সময় কলকাতা ডেস্ক : দুর্গাপুজোর মরশুম চলেই এল। উৎসবের আনন্দে মাতবে বাঙালি। কুমারটুলি আর মন্ডপে মন্ডপে বহুদিন আগেই প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু করে দিয়েছেন কারিগররা। দু’বছর ধরে করোনার দাপটে বন্দী সময় কেটেছে l সে সময় মন্ডপে মন্ডপে পৌঁছতে পারেনি মানুষ। সার্বজনীন দুর্গোৎসবে পড়েছিল ভাটা। অথচ আগ্রহ কমেনি মানুষের। দুর্গোৎসবের প্রতি আগ্রহ। অথচ পুজোয় তারা শামিল হতে পারেনি। শিশু-কিশোর কিশোর কিশোরীরা বন্দী থেকেছে চার দেওয়ালে। মন খারাপের মধ্যে কেটেছে তাদের। তবে সবাই হাতে হাত রেখে চুপ করে বসে ছিল না। যেমন জলপাইগুড়ির খুদে পড়ুয়া রিয়ান সেন।আট থেকে আশি বছরের প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে যে দেবীর বসত তার প্রমাণ মিলেছে রিয়ানের অবাক করা কান্ডে। খুদে পড়ুয়া রিয়ান অতিমারির দু’বছরে দুর্গা প্রতিমা গড়ে আর আর নিজের গড়া প্রতিমায় পুজো করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। বনেদি বাড়ি বা জমিদার বাড়ি ছাড়াও যে ক্ষুদ্র পরিসরে পুজো করা সম্ভব দুর্গা তা দেখিয়ে দিয়েছে ছোট্ট রিয়ান।

কোভিড ১৯ আলাদিনের এক আশ্চর্য প্রদীপ তুলে দিয়েছে রিয়ানের হাতে। জলপাইগুড়ি শহর লাগোয়া মোহিত নগরের রিয়ানের বাবা-মা পেশায় শিক্ষক। করোনা কালে বাধা নিষেধ আর কড়াকড়ির বেড়াজাল। ছাত্র ছাত্রীরা ও বন্দি থেকেছে চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে। তাদের সঙ্গী ছিল পড়ার বই, মোবাইল আর বোকা বাক্স। বই পড়ে সারাদিন কাটে না। উন্মুক্ত আকাশ আর খেলাধুলো বা আড্ডা অবসর থেকে বঞ্চিত থেকেছে পড়ুয়ারা। উৎসবের আনন্দ ছিল না তাদের, ছিলনা শারদীয়া দুর্গাপূজার উচ্ছ্বাস । রিয়ানের শিক্ষক বাবা-মা কখনো চাননি তাদের সন্তানের সময় কাটুক শুধুমাত্র মুঠোফোনে। মুঠোফোন যেমন আশীর্বাদ তেমনই যে অভিশাপ। মুঠোফোনের আশীর্বাদটুকুই পাথেয় করেছিল রিয়ান। আপামর বাঙালির হৃদয়ের পুজো মা দুর্গার আবাহন আর তার শিল্পীসত্তার মিশেল ঘটাতে সে গুগলের সাহায্য নেয়। প্রযুক্তির সামান্য সাহায্য নিয়েছিল খুদে পড়ুয়া। তারপরে সে বাড়িতেই গড়ে তুলতে থাকে মা দুর্গা। ২০২০ সালে প্রথমবার নিজের গড়া দুর্গা দিয়ে তার বাড়িতে হয় দশভুজার আরাধনা। রিয়ানের বন্ধুবান্ধব যারা বন্দী ছিল কোভিড কালে তারাও রিয়ানের বাড়ি এসে উৎসবের শরিক হয়। রূপকথা ডানা মেলে আকাশে।
রিয়ানের শিক্ষক শিক্ষিকা বাবা-মা দু হাজার কুড়ি সাল থেকেই রিয়ানের রূপকথা গড়ার সঙ্গী থেকেছেন। রিয়ানের দুর্গা প্রতিমা গড়ার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় ২০২১ সালেও।
২০২২ সালও রিয়ানের প্রতিমা তৈরীর সাক্ষী থাকতে চলেছে । রিয়ান যে দুর্গা প্রতিমা গড়ে তুলছে তা খুব ব্যয় সাপেক্ষ নয়। পুজোর আয়োজনে অন্য খরচ যাই থাকুক না কেন, রিয়ানের মস্তিষ্ক ও শিল্পী সত্তা প্রতিমা নির্মাণের খরচকে কমিয়ে এনেছে এক ধাক্কায়।মাত্র হাজার পাঁচেক টাকার মধ্যে সে গড়ে তুলছে দুর্গা প্রতিমা।সর্বাঙ্গীনভাবেই সে মূর্তি গড়ছে। তার গড়া দুর্গা প্রতিমায় অনুপস্থিত নেই উমা মায়ের পুত্র কন্যা । অসুর থেকে সিংহ সবই রয়েছে প্রথা মেনে। এত কিছুর জন্য খরচ হয়েছে সামান্যই।দুর্গাপুজোর আয়োজন যে সাধারণ বাঙালি ও নিজ গৃহে করতে পারে তা বুঝিয়ে দিয়েছে জলপাইগুড়ির খুদে পড়ুয়া রিয়ান সেন।

রিয়ানের হাত ধরেই দুর্গোৎসবে পড়ুয়াদের বন্দি দশা ঘুচেছে , মুক্তি পেয়েছে হৃদয়ে জমে থাকা আকাঙ্ক্ষা। রিয়ান সেন জন্ম দিয়েছে যে দুর্গোৎসবের আশ্চর্য রূপকথার তা হয়তো কাল ক্রমে ছড়িয়ে পড়বে বাঙালির ঘরে ঘরে।
এবারও উৎসবের আনন্দে মাতবে বাঙালি। গত দু বছরের বাধা নিষেধ আর থাকছে না। বাধা নিষেধের গেরোয় যার শিল্পীসত্তার বিকাশ পেয়েছিল সেই খুদে রিয়ান এবারও নিজের হাতে দুর্গা গড়ে পুজোর আনন্দে মাতবে। তবুও বাড়ির পরিসরে সে বেঁধে রাখতে চায় না নিজের শিল্পী সত্তাকে। পরবর্তীতে ঘরের মত বাইরেও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিমা নির্মাণ করে দশভূজা আরাধনা শরিক হতে চায় সে। রিয়ান সেনের হাত ধরেই হয়তো জন্ম নেবে নতুন ধারার দুর্গাপুজোর।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
চিকিৎসকের বঙ্গসংস্কৃতির উদযাপন নববর্ষে
দোল উৎসব : রাঙিয়ে দিয়ে যাও