স্নেহা চক্রবর্তী,সময় কলকাতা ডেস্ক, ৮ মে :
রবীন্দ্রনাথের পরলোকে বিশ্বাস ও পরলোকচর্চা
আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না
ভূত নিয়ে চর্চা করার উৎসাহ কার না নেই! কেউ ভয় পায় কেউ বা উৎসাহ নিয়ে আরও বেশি করে চর্চা করে, কেউ আবার প্রেতলোক নিয়ে জানতে চায়, কেউ ছুঁতে চায় বিদেহী আত্মার ভাবনা । তেমনই আগ্রহ ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় ভূত, পরলোক এবং প্লানচেটে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন।কিশোরবয়সে ভূত -প্রেত – ব্রক্ষদৈত্যর প্রতি আকর্ষণ ছিল অনেকটাই কৈশোরক আগ্রহ যাকে যুক্তি দিয়ে তিনি বিচার করে দেখেন নি।বয়সবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দূরে সরে যায় বাল্যবয়সের ভূত – ব্রক্ষদত্যির ভাবনা। আবার যত প্রবীণ হয়ে উঠেছেন রবীন্দ্রনাথ, জীবনের প্রান্ত সীমায় যত উপনীত হয়েছেন তিনি, তাঁর মধ্যে পরলোক চেতনা যেন বারবার ফিরে এসেছে অন্যমাত্রা নিয়ে। নিজের জীবদ্দশায় একের পর এক নিকটজনের মৃত্যুশোক বয়ে নিয়ে চলা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ পরলোকচৰ্চার মধ্যে দিয়ে কি ছুঁতে চেয়েছিলেন পরলোকগত কাছের মানুষদের ভাবনাকে?

আরও পড়ুন : রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরচেতনা
অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো
রবীন্দ্রনাথের পরলোক জগতের প্রতি আকর্ষণ ও চর্চা একাধিক স্তরে বিন্যস্ত। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ব্রহ্মদৈত্যের গল্প সম্পর্কে উল্লেখ করে লিখেছেন, “দাদার এক বন্ধু যখন গল্পটা হেসে উড়িয়ে দিতেন তখন চাকররা মনে করত লোকটার ধর্মজ্ঞান একটুও নেই, দেবে একদিন ঘাড় মটকিয়ে, তখন বিদ্যে যাবে বেরিয়ে।” অর্থাৎ, এই ব্রহ্মদত্যির সূত্রে সেকাল আর একালের দুই রকম মননের মধ্যে লাগত টক্কর। একদিকে ছিল প্রাচীনপন্থী, অল্পশিক্ষিত চাকরদের “ধর্মজ্ঞান”, যে জ্ঞান তাদের প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়াই অলৌকিক, অবাস্তবের প্রতি বিশ্বাস জাগিয়ে রাখতে শেখায়। এই যুক্তিবাদ আলো নিয়ে আসে রবীন্দ্রনাথের মনে। ভৌতিক বিষয়গুলি ভ্রান্ত- এমনটাই তার মধ্যে ধারণা হয়। তাঁর প্রথম বয়সের লেখা পড়ে প্রতীয়মান হয় যে যুক্তি দিয়ে অলৌকিক জগতের প্রতি আগ্রহ তিনি মুছে ফেলেছেন। কারণ নিজেই বলেছেন “তা সেই বাদামগাছটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু অমন পা ফাঁক করে দাঁড়াবার সুবিধে থাকতেও সেই ব্রহ্মদত্যির ঠিকানা আর পাওয়া যায় না।ভিতরে বাইরে আলো বেড়ে গেছে।” সেই আলো কোন যাদুবলে আবার অলৌকিকের প্রতি টেনে নিয়ে যায় কবিগুরুকে?
যে রাতে মোর দুয়ার গুলি ভাঙল ঝড়ে
এই যে ১৪ বছরে বয়সে মাতৃবিয়োগের আঘাত তিনি যখন কাটিয়ে ওঠেন এবং ভৃত্য ও আত্মীয়দের মধ্যে বেড়ে ওঠেন, তখন তাঁর অলৌকিক ভাবনাহীন আলোকিত জীবন। পরবর্তী সময়ে একের পর এক আঘাত আসে স্ত্রী, পুত্র, সন্তানের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। ব্যক্তিগত জীবনে মৃত্যুর আঘাতে জর্জরিত হয়ে ওঠেন কবিগুরু। ১৯২৯ সাল নাগাদ তিনি নিজেই নিয়মিত শুরু করেন প্রেতচৰ্চার আসর। তার আগেই তিনি প্ল্যানচেটেও বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি একসময় জেনেছিলেন প্ল্যানচেটের মাধ্যমে মৃত মানুষের সাথে পুনরায় কথা বলা যায়। কথিত আছে, রবীন্দ্রনাথ নাকি প্ল্যানচেট এর মাধ্যমে মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাথেও কথা বলেছেন একসময়। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ভূতচর্চার বিরুদ্ধে কোন কঠোরতা ছিল না। বাল্যকালের আগ্রহ প্রবীণ বয়সে অন্য একস্তরের আগ্রহ এবং কার্যত বিশ্বাসে পরিণত হয়েছিল।

