যালের দেশে : সিকিম যাত্রার অভিজ্ঞতা

দেবিকা চট্টোপাধ্যায় (অতিথি লেখিকা), সময় কলকাতা [কিস্তি ২]: সিকিম-যাত্রার পথে,রাস্তার প্রতিটি বাঁকে আমাদের জন্য লুকিয়ে ছিল নতুন নতুন অভিজ্ঞতার ভান্ডার। সিকিম-যাত্রার পথে করোনেশন ব্রীজ ছাড়িয়ে যত এগোচ্ছিলাম রাস্তার দুই পাশের প্রকৃতির ততই বদল ঘটছিল।সিকিম অর্থাৎ দু পাশে রংবেরং এর ফুলের সমারোহ। লম্বা লম্বা গাছের জঙ্গলের মধ্যেই নাম না জানা ছোট ছোট গাছের ঝোপঝাড়ের মধ্যে ছোট বড় নানা ফুল ফুটে আছে। কিছু বড় বড় গাছেও ফুল দেখতে পেলাম। আমাদের ড্রাইভার দোরজি গাছপালা খুব একটা চেনে বলে মনে হল না।ওর সঙ্গে কিছুতেই মন খুলে কথা বলতে পারছিলামনা।সিকিম-যাত্রার এটা এক ভাষাই এখানে অন্তরায়,দোরজি হিন্দি ছাড়া কিছুই বলেনা বা বোঝেনা। নিজেদের মধ্যে সিকিমিজ ভাষা বলে,যার এক বর্ণও বুঝতে পারিনা। ইংরেজি ও বোঝেনা বলেই মনে হল।কারণ ইংরেজিতে প্রশ্ন করলে ও একবারও উত্তর দিচ্ছিল না,তাই হিন্দি বলা ছাড়া গতি ছিল না, এদিকে আমি ভুলভাল হিন্দি বলায় ছেলেমেয়েরা হাসাহাসি করতে থাকায় বেশি কিছু বলতেও পারছিলাম না।ফলে সমস্ত গাছগুলোর নাম জানা হলনা । শুধু চোখ মেলে দেখে স্মৃতির মণিকোঠায় জমিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। দুচোখ ভরে দেখেও আশ যেন মিটছিল না,হৃদয় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠছিল।এ আনন্দের অনুভূতি একেবারেই নতুন।

 

পাহাড়ী এলাকা বলতে ডুয়ার্স আর ছেলেবেলায় কাটানো ছোটনাগপুরের পাহাড়ি এলাকা আর পূর্বঘাট পর্বতমালার কিছু অংশ ছাড়া কোথাও আর কিছুই দেখিনি আগে,তাই এখানকার পাহাড়ের রূপ একেবারেই নতুন আমাদের কাছে।সিকিম-যাত্রার পথে অসংখ্য বার গাড়ি দাঁড় করানো হলো,গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার চারপাশের অপূর্ব দৃশ্য দেখার জন্য।সারি সারি পর্বতমালা ঘন সবুজ গাছপালায় ঢাকা। ইতিউতি এক আধটা বাড়ির রঙিন চাল উজ্জ্বল হয়ে ফুটে আছে। কোথাও পাশাপাশি কয়েকটা বাড়ি। কখনো দেখতে পেলাম পাহাড়ের একেবারে শীর্ষ অঞ্চলে একটা বাড়ির অংশ সবুজ গাছপালার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে।ঐ উচ্চতায় মানুষ যায় কিকরে? প্রতিনিয়ত নামাওঠা কি সম্ভব?দোরজি বলল চূড়া পর্যন্ত রাস্তা রয়েছে,গাড়িও ওঠানামা করে।ডুয়ার্সে দেখেছিলাম পাহাড়ের উপর থেকে ছাত্র ছাত্রীরা পায়ে হেঁটে নেমে এসে স্কুলে যায় ও আসে।দুঘন্টা নামতে আর ঠিক ততটা সময়ই উঠতে সময় লাগে।এটাই ওদের নিত্য রুটিন। সেই রাস্তা কিন্তু একেবারেই পায়ে চলা পাথুরে পথ। আমিও ঐ পথে চেষ্টা করে কিছুটা উঠেছিলাম। কিন্তু সে পথ ভয়ঙ্কর।পদে পদে বিপদ ঘটতে পারে।সেই তুলনায় সিকিমের রাস্তাঘাট অনেকটাই উন্নত বলে মনে হল।

