পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৯ মে : “একা ব’সে সংসারের প্রান্ত-জানালায়/দিগন্তের নীলিমায় চোখে পড়ে অনন্তের ভাষা।/আলো আসে ছায়ায় জড়িত/শিরীষের গাছ হতে শ্যামলের স্নিগ্ধ সখ্য বহি'” – রবীন্দ্রনাথের ১৯৪০ সালে লেখা আরোগ্য থেকে নেওয়া অংশবিশেষে ধরা পড়েছে রবীন্দ্রনাথের সারা জীবনের সঞ্চয় ও বিশ্বদর্শন। রবীন্দ্রনাথের এই বিশ্বদর্শনের শুরু জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে দেড়শতাধিক বছর পিছনে। সময়টা ১৮৭২ সালের ১৪ই মে। অর্থাৎ আজ থেকে ১৫১ বছর আগের কথা। বালক রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন সবে এগারো পূর্ণ হয়েছে।

আরও পড়ুন :রবীন্দ্রনাথের পরলোকে বিশ্বাস ও পরলোকচর্চা: নেপথ্যে কী কারণ?
সেসময় কলকাতায় ডেঙ্গুর প্রবল প্রাদুর্ভাব। মহামারির আকার নিতে চলেছে ডেঙ্গু। জোড়াসাঁকোর জন্ম ভিটে ছেড়ে বালক রবি তার পরিবারের অন্যদের সঙ্গে আশ্রয় নিলেন গঙ্গাধারের পানিহাটি বা পেনেটির ‘মোক্ষধাম’ নামের এক বিরাট দোতলা বাড়িতে। এ বাড়ির মালকিন তখন জনৈকা উপেন্দ্র মোহিনী দাসী। তখনকার দিনে বেশ মোটা টাকা দিয়ে লালচাঁদ মল্লিকের মারফত বিরাট দোতলা বাড়িতে এসে থাকতে শুরু করেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অনেকেই। ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের কাছে বাস্তবেই মোক্ষলাভের স্থান হয়ে উঠেছিল মোক্ষধাম। একে কলকাতায় তখন ডেঙ্গুর ভয়, অন্যদিকে কলা ও শিল্প প্রেমী ঠাকুর পরিবারের মানুষজনের কাছে প্রকৃতির কোলে ছবির মত বাড়িটি যেন মোক্ষলাভের ঠিকানা। তাঁদের মনের রসদ যেন ছিল মোক্ষধাম। বয়সে বালক হলেও শিল্পীমনের রবি ব্যতিক্রমী ছিলেন না।

আরও পড়ুন :চলচ্চিত্র জগতে আজও যেন অমর রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি!
তার জীবনস্মৃতিতে তিনি লিখেছেন, “প্রত্যহ প্রভাতে ঘুম থেকে উঠিবামাত্র আমার কেমন মনে হইত, যেন দিনটিকে একখানি সোনালি পাড় দেওয়া নতুন চিঠির মত পাইলাম। লেফাফা খুলিয়া ফেলিলে যেন কি পাওয়া যাইবে। পাছে একটুও কিছু লোকশান হয় এই আগ্রহে তাড়াতাড়ি মুখ ধুইয়া বাহিরে আসিয়া চৌকি লইয়া বসিতাম। প্রতিদিন গঙ্গার উপর এই জোয়ার ভাটার আসাযাওয়া, সেই কত রকম-রকম নৌকার কত গতি ভঙ্গি….” আর এরমধ্যে নিজেকে মনে মনে হারিয়ে ফেলতেন বালক রবি। তাঁর স্বপ্ন ও কল্পনারা মেলত উড়ান।

তাই তিনি তাঁর এক চিঠিতে তাঁর ভাইঝি ইন্দিরা দেবীকে লেখেন, ” ছেলেবেলায় পেনেটির বাগানে থাকতুম। পাশে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির থেকে দিন রাত্রির মধ্যে তিন-চারবার করে নহবত বাজত। আমার তখন মনে হত, আমি বড় হয়ে স্বাধীন হওয়া মাত্রই একটা এইরকম নহবত রাখব…..।” রবীন্দ্রনাথ পরে এই দিনগুলির কথা নিজের লেখায় ছবির মত করেই তুলে ধরেছেন।

জীবনস্মৃতিতে কবি কী লিখেছেন এই বাড়িতে আগমনের কারণ নিয়ে? তিনি বলেছেন, ” একবার কলিকাতায় ডেঙ্গুজ্বরের তাড়নায় আমাদের বৃহৎ পরিবারের কিয়দংশ ছাতুবাবুর বাগানবাড়িতে আশ্রয় লইল। আমরা তাহার মধ্যে ছিলাম। এই প্রথম বাহিরে গেলাম। গঙ্গার তীরভূমি যেন কোন পূর্বজন্মের পরিচয়ে আমাকে কোলে করিয়া লইল। সেখানে চাকরদের ঘরটির সামনে গোটা কয়েক পেয়ারা গাছ। সেই ছায়া তলে বারান্দায় বসিয়া সেই পেয়ারা বনের অন্তরাল দিয়া গঙ্গার ধারার দিকে চাহিয়া আমার দিন কাটিত।” জীবনস্মৃতিতে কবি আরও লিখেছেন, ” সেই পেয়ারা গাছের ছায়ার পশ্চিম দিক হইতে পূর্বদিকে অপসারণের” কথা ।

