Home » চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

দেবিকা চট্টোপাধ্যায় (অতিথি লেখিকা ),সময় কলকাতা:

কিস্তি ৭

ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই উঠে বসে জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম, বাইরেটা পুরো সাদা হয়ে থাকায় দূরের পাহাড়গুলো একেবারেই অদৃশ্য।কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া, আসলে মেঘ,ঘরে ঢুকে পড়তে পারে ভেবে জানলা খুলেও আবার বন্ধ করে দিয়ে কাচের এপারে বসে মুগ্ধ বিস্ময়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। জানলার পাশেই মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে — এই দৃশ্য দেখার অনুভূতিই আলাদা, সেটাই উপভোগ করার চেষ্টায় নিরত আমি। জনমানবশূন্য ভোরের প্রকৃতিতে একমাত্র প্রাণী কয়েকটা কুকুর। লক্ষ্য করেছি এখানে প্রত্যেকটা বাড়িতে বেড়াল কুকুরের বাস , এবং সবাই বেশ আদুরে ,এ দেখে আমার খুবই আনন্দ। রাস্তার জখম, রোগা, খাদ্যপ্রত্যাশী করুণ মুখের কুকুর বেড়াল গরু বা অন্য প্রাণী দেখলে আহত হই ,আর রাস্তায় বেরোলেই এমন রুগ্ন পশুদের দেখাটা অবশ্যম্ভাবী আমার বাড়ির চারপাশে। এখানে এসে রাস্তার ধারের নধরকান্তি বেড়াল কুকুর দেখে কিই যে শান্তি,বলার নয়।

বেলা বাড়লেও কুয়াশা কাটছিল না,তবে একটু ফিকে হলে তার ফাঁক দিয়ে দূরের পাহাড়শ্রেনীর আবছা অবয়ব দেখতে পেলাম। পাহাড়ের সব জায়গার মতো এখানেও রংবেরং এর আর কিছু লম্বাটে সাদা পতাকা খুঁটি তে বাঁধা অবস্থায় উড়ছিল , গাছগুলো ভিজে ঝুপসি হয়ে রোদের প্রত্যাশায় অপেক্ষমান। এইসময় বেড টি দেবে কি না জিজ্ঞেস করতে আসলে সবাই উঠে এই ঘরে এসে বসল।চা খেয়ে আমরা সবাই দ্রুত চান করে রেডি হয়ে নিলাম।দোরজির নির্দেশ না মানলে যদি “যাও খেলবো না ” বলে গাড়ি নিয়ে যদি চম্পট দেয়? বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিও শুরু হল। বৃষ্টির মধ্যেই জলখাবার খেয়ে আমরা গাড়িতে উঠলাম।বাড়ির মালিক এর কাছে গাছের কাটিং চাইতে একটা গ্রোব্যাগ সমেত ফুলগাছই দিয়ে দিল, অন্য একটা ব্যাগসমেত।এইসব মানুষের আন্তরিক ব্যবহারে আমরা যারপরনাই আপ্লুত।

