অর্কজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ও পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৯ মে : সামনের বছর এই গরমেই হয়তো ভোট হবে। আমরা জানি না তার আগে আরেকটি রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন হবে কিনা। ভোট আর রাজনীতি এবং প্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথ নিয়ে চৰ্চার আগে উঠে আসছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চৰ্চার রাজনৈতিক তত্ত্ব। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখে ছিল “আমাদের সামাজিক সমস্যাগুলির রাজনৈতিক উপসর্গ” আর এই কথা যাঁর, সেই যুগপুরুষ রবীন্দ্রনাথ আজ তাঁর জন্মদিনে বড্ড প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আবহে। রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক হলেও তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে কোনও আলোচনা নেই, তাঁর জন্মদিনে রয়েছে শুধুই বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক বিবৃতি ও পাল্টা বিবৃতি।

১৯১৯ সালে জালিওয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ডে প্রবল ক্ষুব্ধ বিশ্বকবি তাঁর নাইট উপাধি ত্যাগের পরে লর্ড চেমস্ফোর্ডকে তিনি জানালেন, “আমার এই প্রতিবাদ আমার আতঙ্কিত দেশবাসীর মৌনযন্ত্রণার অভিব্যক্তি।” সার্বিকভাবে একথা প্রচলিত যে,রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তাধারাটি অত্যন্ত জটিল। আজকের রাজনৈতিক আবহে রবীন্দ্রনাথ ও সংস্কৃতির তত্ত্বটাই যেন আরও জটিল হয়ে উঠছে। কী এই জটিলতা? কেন এই জটিলতা?

এককথায় প্রথমেই বলে রাখা ভালো, রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে সংস্কৃতির পীঠস্থান হয়ে ওঠে জন্ম ভিটে ও নিবাস জোড়াসাঁকো।বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রতিবছর ২৫ শে বৈশাখে কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে ঢল নামে রবীন্দ্র প্রেমীদের। এবার চিত্রটা কিছুটা অন্যরকম।রবীন্দ্রপ্রেমীদের সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে সকাল থেকেই সরগরম থাকল জোড়াসাঁকো। আর রাজনৈতিক নেতারা আসবেন আর এক অন্যকে রাজনৈতিকভাবে বিঁধবেন না তা কি হয়?
আরও পড়ুন :চলচ্চিত্র জগতে আজও যেন অমর রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি!
সোমবার মধ্যরাতে পূর্ব নির্ধারিত একদিনের কর্মসূচিতে কলকাতায় আসেলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মঙ্গলবার সকালে তিনি পৌঁছে যান রবীন্দ্রনাথের বাড়ি জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। শাহের সঙ্গে ঠাকুরবাড়িতে যান রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপি রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। সেখানে রবীন্দ্রনাথের মূর্তিতে মাল্যদান করে করে শ্রদ্ধা জানান বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব। মাল্যদান পর্বের পর ঠাকুরবাড়ি চত্বর, সংগ্রহশালা ঘুরে দেখেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপর জোড়াসাঁকোর ভিজিটার্স বুকে সাক্ষরও করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সন্ধ্যায় সায়েন্স সিটিতে রবীন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে রাতের বিমানে দিল্লি ফিরবেন শাহ।
আরও পড়ুন : রবীন্দ্রনাথের পরলোকে বিশ্বাস ও পরলোকচর্চা: নেপথ্যে কী কারণ?
অতঃপর শাহের বঙ্গ সফর নিয়ে ইতিমধ্যেই আসরে নেমে পড়ে রাজ্যের শাসক দল তৃনমূল কংগ্রেস। সোমবার নবান্নে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শাহের বঙ্গ সফরকে নাম না করে কটাক্ষ করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘বাংলায় কেউ এলে আমরা তাঁকে স্বাগত জানাই। কিন্তু আমি মনে করি, বাংলায় আসার বদলে ওঁদের প্রথমে মণিপুরে যাওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’

রবীন্দ্র জয়ন্তী উপলক্ষ্যে শাহের আগেই জোড়াসাঁকোতে পৌঁছে গিয়েছিলেন কলকাতার মেয়র তথা পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। সেখানে রবীন্দ্র আবক্ষমূর্তিতে মাল্যদানের পর নেত্রীর পথেই শাহের বঙ্গ সফরকে কটাক্ষ করেন ফিরহাদ। তিনি বলেন, ‘ লোকসভা নির্বাচনের লক্ষ্যেই শাহের বঙ্গ সফর।
আরও পড়ুন :‘মোগাম্বো খুশ হুয়া’, অমিত শাহকে আক্রমণ উদ্ধব ঠাকরের
গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে পালা করে বঙ্গসফরে আসতেন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী- সহ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা। তখন বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের মুখেও শোনা যেত রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর – সহ অন্যান্য মনীষীদের নাম। এমনকি কবিগুরুর কবিতাও শোনা গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর মুখে। বছর ঘুরলে লোকসভা নির্বাচন। আর তার আগে রবীন্দ্র জয়ন্তীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বঙ্গসফর নিয়ে বাড়ছে জল্পনা।প্রশ্ন উঠছে, বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামা রবীন্দ্রনাথকে কী এবার রাজনীতির পণ্য করে রাস্তায় নামাল রাজনৈতিক দলগুলি? এর প্রেক্ষাপট কি? এ নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই বাঙালির দীর্ঘ ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথকে শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকা। তিনি শ্রদ্ধেয়, তিনি প্রণম্য, তিনি গৌরব। তাঁকে নিয়ে বাঙালির স্বতন্ত্র মাত্রার জ্যাত্যাভিমান। রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করা বাঙালির রক্তে মজ্জায়। পঁচিশে বৈশাখ বা বাইশে শ্রাবন উদযাপন ছাড়া বঙ্গকে জানা বা বঙ্গের প্রতি ভালোবাসা অপূর্ণ থেকে যায়।ভোট আসছে আর তাই দুর্ভাগ্যজনকভাবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন রাজনীতির ইউনিক সেলিং পয়েন্ট বা ইউএসপি।রাজনীতির মূলধন হয়ে ওঠেন নোবেলজয়ী কবি।আর রবীন্দ্র চৰ্চা প্ৰিয় মানুষ রাজ্য- কেন্দ্র সংঘাতের প্রাণের মানুষের জন্মতিথি উদযাপন থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন।বিশ্বকবির রাজনৈতিক আদর্শ হয়ে ওঠে না চর্চার বিষয়, তিনি হয়ে যান আবেগের নিরিখে রাজনৈতিক মুনাফালাভের কেন্দ্রবিন্দু।তথাপি সৌভাগ্য এটাই, দলমত নির্বিশেষে রাজ্য বা কেন্দ্রের সর্বোচ্চ স্তরের নেতারা এবং রাজ্য ও দেশের চালিকাশক্তি বুঝেছে বাংলার মাটি যা কিনা শক্ত ঘাঁটি, সেখানে সংস্কৃতি প্রিয় বাঙালি হৃদয় ও মনন স্পর্শ করতে হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই শেষ পারানির কড়ি।।
আরও পড়ুন :বাগানবাড়ির সোনালি দিন ও ১৫১ বছরের রবি ঠাকুর


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
কেন ফুল বদলালেন লিয়েন্ডার পেজ?