Home » ইতিহাসখ্যাত বনগাঁ সাতভাই কালীতলার ডাকাত কালীবাড়ি

ইতিহাসখ্যাত বনগাঁ সাতভাই কালীতলার ডাকাত কালীবাড়ি

সময় কলকাতা ডেস্ক,১০ জানুয়ারি : সাতভাই কালীতলার কথা বলার আগে উল্লেখ করা প্রয়োজন ভারতের সুপ্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যর কথা । ভারতের ইতিহাসের উপাদান ছড়িয়ে আছে প্রাচীন গুহার অভ্যন্তরে, ছড়িয়ে আছে লোকসংস্কৃতিতে। ইতিহাসের ব্যাপ্তি যেমন সৌধ ও অট্টলিকায় – তেমনভাবেই ইতিহাস ছড়িয়ে আছে মন্দির,মসজিদ, গির্জায় যা আমাদের জাতীয় জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। বঙ্গের পুরনো ইতিহাস জানতে হলে আমাদের যেতে হবে সেই সব প্রাচীন ধ্বংসস্তূপে অথবা ক্ষয়ে আসা ঐতিহাসিক নিদর্শনের কাছে। আমাদের যেতে হবে মন্দিরে, মসজিদে বা গির্জায়। আমাদের সংস্কৃতি ও আমাদের ইতিহাসের চর্চা অব্যাহত রাখতে ঘ্রান নিতে হবে লোকশ্রুতি নির্ভর প্রাচীন ধর্মীয় স্থানেও । বঙ্গের বিভিন্ন প্রাচীন মন্দির তাই ইতিহাসের কথা বলে। উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর সাতভাই ডাকাত কালীবাড়ি এমনই এক ঐতিহাসিক সম্পদ।


ভারত বাংলাদেশের সীমান্ত শহর উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ। বনগাঁ শহরের ইতিহাস বহু পুরোনো । ইতিহাসের শহর বনগাঁকে কে ঘিরে রয়েছে বহু আদি গ্রাম্য জনপদ । বনগাঁ রত্নগর্ভা। ইছামতি নদীঘেঁষা বনগাঁ শহর ও শহর লাগোয়া অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নীলদর্পণ খ্যাত দীনবন্ধু মিত্র , ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় , সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ বহু খ্যাতনামা ব্যক্তির নাম।কলকাতা থেকে বনগাঁর দূরত্ব অন্তত ৭৫ কিলোমিটার । বনগাঁর প্রান্ত সীমায় রয়েছে এক প্রাচীন মন্দির যার নাম সাত ভাই কালীতলা নামেই খ্যাত। সাধারণভাবে এই মন্দির লাগোয়া অঞ্চলের ডাকাত কালীতলা নামেও পরিচিতি রয়েছে। ডাকাত কালীবাড়ি বা সাতভাই কালীতলার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু লোকগাঁথা যা বয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে।জাগ্রত এই মন্দিরের সমাদর আজও কমেনি। লোকমুখে যা কথিত আছে তা ক্রমেই বিশ্বাসের আকার ধারণ করেছে। এখানে মানত করলেই মনোবাসনা পূর্ণ হবে। লোকশ্রুতি যেভাবে ইতিহাসের অঙ্গ হয় সেভাবেই এখানের ইতিহাস গড়ে উঠেছে। সাত ভাই কালীতলার ইতিহাস ডাকাতদের নিয়ে লোকশ্রুতি নির্ভর।বলাবাহুল্য,ডাকাতেরা ছিল সাত ভাই। আর এই সাত ভাই ডাকাতের প্রতিষ্ঠিত কালী বাড়ির নাম ইতিহাসখ্যাত।

উল্লেখ্য,ডাকাতদের সঙ্গে বঙ্গের ইতিহাস জড়িয়েছে যুগ যুগ ধরে। সেই সময়ের বাংলার ডাকাতদের মধ্যে শিবে ডাকাত, চিতে ডাকাত,মনোহর ডাকাত, বিশে ডাকাত বা রঘু ডাকাতদের খ্যাতি -কুখ্যাতি ও তাদের নিয়ে প্রজন্মর পরে প্রজন্ম ধরে সত্যি -মিথ্যে,বাস্তব – অতিরঞ্জিত কাহিনী আমাদের ইতিহাসে জড়িয়ে গেছে। আর এভাবেই কালে কালে ইতিহাসে জড়িয়েছে বনগাঁর সাত ভাই ডাকাত ও তাদের প্রতিষ্ঠিত মন্দিরের কথাও।লোকশ্রুতি নির্ভর ইতিহাস বলছে, অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন যশোরের এক জমিদার বাড়িতে ডাকাতি করতে যায় কালীচরণ, কালীপ্রসাদ, কালীকিংকর, কালীপ্রসন্ন-সহ মোট সাত ভাই। ইছামতী নদী পার হওয়ার সময় নাকি মা কালীর দর্শন লাভ করেছিল ডাকাতেরা। এই দেবী দর্শনের ঘটনা পরম্পরা মেনে চলে আসে এবং সত্য মিথ্যা যাই হোক না কেন, ডাকাতদের ঈশ্বর ভক্তি এবং ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে কালীপুজো করার প্রথার মধ্যে কোনও গালগল্প নেই। কালী ভক্তির বশবর্তী হয়ে শ্মশানের পাশে ইছামতীর পাড়ে বটগাছের তলায় কালী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে সাতভাই ডাকাতের দল ৷ সেও ছিল এক পৌষ মাসের রাত৷ সেদিন থেকে আজও প্রতি বছর পৌষ মাসের শনি ও মঙ্গলবার সাতভাই কালীতলায় জাঁকজমক করে পুজো হয়৷ ইতিহাসের স্মৃতি আঁকড়ে মায়ের মন্দিরে বংশ পরম্পরায় পূজার্চনা করে আসছেন আদি পুরোহিতরা৷ লোকশ্রুতি এও বলে, যশোরের জমিদার বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে ডাকাতের দল কালীঠাকুরের মূর্তি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল।পুরোনো বনগাঁর ইছামতি নদীর ধারে জঙ্গল ঘেরা বটগাছের নীচে স্থাপন করা হয় সেই জমিদার বাড়ি থেকে আনা দেবী মূর্তি।