এই বাড়িতে সেবার সতেরো দিন কাটিয়ে যান বালক রবি। নদীর কোলে এই বাগানবাড়ি রবি ঠাকুরের সারাজীবন মনের মনিকোঠায় ছিল। নিজেদের বাড়ি না হলেও বারবার ফিরে এসেছেন এখানেই। ১৮৭৪ ও ১৮৭৮ সালে আবার যখন কলকাতায় ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়, তখন ঠাকুর পরিবারের অনেকের সাথে আবার এই বাড়িতে এসে বেশ কিছু দিন কাটিয়ে যান কিশোর রবি। ৬ বছরের মধ্যে তিনবার তাঁর পেনেটিতে এসে থাকা তার উপরে এক মোহময়ী প্রভাব ফেলেছিল এবং নদীতীরের এই সৌন্দর্যকে ঘরের বধূর সঙ্গে তুলনা করতেও কুন্ঠা বোধ করেননি কবি। প্রতিবারই যে মোক্ষধাম ও তার চারপাশের পৃথিবী নতুন করে রবীন্দ্রনাথের চোখে ধরা দিত, তা তার জীবনস্মৃতি ছাড়াও একাধিক লেখায় পাওয়া যায়। ”আশ্রমের রূপ ও বিকাশ” বইটিতেও রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছেন, পেনেটির দিনের কথা। তবে জীবনস্মৃতিতেই বিস্তারিতভাবে পেনেটির দিনগুলির উল্লেখ রয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন “বাংলাদেশের পাড়াগাঁটাকে ভালো করিয়া দেখিবার জন্য অনেকদিন হইতেই মনে আমার ঔৎসুক্য ছিল। সেই পাড়াগাঁ এই গঙ্গাতীরের বাগানের পশ্চাতেই ছিল – কিন্তু সেখানে যাওয়া আমাদের নিষেধ।” তবুও এই জামরুল গাছ, পেয়ারা গাছের আড়াল দিয়ে ঘাটে একলা বসে যক্ষপুরীর রাজ্যেও পৌঁছে গিয়েছেন কবি। বিভিন্ন গাছ গাছালিতে ঢাকা নদীতীরের এই বাগানবাড়ির সৌন্দর্য এতটাই অপরূপা ছিল, যে এই বাগানবাড়ি ধীরে ধীরে চরিত্র বদলাতে শুরু করল, এবং এই বাড়ি আর ভাড়া বাড়ি থাকল না। ১৮৮৬ সালে ময়মনসিংহের এক জমিদার কিনে নিলেন এই বাগান বাড়ি। কিন্তু জমিদারের হাতে থেকেও বাড়িটির রূপ ম্লান হতে থাকল। ১৯১৯ সালে আবার এসেছিলেন কবি এই বাড়িটিতে। থাকবেন ভেবেই আসা। তখন তাঁর ভুবন জোড়া খ্যাতি। কবির সঙ্গে সেবার ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ। কিন্তু কবির মন টেকেনি। বাড়ির রূপ ব্যথিত করেছিল রবীন্দ্রনাথকে। ফিরে যান তিনি। তথাপি এই বাগানবাড়ি এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল রবীন্দ্রনাথের উপরে, যা কিনা জীবদ্দশায় ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়নি কবিগুরুর পক্ষে।

বারবার পেনেটির বাগানবাড়িতে অল্প সময়ের জন্য হলেও ফিরে এসেছেন তিনি। ১৯২৮ সালে জমিদারের বাগানবাড়ি দুস্থ মহিলাদের অনাথ আশ্রম হয়ে যায়। গোবিন্দ কুমার হোম নামে এই অনাথ আশ্রমের দায়িত্বে আসে বোর্ড অফ ট্রাস্টি। ১৯৩৩ সালে এখানেই এক অনাথ মেয়ের বিবাহ উপলক্ষে আমন্ত্রিত হয়ে আসেন কবি। এ সময় একটি বটগাছও তিনি রোপন করেছিলেন। ১৯৩৪ সালে বাসন্তী কটন মিলের উদ্বোধন উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ পানিহাটিতে এসেছিলেন। এত কাছে এসে এই বাড়িতে ঘুরে যাবেন না তিনি, তা তো হয় না। শৈশবের, কৈশোরের স্মৃতি মাখা দিন যে বাগানবাড়িতে জড়িয়ে আছে, তাকে কখনও উপেক্ষা করতে পারেননি কবি।

কবি জীবনস্মৃতিতে নিজেই লিখেছেন, তিনি অমৃতের সন্ধান পেয়েছিলেন পানিহাটির বাগান বাড়িতে। তিনি লিখেছেন, ” অমৃত জিনিসটা রসের মধ্যে নাই, রসবোধের মধ্যেই আছে – এই জন্য যাহারা সেটাকে খোঁজে তাহারা সেটাকে পায়ই না। ” এই অমৃত কুম্ভ আজও আছে। পুরনো ইমারত কোথাও খসে পড়েছে, তবুও যা আছে, যেটুকু আছে, সবকিছুর মধ্যেই তিনি আছেন। ১৫১ বছর ধরেই আছেন। তিনি আছেন এই বাড়ির ইঁট-কাঠ-বরগা চুন- বালি-সুরকি আর গঙ্গার জোয়ারভাটায়। ক্ষয় হয়ে চলেছে প্রাচীন ঐতিহ্যশালী বাড়িটি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য পেনেটির ভগ্নপ্রায় বাগান বাড়ির মর্যাদা যদিও চির অক্ষয়, রবিস্পর্শে দীপ্তিমান।।
আরও পড়ুন : রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরচেতনা


More Stories
মহানায়ক উত্তম কুমার : জন্মদিনের চেয়ে মৃত্যুর দিনটি মানুষ মনে রেখেছেন, কিন্তু কেন?
ফাইনালে লাল কার্ড দেখা পারেদেসকে ‘খু*ন করতে চেয়েছিলেন’ মেসি?
সাপের কামড় খেয়ে পাল্টা সাপকে কামড়