Home » কালের বিবর্তনে চোখে পড়ে না ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ

কালের বিবর্তনে চোখে পড়ে না ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ

সময় কলকাতা ডেস্ক, ৪ জানুয়ারি: কালের বিবর্তনে এখন আর আগের মত চোখে পড়ে না ঐতিহ্যবাহী বিনোদন বায়োস্কোপ।এক সময়কার গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিনোদন ছিল বায়োস্কোপ দেখা। এখন আর আগের মত চোখে পড়ে না। কালের বিবর্তনে অনেক কিছু বদলে যাচ্ছে হারিয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন। সেখানে স্থান করে নিচ্ছে প্রযুক্তির কৃত্রিমতা।

কী চমৎকার দেখা গেল, এইবারেতে আইসা গেল, ঢাকার শহর দেখেন ভালো। কী চমৎকার দেখা গেল। এই সুর আর ছন্দের তালে তালে ধারা বিবরণী দিলেন বায়োস্কোপওয়ালা। বায়োস্কোপ বাংলার হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্যের নাম। কাঠের বাক্সে চোখ লাগিয়ে গানের তালে ছবি দেখার দৃশ্য নগরজীবনে আর চোখেই পড়ে না বললেই চলে। বায়োস্কোপ দেখাতে, বাংলাদেশের রাজশাহী থেকে ঢাকার শিল্পকলা অ্যাকাডেমির মাঠে অনুষ্ঠিত এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী মেলায় পৌঁছে গিয়েছেন আব্দুল জলিল মণ্ডল। খঞ্জনি আর গানের তালে বাক্সের ভেতর পাল্টে যায় ছবি। আর তা দেখে যেন গল্পের জগতে হারিয়ে যায় আট থেকে আশি সবাই। বর্তমানে গ্রাম বাংলায় বায়োস্কোপ এতটাই বিরল যে, জাদুঘরে রেখে দেওয়ার জন্যও অন্তত একটি বায়োস্কোপ কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রযুক্তিবিদ্যার ফল টেলিভিশন, স্যাটেলাইট এবং স্মার্ট মোবাইলের সহজলভ্যতার কারণে বায়োস্কোপ প্রায় হারিয়েই গিয়েছে। তবুও কোথাও না কোথাও একজন থেকেই যায়, যে এই ঐতিহ্য বয়ে বেরায়। তেমনি একজন আবদুল জলিল মণ্ডল।

বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার বাঘমারা থানার চায়ের শারা গ্রামের ছেলে জলিল মণ্ডল। বাবা বকশি মণ্ডল দীর্ঘ ৪৪ বছর এ পেশায় জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বাবার উত্তরসূরি হিসেবে ১২ বছর বয়সে জলিল মণ্ডল এ পেশায় যুক্ত হন। এরই মধ্যে এ পেশায় দীর্ঘ ৪০ বছর পার করে দিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশে দুই যুগ আগেও বায়োস্কোপের যে জৌলুস ছিল, প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় তা আজ বিলীন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু জলিল মণ্ডল আর আগের মতো অকেজো জিনিস হিসেবে ছুড়ে দেননি বায়োস্কোপকে। জড়িয়ে ধরে রেখেছেন সন্তানের মতো। জলিল মণ্ডল জানেন বায়োস্কোপ এখন আর কেউ টাকা দিয়ে দেখবে না, তারপরও তিনি বায়োস্কোপ নিয়ে বের হয়ে পড়েন। তবে আক্ষেপের সুরে বায়োস্কোপের ঐতিহ্যে এবং তার সাথে অবজ্ঞা আর অবহেলার কথাও প্রকাশ করেন জলিল মণ্ডল। বায়োস্কোপ খেলা দেখাতেন ২০ টাকা করে। সারা দিনে আবদুল জলিলের আয় হয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এই বয়সে এমন আয় হলে সংসার চলবে না। এই টাকার জন্য বায়োস্কোপ খেলা ধরে রাখবে কে?

ইতিহাসমতে, স্টিফেন্স নামের এক বিদেশি বাংলায় প্রথম বায়োস্কোপ দেখান। ১৮৯৬ সালে একটি থিয়েটার দলের সঙ্গে স্টিফেন্স কলকাতায় এসেছিলেন। আর তখনই তিনি কলকাতায় প্রথম দেখিয়ে যান বায়োস্কোপ। তারপর তাঁর অনুপ্রেরণায় মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন দুই বছর পর ১৮৯৮ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিকভাবে বায়োস্কোপ দেখানো শুরু করেন। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশজুড়ে। দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরা আসেন, দেখেন বাংলার এই ঐতিহ্য।

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ এখন প্রায় বিলুপ্ত। আগে গ্রামবাংলার বিভিন্ন মেলা, বাজার ও গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন বায়োস্কোপওয়ালারা। তাঁদের বিভিন্ন ধরনের গানের মাধ্যমে আকৃষ্ট করতেন ছোট–বড় বিভিন্ন বয়সী মানুষকে। এমন এক সময় ছিল, যখন মানুষের একমাত্র বিনোদন ছিল যাত্রাপালা–সার্কাস। কিন্তু যাত্রাপালা–সার্কাস ছিল শুধু বয়স্ক মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ। কিন্তু বায়োস্কোপ ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। তবে, কালের বিবর্তনে আজকাল আর চোখে পড়ে না ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ।

About Post Author