পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা : দিনটি ছিল ২ জুলাই। সাল ১৯৯৪। সময় : মধ্যরাত। স্থান কলম্বিয়ার মেডেলিনের একটি পানশালার লাগোয়া গাড়ি পার্কিং করার জায়গা। একটি বারে বন্ধুদের সঙ্গে এসেছিলেন এক বিশ্বকাপার। পাঁচ দিন আগেই কলম্বিয়া বিদায় নিয়েছে বিশ্বকাপের প্রাথমিক রাউন্ড থেকে। টুর্নামেন্টে বিশ্বকাপার ফুটবলারটি একটি আত্মঘাতী গোল করেছিলেন। তখন রাত তিনটে। এল পোবলাদো বার থেকে বেরিয়ে এসেছেন ওই ফুটবলার। তিনজনের সশস্ত্র এক দল ঘিরে ধরল তাকে। দুজন এগিয়ে এল তাঁর দিকে ।বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোলের কথা তুলে তার সঙ্গে ঝগড়া করতে শুরু করল। অতঃপর ফুটবলারের মাথায় একটানা ছ রাউন্ড গুলি করল ঘাতক । প্রতিটি গুলির পরে ঘাতক চিৎকার করে বলছিল” গো-ও–ল “। ছ বার গুলি এবং ছ বার-ই গোল,গোল বলে উল্লাস করে সরে পড়ল দুষ্কৃতী দল। ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়া ফুটবলারকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ৪৫ মিনিটের মধ্যে মৃত্যু হল তাঁর।বিশ্বকাপ খেলে দেশে ফেরা ফুটবলারের ২৭ বছরের জীবনে যবনিকা ।২৮ বছর আগের ঘটনা তোলপাড় ফেলে দেয় ফুটবল জগত ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বে। কলম্বিয়ার ফুটবলার আন্দ্রে এস্কোবারের মৃত্যুর জন্য বিশ্বকাপে তাঁর করা আত্মঘাতী গোলকে দায়ী করা হলেও হত্যাকাণ্ডের কারণ ছিল আরও গভীরে,যে গভীরতায় ছিল অন্ধকার।

পরিচ্ছন্ন ও পরিশিলীত ফুটবলের জন্য “দ্যা জেন্টলম্যান” নামে পরিচিত ছিলেন আন্দ্রে এস্কোবার। রক্ষণের ফুটবলার হয়েও দর্শকদের প্ৰিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপে কলম্বিয়া অন্যতম ডার্ক হর্স হিসেবে অংশ নেয়। এমনকি পেলে বলেছিলেন কলম্বিয়া চ্যাম্পিয়ন হতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যতবাণীর মর্যাদা দিতে পারে নি সহসা ফুটবলে শক্তিবৃদ্ধি করা লাতিন আমেরিকার দল কলম্বিয়া।হতাশ হলেন বহু ফুটবল প্রেমী আর হতাশ হল ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অন্ধকার জগতও।
এখানে অপর একজনের উল্লেখ না করলেই নয়। তাঁর নাম পাবলো এস্কোবার। তিনি কলম্বিয়ার অপরাধ সাম্রাজ্যর প্রতিপত্তিশালী ও বিত্তশালী মুখ।আন্দ্রের মৃত্যুর কিছুদিন আগেও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী গ্যাংষ্টার হিসেবে পরিচিত ছিলেন পাবলো।বলা হয়,পাবলো ছিলেন ক্রীড়াপ্রেমী। খেলার প্রতি নিজের ভালোবাসাকে অন্য রূপ দেন পাবলো।খেলার মাঠের সঙ্গে অপরাধ জগতের যোগাযোগকে তিনি অন্যমাত্রায় নিয়ে যান। ফুটবলে জুয়া হয়ে ওঠে স্বাভাবিক বিষয়। ধরা হতে থাকে মোটা অংকের বাজি।আন্দ্রে এস্কোবারের মৃত্যুর কয়েক মাস আগে পুলিশের সঙ্গে লড়াইয়ে মারা যান পাবলো এস্কোবার। মাদক কারবারি ও কলম্বিয়ার অন্ধকার জগতের বেতাজ বাদশা পাবলোর সঙ্গে পদবিতে মিল থাকলেও কোনওভাবে যোগাযোগ ছিল না আন্দ্রের। না ছিলেন তাঁরা আত্মীয়, না ছিলেন পরিচিত। যোগসূত্র একটিই,পাবলোর উত্থান ও পতনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আন্দ্রের হত্যাকান্ড।