সিকিম যাত্রার পাহাড়ের গায়ে গায়ে ঘুরে ঘুরে রাস্তা একবার পাক দিলেই চারদিকের দৃশ্যপট বদলে বদলে যাচ্ছিল আর আমরাও গাড়ি থামিয়ে সামনের অপার্থিব দৃশ্যাবলী উপভোগ করতে চেয়ে দোরজিকে বিরক্ত করছিলাম। কিন্তু ওর ভাবলেশহীন মুখে কোনো অভিব্যক্তি ফুটে উঠতে দেখলাম না। বরং প্রতিবারই গাড়ি থামিয়ে আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করায় আমরাও খুশি হলাম।

গাড়ি ক্রমশ উপরে উঠছিল। আমাদের সকলেরই কান থেকে হাওয়া বেরিয়ে যাচ্ছিল,এয়ার প্রেসার কমে যাওয়ায় এটা ঘটে।রাস্তায় প্রচুর টার্ন ছিল, কোথাও বেশ কিছুটা খাড়াই ওঠা।এক পাশে খাড়া উঁচু পাহাড়ের গায়ে কোথাও ঘন জঙ্গল কোথাও বা নানা রং এর রুখুশুখু পাথর।সারাটা পথ জুড়ে কাজ চলছে ,পাথর কেটে রাস্তা চওড়া করার কাজ। কোথাও পাহাড় কেটে বের করে আনা পাথর স্তুপীকৃত হয়ে পড়ে আছে, কোথাও ক্রাশার দিয়ে ভাঙা হচ্ছে।সে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।এসব দেখে মনখারাপ হয়ে যাচ্ছিল। উত্তরাখণ্ডের ভয়াবহ হড়কা বানের কারণ তো এভাবে যত্রতত্র পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি রাস্তা ঘাট বানানোই। এখানকার সরকার কি সেকথা জানেনা?এই উন্নয়ন কি সত্যিই দরকার?যে উন্নয়ন প্রকৃতি ও মানবজাতির ধ্বংসের পথই সুগম করে শুধু?

বেশ কিছুটা পথ চলার পরে সকাল নটা নাগাদ জলখাবার খাওয়ার জন্য দোরজি পথের পাশেই থাকা এক রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল আমাদের। পাহাড়ের গায়ে জঙ্গলের মধ্যে এটা অবস্থান করলেও লোকজনের ভিড় লেগেই আছে দেখলাম। এখানে পৌঁছতেই বৃষ্টি নামল।এও এক নতুন অভিজ্ঞতা, পাহাড়ের বৃষ্টি দেখা।গত কয়েকদিন ধরেই উত্তরবঙ্গে বৃষ্টি হচ্ছিল। তাই বৃষ্টির জন্য আমাদের বেড়ানো মাটি হবে—– এমন একটা সম্ভাবনার কথা ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু আমার কাছে বেড়ানো ব্যাপারটা সরলভাবে বললে শুধুই বেড়ানো। নতুন জায়গা নতুন করে দেখা,বা দেখা জায়গা আবার করে দেখা। সেখানে প্রকৃতিতে যা ঘটবে সেটুকুই দেখার। তাই আমার মতে বেড়াতে যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট স্পট আগে থেকে নির্বাচন করলেও মনকে আরো কিছু দেখা বা না দেখার জন্য প্রস্তুত করে রাখাই ভালো।ঐ নির্দিষ্ট স্পটটাই মুখ্য আর বাকি সব গৌন— আমি এমন ভাবতে চাই না। তাই আমার আশেপাশে যা আছে বা যা যা ঘটছে সবটাই দেখার বলে মনে করি এবং সেই দেখাকে উপভোগ করার চেষ্টা করি। তাই এই বৃষ্টিকে আমার আশির্বাদ বলেই মনে হল। প্রথমবার এসেই আমাদের পাহাড়ি বৃষ্টি দেখা হয়ে গেল,এটাই তো বাড়তি পাওনা। রেস্টুরেন্টটা বেশ অভিজাত।দোরজি আমাদের দোতলায় নিয়ে গেল। নীচে বেশী ভিড় ছিল, কিন্তু উপরটা ফাঁকা থাকায় বেশ আরাম করে বসে চা ও জলখাবার খেতে খেতে দেওয়ালজোড়া কাচের জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখে মনটা ময়ূরের মত নেচে উঠল।

চলবে ( পরবর্তী অংশ আগামীকাল )

 

About Post Author