আবার শুরু হলো আমাদের পথ চলা, বৃষ্টিস্নাত পথ বেয়ে ক্রমশ চড়াই এ ওঠা।রাস্তা যেমন দুর্গম, আমাদের দোরজিও ততটাই দক্ষ ড্রাইভার।কিই নিপুণতার সঙ্গে যে এই কঠিন পথ ও সাবলীলভাবে অতিক্রম করছিল,তা বলার নয়।প্রতিটা কঠিন টার্ন এত সচ্ছন্দে পার হচ্ছিল যে আমাদের এতটুকু ঝাঁকুনিও লাগছিলনা।অথচ রাস্তা সব যায়গায় যে একইরকম মসৃণ তা নয় মোটেই।সারা রাস্তা জুড়েই রাস্তা চওড়া করার কাজ বা পাহাড় কেটে টানেল তৈরি করে রেললাইন পাতার কাজ চলায় কোথাও রাস্তার উপরেই পড়ে আছে বড়বড় পাথরের চাঁই, কোথাও বা বড়বড় যন্ত্রপাতি নিয়ে ইঞ্জিয়ারদের সঙ্গে কর্মীরা কাজে ব্যস্ত।এইসব বাধা বিপত্তি কাটিয়ে দোরজি ক্রমশ এগিয়ে চলল।সারাটা রাস্তা ও দুই পাশের দৃশ্য ও গাছগাছালি দেখতে দেখতে চলা।যত উপরে উঠছি প্রকৃতি ততই বদলাচ্ছে, গাছপালা ফুল সবই বদলাতে দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলাম সবাই।প্রথম চর্মচক্ষে রডোডেনড্রন ফুল দেখলাম,লাল মেরুন সাদা হলুদ গোলাপি হালকা বেগুনি, অসংখ্য ফুল গাছ কুঁড়ি ও ফুলে ভরা।দোরজিকে জিজ্ঞেস করায় ও বলল,”ইসিকো তো মুঝে গুরাস বোলতা,রডোডেনড্রন দেখনে কে লিয়ে জাদা উপরমে যানা পড়েগা” আমরা থমকে গেলাম, তাহলে কি রডোডেনড্রন দেখতে পাবোনা?ওর কথা বিশ্বাস হলোনা। তাই ইউ টিউব এ রডোডেনড্রনের ছবি দেখে নিশ্চিত হলাম, এগুলোই ঐ ফুল।ও গাছপালা নিয়ে আগ্রহী নয় বলেই কোনটা কি ফুল জানেইনা । একবার সেকথা নিজের মুখে বললও, এইসব ফুল নিয়ে আমরা যে এত আত্মহারা,ওরা তা তাকিয়েও দেখেনা।এ তো সত্যি কথাই, আমাদের চারপাশেও সবাই কি গাছপালা বা ফুল ভালবাসে? তাই যদি বাসত তাহলে এত হিংসা থাকত কি পৃথিবীতে?

প্রথমে এল পাহাড়ি গ্রাম জুলুক, অপূর্ব তার দৃশ্য। পাহাড়ের কোলে ছড়ানো ছিটানো জনবসতি ছবির মত সুন্দর।পথেই পড়ল ইকো পার্ক।দোরজির কথামত এটা ফেরার পথে দেখব ভেবে এগিয়ে চললাম সিল্ক রুট বা জিগজ্যাগ পয়েন্টের দিকে। সেখানে পৌঁছানোর পরেও বৃষ্টি পড়ছিল।ছাতা নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম সিল্ক রুট পরিস্কার ভাবে দেখার আশায়। একবার একটু পরিস্কার হয় কি না হয় আবার ঢাকা পড়ে যায় কুয়াশার চাদরে। অপূর্ব সুন্দর সে দৃশ্য। প্রচন্ড ঠান্ডায় সবাই আমরা কম্পমান। পাশের এক ঝুপড়ি দোকানে সবাই কফি খেলাম। দুই মহিলা উল বুনতে বুনতেই দোকান চালাচ্ছিল। ওদের কাছে টুপি,কানপট্টি, হাতমোজা কিনে পরা হলো। আবার গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু,এবার থাম্ভি ভিউ পয়েন্ট নাথাং ভ্যালি দেখে আমরা ওল্ড বাবা মন্দির পেরিয়ে কুপুপ এলিফ্যান্ট লেক দেখলাম।লেকটার আকৃতি অনেকটা হাতির আদলে বলেই এই নাম।নিউ বাবা মন্দির হয়ে আমরা ছাঙ্গু অভিমুখে চললাম। সিল্ক রুট পেরোনোর কিছু পর থেকেই রাস্তা রুক্ষ হয়ে উঠল।যত উপরে উঠছি গাছপালা তত ই কম। পুরো রাস্তার দুপাশেই মিলিটারি এলাকা।কাছেই নাথু লা যাওয়ার রাস্তা দেখা গেল।যতই ছাঙ্গুর দিকে এগোচ্ছি ঠান্ডাও ততই বেড়ে চলছে। পাহাড়ের পাথরের খাঁজে খাঁজে বরফ জমে থাকলেও লেকটায় শুধুই জল দেখতে পেলাম। এখানেও বৃষ্টি পড়ছিল,তাই ছাতা নিয়েই ঘুরতে হল।

চলবে,পরবর্তী অংশ আগামীকাল প্রকাশিতব্য

About Post Author