পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :
“কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়? কতটা পথ পেরোলে পাখি জিরোবে তার ডানা? ” সুমন চট্টোপাধ্যায় এই গানের কথা যতই বাংলায় নিজের মত করে লিখুন আদতে এই গানের রচনা এক আমেরিকান ইহুদির ।তাঁর নাম রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান বা ইহুদী-তে শাবতাই জিসেল বেন আব্রাহাম। বিশ্ববাসী এই সঙ্গীতের মানুষটিকে চেনে বব ডিলান নামেই।

২০২২ সালের ২৪মে তারিখে দেখতে দেখতে গায়ক ও সঙ্গীতকার বব ডিলানের ৮১ বছর বয়স হয়ে গেল। তিনি পৃথিবীর প্রথম গীতিকার যাঁর ঝুলিতে এসেছে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। ২০১৬ সালে তাঁর নোবেল জয়ের পরে কিছু কথা উঠেছিল ঠিকই কিন্তু তাঁর গান ও সঙ্গীতের মাধ্যমে বিপ্লব তাঁকে ইতিমধ্যেই অমর করে তুলেছে।

“কেমন লাগে, কেমন লাগে?
ঘর ছাড়া থাকতে হবে
সম্পূর্ণ অজানার মতো, ঘূর্ণায়মান পাথরের মতো”
উপরের তিনটি লাইন যে গান থেকে নেওয়া সেই ‘লাইক অ্যা রোলিং স্টোনে’র মত অজস্র গানের কথা তাঁকে করে তুলেছে জনপ্রিয়। কিংবা সুমন চট্টোপাধ্যায়ের যে গানের কথা আলোচনার শুরুতে বলা হয়েছে তার মূল গান ব্লোইন ইন দ্যা উইন্ড কে যদি উদ্ধৃত করা যায় মন কি ব্যাকুল হবে না?
“একজন মানুষকে কত রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে
হবেযতক্ষণ না তুমি তাকে মানুষ বলে ডাকবে?
এক সাদাঘুঘুকে ঘুমোনোর আগে
কত সাগর পাড়ি দিতে হবে?”
স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলার শপথ যেন বব ডিলানের গানে।তাঁকে তাঁর সময়ের সেক্সপিয়ার বলা হয়। কেন বলা হয়? শুধু যে তাঁর গান শুনে আমরা ধন্য ধন্য করি সেটুকুই কি তাঁর সবকিছু ? বব ডিলান না হয় অজস্র বেস্ট সেলার অ্যালবাম করেছেন, না হয় তিনি ৫০০ র বেশি গান লিখেছেন যা সারা বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে গাওয়া হয়েছে, উডি গাথরী কে দেখে প্রভাবিত হয়ে লোক সঙ্গীতের কে আলাদা মাত্রা দিয়েছেন, ফোক রকের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন,এমনকি না হয় তাঁর ঝুলিতে নোবেল, অস্কার এবং একাধিক গ্র্যেমী পুরস্কার রয়েছে, সেটুকুই কি সব ? শুধু কি সেটুকুই তাঁকে আমাদের জানা? তাঁর গানে যে এক বিরাট মঞ্চের পর্দা সরে যায় আমাদের সামনে থেকে। তিনি গানকে ভাঙেন আর পড়েন গানের যাদুকরের মত তাই তিনি আলাদা সেটুকু নিশ্চই আমরা জানতে পারি।
আরও জানতে পারি,আদতে তিনি কিংবদন্তী হয়ে উঠেছেন যে কারণে, তা তাঁর সঙ্গীত কে ছাড়িয়ে গিয়েছে। ৯৭ সালের আগে গ্র্যেমি পান নি,৯৭ সালেই তো কেনেডি সেন্টার অ্যাওয়ার্ড পেলেন। ২০০১ সালে এসে পেয়েছেন অস্কার। তাঁর বহু আগেই যে তিনি তুমুল সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন তার কারণ তো একমাত্র গান নয় ।গানের চেয়ে বেশি কিছু।গান তো তাঁর এক মাধ্যম মাত্র। তাঁর গান ষাটের দশকে আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলনকে ভাষা জুগিয়েছে । ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্টিন লুথার কিংয়ের বক্তৃতার সময় ডিলান হাজির ছিলেন পিট সিগার, জোয়ান বায়েজদের সঙ্গে মিছিলের সামনের সারিতে। তাঁর গান হয়ে উঠেছে নাগরিক আন্দোলন বা সিভিল রাইটস মুভমেন্টে প্রতিবাদের গান যা স্রেফ আমেরিকাতে সীমাবদ্ধ থাকে নি, তাঁর গান সীমাবদ্ধ নেই কোনও বিশেষ সময়কালে। দেশকালের সীমা ছাড়িয়ে তিনি গায়ক ও সঙ্গীতলেখকের প্রচলিত সংজ্ঞা ছাপিয়ে গিয়েছেন। ববি ফিশারের ভক্ত বব ডিলান বারবার কিস্তি মাত করেছেন গানের মধ্যে বার্তা দিয়ে।
তাই তিনি লিখতে পারেন:
“আমি নীলা রঙের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি
আমি ভালো পোশাক পরে শেষ ট্রেনে অপেক্ষা করছি
ফাঁসির মঞ্চে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছি
এখন যে কোনো মুহূর্তে আমি আশা করছি সব নরক ভেঙ্গে যাবে
মানুষ পাগল আর সময়গুলো অদ্ভুত
আমি শক্তভাবে আটকে আছি, আমি সীমার বাইরে
আমি যত্ন নিতাম, কিন্তু সবকিছুর পরিবর্তন হয়েছে…
‘ওয়ান্ডার বয়েজে’র এই গানের জন্য তিনি অস্কার আর গোল্ডেন গ্লোবে সম্মানিত হয়েছেন। আর হবেন না-ই বা কেন,”থিংস হ্যাভ চেঞ্জডে”র গানের কথার কলির মত সত্যি তিনি যেন অসীম এবং পরিবর্তনকে নতুন দিশা দিতেই, সকল নরকের হাত থেকে মুক্তি পেতেই যেন তাঁর গান।।



More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
হরমুজ প্রণালী, রান্নার গ্যাস ও তেল এবং ভারত -ইরানের সম্পর্ক
যুদ্ধের জাঁতাকলে ভারত