Home » ও’ হেনরির উপহার আর গল্পশেষের চমক

ও’ হেনরির উপহার আর গল্পশেষের চমক

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা : ৪৮ বছরের আয়ু নিয়ে এসেছিলেন তিনি।লেখক হিসেবে তাঁর জীবন খুবই ক্ষুদ্র চার বছরের। এই ক্ষুদ্র পরিসরের লেখক জীবনে আর কোনও কাহিনীকার সম্ভবত বিশ্বজোড়া এত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন নি।তাঁর নাম উইলিয়াম সিডনি পোর্টার হলে কি হবে, তাঁকে আমরা চিনি ও’ হেনরি নামেই। ১৮৬২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার গ্রীনসবরোতে জন্মেছিলেন তিনি। রুজিরুটির তাগিদে পনেরো বছর বয়সে পড়াশুনো ছেড়ে কাজে নেমে পড়তে হয় ওষুধের দোকান, ভেড়ার রাঞ্চ কোথায় না কাজ করেছেন। বিয়ে করেন, একটি কন্যাও হয়, হঠাৎ কর্মক্ষেত্রে তহবিল তছরূপের দায়ে জেল হয়ে যায় তাঁর। তিন মাস জেলে কাটান। এখান থেকেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর লেখক জীবনের ছদ্মনাম – ও ‘ হেনরি। অতঃপর জেল থেকে ছাড়া পেয়েই নিউইয়র্কে ম্যাডিসন স্কোয়ারের কাছে বাসা বাঁধেন। বসে বসে পথচারী, যুবক -যুবতীদের, বিভিন্ন পেশার মানুষদের দেখতেন তিনি আর তাদেরকে গভীর ভাবে দেখার চোখ নিয়েই শুরু করেন গল্প লিখতে তিনি যা তাঁর জীবিকা নির্বাহের পাথেয় হয়ে ওঠে। রং-বেরংয়ের মানুষের ছবি ফুটে উঠতে থাকে তাঁর গল্পে।

১৯০৬ সালে প্রকাশিত ও’ হেনরির প্রথম বই ” দ্যা ফোর মিলিয়ন ” সাড়া ফেলে দেয় পাঠক মহলে। মোট ১২ টি বই লিখেছিলেন তিনি।১৯০৬ সাল থেকে ১৯১০ সাল – মাত্র চার বছরের লেখক জীবনে অগণিত গল্প লিখেছেন তিনি মৃত্যুর আগে তাঁর ৯টি বই প্রকাশিত হয়েছিল।মৃত্যুর পরে আরও তিনটি বই বেরোয়। পাঁচ শতাধিক গল্প লিখেছেন যার প্রেক্ষাপট আমেরিকার মানুষের জীবন থেকে নেওয়া। গল্পের শেষে চমক ছিল তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর লেখা নিয়ে বিদগ্ধ গুণীজন মহলে একসময় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও তিনি সাধারণ পাঠক পাঠিকার চোখে ছিলেন অসামান্য যা তাঁর লেখার জনপ্রিয়তা প্রমান করে। তথাপি ” ছোট গল্প ছোট হবে এবং গল্প হবে ” এই সংজ্ঞার সার্থক রূপকার ছিলেন ও’ হেনরি।

বিদগ্ধ মহলে যেজন্য তিনি সমালোচিত হন তাঁর অন্যতম কারণ তাঁর গল্পের শেষে থাকা চমক যা আবার ছিল সাধারণ পাঠক- পাঠিকার কাছে তাঁর জনপ্রিয়তার রসায়ন। তাঁর লেখাকে যারা সু- সাহিত্য বলে মানেন সেই সমালোচকদের মতে ও’ হেনরির লেখায় মোচড় থাকা যুক্তিসঙ্গত যা সাহিত্যগুণকে খর্ব করে না। তাঁদের মতে,মাসিক বা সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকার পাঠক- পাঠিকাদের খুশি রাখতে হত তাঁকে আর তাই তাঁর লেখার শেষে দেখা যেত অভিনব টুইস্ট বা মোচড়। উল্লেখ্য,গল্পের উপসংহারে চমক তিনি নিজস্ব ভঙ্গিতে পেশ করতেন যার কোনওরকম ইঙ্গিত গল্পের মধ্যে পাওয়া দুরূহ ছিল।সমালোচকদের অনেকেই বলে থাকেন যে,সম্পাদক বা প্রকাশকের মন পেতে হত তাঁকে কারণ তাঁর জীবন যাপন ও রোজগারের রাস্তা ছিল গল্প লেখা। নইলে পাওনাদারকে বাঁচিয়ে প্রাত্যহিক জীবনে চলাই যে দুস্কর ছিল তাঁর। অথচ তাঁর গল্পের চমকের আবেদন সাময়িক ছিল না কখনও। ঝুঁকি নিয়ে চমক এলেও তা এসেছে গল্পের তাগিদে। তাঁর গল্প অধিকাংশ সময়  চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে পাঠকমনে । ও ‘ হেনরির অন্যতম জনপ্রিয় লেখা “দ্যা গিফট অফ মেজাই” এমনই এক গল্প যেখানে দুজন দুঃখী প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের সবচেয়ে প্ৰিয় বস্তু বিসর্জন করে তাদের ভালোবাসার জন্য অর্ঘ্য এনেছে যা বাস্তবে অর্থহীন হয়েও প্রেমকে শাশ্বত করে তুলেছে।বর্নময় মানুষের মিছিলে পূর্ণ এরকমই আরেকটি মর্মস্পর্শী রচনা “দ্যা কপ অ্যান্ড দ্যা অ্যান্থেম”। এক অন্ধকার জগতে ডুবে যেতে থাকা মানুষ এই গল্পে প্রার্থনাসঙ্গীতের সুরে জেগে উঠে জীবনের মূল স্রোতে ফেরার ব্যর্থ চেষ্টায় রত।”দ্যা লাস্ট লিফ “গল্পকে তাঁর লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প বলে বিবেচনা করা হয়। মানুষের ভাবনা, প্রাণশক্তিও কাজের মধ্যে যোগসূত্র গড়েছে গল্পটি।”এ সার্ভিস অফ লাভ ” ও তাঁর আরেকটি গল্প যে গল্পে শিল্পকে ভালোবাসলে সবকিছু করা যায় না কিন্তু ভালোবাসার জন্য সবকিছু করা যায় তেমনটাই দেখিয়েছেন ও হেনরি।তাঁর কলমে গল্প কখনও রূপকথা হয়েছে কখনও বিষাদের আখ্যান হয়ে উঠেছে । সবকিছুকে অতিক্রম করে তাঁর রচনায় রয়েছে প্রাণের আবেগ। কোনওভাবেই তাঁর ১৬১ তম জন্মবার্ষিকীতে ও’হেনরিকে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।।

About Post Author