মন্দির প্রতিষ্ঠার সঠিক সময় কাল নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও ধরে নেওয়া হয় বাংলার উল্লেখযোগ্য কুখ্যাত ডাকাতদের রমরমা যেসময়, তারই সমসাময়িক এই ঘটনা। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে বা ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগের যেকোনো সময়ের ঘটনা ধরে নেওয়া হলে বলতে হয় মন্দির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকেই বাংলার ডাকাতদের রমরমা। সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৮৪১ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত বাংলার ডাকাতদের ডাকাতি করার ঘটনা শিখরে পৌঁছেছিল।তাই সময়কাল যতই অতিরঞ্জিত করা হোক করে নেওয়া যায় কমবেশি ২০০ বছরের ইতিহাস রয়েছে সাত ভাই ডাকাত কালীবাড়ির। যদিও স্থানীয় মানুষরা দাবি করেন এই কালী মূর্তি এমনকী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা ৩০০ বা প্রায় ৪০০ বছর আগে। যদি এই দাবির পেছনে কোন ঐতিহাসিক সত্যতা নেই। তথাপি এই মন্দিরের প্রাচীনত্ত্ব নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই সন্দেহের অবকাশ নেই। কমল চৌধুরীর মত উত্তর ২৪ পরগনার ইতিহাসের গ্রন্থকাররা লোকশ্রুতি নির্ভর হয়ে উল্লেখ করেন, এক সময় ডাকাত কালীবাড়িতে হত নরবলিও।


জঙ্গলে ঘেরা কালিতলায় মূর্তি স্থাপনের লগ্ন থেকেই পৌষ মাসের শনি ও মঙ্গলবার পুজো হয়।সাতভাই কালীতলায় পুজোর জাঁকজমক চোখে পড়ার মত যেখানে দূরদূরান্তের বহু মানুষ ভিড় জমান ৷ ইছামতী নদী পেরিয়ে নৌকা করেই মায়ের কাছে আসেন বহু ভক্ত৷ বট গাছে লাল-নীল সুতোয় ঢেলা বেঁধে মানত করেন ভক্তেরা৷ মনোবাসনা পূর্ণ হলেই পুজো দিয়ে ওই গিঁট খুলে দিয়ে যান তাঁরা৷ পৌষ মাসে ভক্ত সমাগমকে কেন্দ্র করে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। এক মাস ব্যাপী চলে এই মেলা। কী থাকে না সেই মেলায়, বরং সাধারণ আর পাঁচটি মেলার থেকে একটু বেশিই পসরা নিয়ে সেজে ওঠে এই মেলা। পাশাপাশি রয়েছে ইছামতি বক্ষে নৌকা বিহারের উন্মাদনা। করোনা আবহে গত দুবছর সে রকম ভিড় না হলেও এবছর উপচে পড়ছে ভিড়। মায়ের কাছে আসতে পেরে সীমাহীন আনন্দে মাতোয়ারা ভক্তরা। সঙ্গে রয়েছে ভক্তদের প্রসাদ খাওয়ানোর ধূম। বিশাল মাঠ জুড়ে চলছে রান্না। হাজার হাজার ভক্তরা মায়ের প্রসাদ নিয়ে তবেই ফেরেন বাড়ি‌।
তবে শুধু পৌষমাস নয় সারা বছরই ভক্তের সমাগম থাকে এই মন্দিরে। পৌষ মাসে উপচে পড়ে ভিড়।

লোকশ্রুতি ও প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী দেবী মাহাত্ম্য যুক্ত স্থান সাতভাই কালিতলা। এখানের ধর্মপালন ও ধর্মচারণ এবং মেলার প্রসিদ্ধি মন্দিরকে ঘিরেই। এই স্থানকে ঘিরে লোকশ্রুতি, ধর্মবিশ্বাস এবং ধর্মীয় ভাবাবেগের সঙ্গে মিশে গিয়েছে জনজাতির ইতিহাস।সাতভাই কালীতলার মন্দিরের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে কালীভক্ত সাত ভাই ডাকাতের কাহিনী । সাত ভাই ডাকাতের প্রতিষ্ঠিত মন্দির ও প্রচলিত পুজোর শিকড় প্রসারিত হয়েছে আমাদের সংস্কৃতির ও ইতিহাসের অত্যন্ত গভীরে।।

About Post Author