আর্থিক ভাবে কলম্বিয়ার অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে অন্ধকার জগত যার অনেকটা জুড়ে রয়েছে মাদক আর জুয়া। বলাই হয়েছে যে অগাধ সম্পত্তির অধিকারী পাবলো ছিলেন ফুটবল প্রেমী। ফলে ফুটবল জগতে তার ছায়া পড়েছিল।পাবলো এস্কোবারের মৃত্যুর পরে যে মাফিয়ারাজ বন্ধ হওয়ার আশা দেখা দিয়েছিল তা না হয়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র মাফিয়া নেতার উত্থান ঘটে যারা ছিলেন মাদক কারবারি ও অন্ধকার জগতের সঙ্গে যুক্ত। এঁরা ফুটবল খেলায় টাকা লগ্নি করতেন এবং এই টাকা মূলত লাগানো হত জুয়ায়। আর এই জুয়াই যে ছিল আন্দ্রে এস্কোবারের মৃত্যুর কারণ তা একপ্রকার নিশ্চিত।

বিশ্বকাপে রোমানিয়ার বিরুদ্ধে ১-৩ গোলে পরাজয় হওয়ার পরে আমেরিকার কাছে ১-২গোলে হারে কলম্বিয়া। আমেরিকার সঙ্গে ৩৫ মিনিটে এস্কোবারের বল ক্লিয়ার করার চেষ্টা নিজেদের জালে বল জড়িয়ে দেয়। আত্মঘাতী গোল করে এস্কোবার অনেকেরই চক্ষুশুল হয়ে ওঠেন। গ্রূপে ৩ খেলায় ৩ পয়েন্ট পেয়ে বিদায় নেয় কলম্বিয়া।

দেশে ফিরে আসেন আন্দ্রে এবং ফিরেই খুন হয়ে যান তিনি ।ক্যাস্ট্রো মুনিজ পরবর্তীতে এই হত্যার দায় স্বীকার করে। মুনিজ কলম্বিয়ার একটি মাদক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল । ড্রাইভার ও দেহরক্ষীর কাজ করত মুনিজ । পিটার এবং জোয়ান গ্যালন নামক দুই মাদক ব্যবসায়ীর ড্রাইভার হিসেবে কাজ করত। পিটার এবং জোয়ান এই দুই গ্যালন ভ্রাতৃদ্বয় পাবলো এস্কোবারের মাদক ব্যবসায় যুক্ত ছিল। পরবর্তীতে এই দুই মাদক ব্যবসায়ী পাবলোর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে সচেষ্ট হ। গ্যালন ভ্রাতৃদ্বয় ছিল বড়মাপের জুয়াড়ি। তারা বিশ্বকাপে কলম্বিয়ান ফুটবল দলের সাফল্য নিয়ে বড় অংকের টাকা বাজি ধরে । বিশ্বকাপের পরবর্তী রাউন্ডে কলম্বিয়া কোয়ালিফাই না করায় তাদের বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখ দেখতে হয় যা তাদের ক্ষোভের কারণ হয়ে ওঠে। তবে আন্দ্রে এস্কোবার হত্যাকান্ডে তাদের টিকি ছোঁয়া যায় নি। আদালতের নির্দেশে দোষী প্রতিপন্ন হওয়ায় ৪৩ বছরের কারাদণ্ড হয় মুনিজের।পরবর্তীতে এই সাজা মকুব হয়ে ১১ বছরে নেমে আসে। কলম্বিয়ার অন্ধকার জগতের সঙ্গে লতায় পাতায় জড়িয়ে থাকা মাদক ব্যবসা এবং জুয়া চলতে থাকে আপন গতিতে। প্রাণ যায় সুভদ্র ফুটবলার আন্দ্রে এস্কোবারের।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
চেন্নাইয়ানকে হারিয়ে মোহনবাগানকে টপকে ইস্টবেঙ্গল তিন নম্বরে
কেকেআর-কে হারালেন, কে এই মুকুল চৌধুরী ?