আরও পড়ুন :পাবলো পাবলো নেরুদা : বিশ্বসেরা কবি, বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব
দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে
রবীন্দ্রনাথের কল্পনাশক্তি এতটাই প্রখর ছিল যে তিনি সরাসরি কোন ভূতের উপস্থিতি তাঁর লেখা কোনও গল্পে দেননি।বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি এমনভাবে গল্প গুলি রচনা করতেন যে সরাসরি ভূতের উপস্থিতি গল্পে না থাকলেও এক ভয়ঙ্কর আবহের তিনি সৃষ্টি করতে পারতেন। এক কথায় বলা যেতে পারে, এক মনস্তাত্ত্বিক গল্পের রচয়িতা ছিলেন তিনি। আবার কিছু গল্প তাঁর জীবনের ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা, ‘কঙ্কাল’ গল্পটি এরকমই এক সৃষ্টি। কিশোর কালে রবীন্দ্রনাথের শোবার ঘরে একটি কঙ্কাল ঝোলানো থাকত, আর সেই কঙ্কালের উপস্থিতি ঘরে আরও দ্বিতীয় ব্যাক্তির আভাস দিত। মনে হত তিনি ছাড়াও সেই ঘরে যেন কেউ আছে। আর সেই থেকেই জন্ম নেয় একটি ভৌতিক গল্পের যার নাম ‘কঙ্কাল’।কাহিনী ও রচনার বাইরে ব্যক্তিজীবনে কবিগুরুর স্বভাব ছিল খুব ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে ঠাকুর বাড়ির ছাদে হাঁটাচলা করা। এরকম এক প্রেক্ষাপটে অশরীর ভাবনার উপরে ভিত্তি করে তিনি লিখে ফেলেন তার গল্প ‘ জীবিত ও মৃত’। রবীন্দ্রনাথ এই অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন এবং সেগুলি তিনি তার গল্পে প্রয়োগ ও করতেন।নিজের আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’-তে তিনি জানিয়েছিলেন তাঁর ছোটবেলার প্ল্যানচেট করার খবর। আর শেষ বয়সে এই আগ্রহ বেড়ে গিয়েছিল আরও বেশি। প্ল্যানচেট বা প্রেতচক্রে তাই হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলির সান্নিধ্যে কি তিনি স্বস্তি খুঁজছিলেন ক্ষণিকের জন্য?
তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়
একাধিকবার প্রেতচক্রের বা প্ল্যানচেটে আয়োজন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই প্ল্যানচেটে নিকটবর্তী অনেক মৃত আত্মীয় নাকি সাড়া দিয়েছিল। আত্মাদের সঙ্গে কবির কথোপকথনকেও কাগজ বন্দী করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের সচিব কবি অমিয় চক্রবর্তী এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়। শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র সদনে এখনো পর্যন্ত আটটি খাতা সংরক্ষণ করে রাখা আছে। যেখানে সেই মৃত মানুষদের আলাপ সংরক্ষিত আছে।ওই সংরক্ষণ গুলিতে দাবি করা হয়েছে, সেই প্রেতচক্রে সাড়া দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রিয়জনেরা, স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী, বড় মেয়ে মাধুরীলতা, দুই দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথ ও তাঁর স্ত্রী সাহানা প্রমুখ, সেই সময়ে যাঁরা সকলেই মৃত ছিলেন, যা শুনলে শিহরণ জাগে বৈকি! জন্মের ১৬২ বছর পরেও যিনি আমাদের মননে মহাপুরুষ, তাঁর পরলোকভাবনা আমাদেরও কি কোথাও ভাবায় না? কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জীবনে একের পর এক নিকটজনের মৃত্যুই কি একমাত্র তাঁর পরলোক চর্চার মূল কথা? কবিগুরু নিজেই তো বলেছেন, ” বিপদে মোরে রক্ষা করো, এ নহে মোর প্রার্থনা “।কবিতার মধ্যে দিয়ে জীবনের বিভিন্ন আঙ্গিক -কে ফুটিয়ে তোলা রবীন্দ্রনাথ মরণের পরপারে কী আছে তাও কি প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেছিলেন? তাঁর পরলোকচর্চা ও প্রেতচর্চার নেপথ্যে কি রয়েছে এরকমই এক আশ্চর্য অলৌকিক উপলব্ধি?
আরও পড়ুন :সাহিত্যে সব্যসাচী প্রেমেন্দ্র মিত্র


More Stories
ফাইনালে লাল কার্ড দেখা পারেদেসকে ‘খু*ন করতে চেয়েছিলেন’ মেসি?
সাপের কামড় খেয়ে পাল্টা সাপকে কামড়
বারুইপুর ‘এনকাউন্টার’: কর্মের ফল নাকি “সকালে জমা, বিকেলে খরচ!”