Home » কামদুনি কাণ্ডের এক দশক: সেদিন ও আজ

কামদুনি কাণ্ডের এক দশক: সেদিন ও আজ

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা, ৭  জুন : রাত বাড়ছে। উত্তর চব্বিশ পরগনায় অন্ধকারে মোড়া একটি গ্রাম। আগুন জ্বলছে গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে। যদিও গ্রামের একটি বাড়িতেও উনুন জ্বলেনি, রান্না হয়নি, অভুক্ত গ্রামের প্রতিটি মানুষ। গ্রামবাসীরা রাস্তায়। তারা বিচার চায়। তারা ফাঁসি চায় । ফাঁসি চায় পিশাচদের। নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি চায় তারা। সেই পিশাচদের অবিলম্বে গেফতার করে আনতে হবে, তবেই পুলিশ নিয়ে যেতে পারবে তাদের গ্রামের নির্যাতিতা মেয়ের দেহ। পুলিশকে তাই তাদের মেয়ে, তাদের গ্রামের মেয়ের দেহ ছুঁতে দিচ্ছে না তারা। ভেড়ি লাগোয়া এক কোম্পানির লিজ নেওয়া জমিতে পড়ে রয়েছে গামছা দিয়ে ঢাকা তাদের মেয়ের নগ্ন দেহ। যে সেখানে নির্যাতিতা হয়ে মারা গেছে কয়েক ঘন্টা আগেই, যে কলেজ পড়ুয়া মেয়েটি অমানুষিক, বর্বরোচিত ধর্ষণ ও হত্যার শিকার। যার দেহ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না কয়েকঘন্টা ধরেই। দেহ পেতেই গ্রামবাসীদের নজরে আসে মানুষরুপী চিল, শকুনেরা যেন কুরে কুরে খেয়েছে তাকে। তার অত্যাচারের সাক্ষী তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা ফেনা যা তার চোখ, মুখ, ঠোঁট, নাক ঢেকে রেখেছে। এটাই সেই সেদিনের অন্ধকার গ্রাম কামদুনি, যে গ্রামে মানুষরুপী পশুদের অত্যাচারে প্রাণ হারিয়েছিল এক কলেজ পড়ুয়া তরুণী। এই মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনা এক দশক আগের অর্থাৎ দশ বছরপূর্ণ হল কামদুনি কাণ্ডের। কী কারণে এত আলোড়ন ফেলেছিল কামদুনি?

২০১৩ সালের ৭ জুন কামদুনি এক নৃশংস গণধর্ষণ ও খুনের সাক্ষী হয়, যার ফলশ্রুতিতে শুরু হয় গ্রামবাসীদের আন্দোলন। রাজ্যের মানুষ শিউরে ওঠে সেদিনের ঘটনার বিবরণে। পরবর্তীতে কামদুনিকাণ্ড রাজ্যবাসীকেই আবার নাড়া দিয়ে যায় বিভিন্ন ভাবে। চলতে থাকে কামদুনি গ্রামের বিক্ষোভ আন্দোলন। রাজ্য রাজনীতি উত্তাল হয়ে ওঠে ঘটনাটিকে ঘিরে। রাজ্য ছাড়িয়ে সারা দেশে প্রভাব ফেলে সেদিনের কামদুনি। মুখ্যমন্ত্রীকে ঘিরে ক্ষোভ জানাতে ভোলেনি গ্রামের মেয়েরা। জুটেছিল মাওবাদী তকমা। নিজেদের ক্ষোভ নিয়ে দিল্লি অভিযান পর্যন্ত করে সেদিনের অখ্যাত গ্রামটির মানুষেরা। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে তারা। একাত্ম, একজোট হয়ে সমগ্র গ্রামবাসী সুবিচার প্রত্যাশী হয়ে আন্দোলনে নেমেছিল, যার সাফল্য এসেছিল পরবর্তীতে। ধর্ষণের প্রতিবাদে সামিল মৌসুমী, টুম্পা, সুকান্ত, ভাস্কর সহ কামদুনির জোটবদ্ধ আন্দোলন আজও এক দৃষ্টান্ত।

১০ বছর আগের কামদুনির সেই ভয়ঙ্কর দিনটি ছিল বৃষ্টিভেজা। তখন আনুমানিক দুপুর দুটো কুড়ি বেজেছে। রাজারহাটের ডিরোজিও কলেজের কলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীটি কলেজ থেকে একাই ফিরছিল কামদুনি গ্রামে বাড়ির দিকে। কামদুনি বাস স্টপেজ থেকে গ্রামের শুড়িপথ ধরে বাড়ির পথে এগোচ্ছিল সে। পথেই আটবিঘার জমি, এক কোম্পানির লিজ নেওয়া ঘরে মদ-মাংস সহযোগে অপেক্ষায় ছিল কিছু বর্বর পিশাচ। আটবিঘা জমির গেটের সামনে থেকে নিমেষের মধ্যে আনসার আলি মোল্লা ও তার আট অপকর্মের শাকরেদ ক্ষীণতনু কলেজ ছাত্রীকে টেনে নিয়ে যায় গেটের ভেতরে। চলে পাশবিক অত্যাচার। গণধর্ষণ, পুনরায় ধর্ষণ। অত্যাচারে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ার পরে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা চলে। তার আগে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয় কলেজ ছাত্রীকে। এমনকি সরকারি মতে, মৃতাবস্থায় তার ওপরে চলে চরম পৈশাচিক অত্যাচার। সন্ধ্যে অব্দি মেয়ে বাড়ি না ফেরায় বাড়ির লোক অস্থির হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করে কলেজ ছাত্রীকে । গ্রামের চারটি পাড়ার মানুষ একযোগে খুঁজে শেষ পর্যন্ত আটবিঘার পাঁচিলের এক পাশে পড়ে থাকতে দেখে তরুণীর নিস্প্রান নগ্ন দেহ। মুখ দিয়ে বেরোনো ফেনা শুকিয়ে আছে। চরম অত্যাচারে শরীরটি স্বাভাবিক ছিল না। ঘাসে পড়ে থাকা নির্যাতিতার দেহের দুটি পায়ের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে উঠেছিল এতটাই, যা অত্যাচারের হাল বয়ান করছিল। গ্রামবাসীরা চুপ করে থাকে নি। মৃত তরুণীর শরীরটিকে রাস্তায় শুইয়ে রেখে আনসার আলি মোল্লা ও তার দুস্কর্মের সহযোগীদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে রাত থেকে চলে অবস্থান বিক্ষোভ। তৎকালীন আমিনপুর ফাঁড়ির অধীন গ্রামটির বাসিন্দারা জেলা পুলিশকে ঘিরে দফায় দফায় বিক্ষোভ দেখায়। ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ধরা পড়ল আট অভিযুক্ত। পরবর্তীতে ধরা পড়ল আরও একজন। প্রথমে বারাসাত আদালত ও পরে ব্যাঙ্কশাল কোর্টে চলে শুনানি। প্রায় ৩২ মাস দীর্ঘ সময় ধরে শুনানির পরে আদালত রায় দেয়। সইফুল আলি, আনসার আলি মোল্লা আর আমিন আলি – এই তিনজনের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। আমিনুর ইসলাম, ভোলা নস্কর, এমানুল ইসলাম – এদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই ঘটনায় ধৃত নয় অভিযুক্তর একজন বন্দী দশাতেই মারা যায়, অপর দুজন প্রমানের অভাবে বেকসুর খালাস পায়। এই ঘটনাকে বিরলতম আখ্যা দিয়ে বিচারক তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতৃত্ব গ্রামবাসীদের ওই প্রতিবাদ আন্দোলনকে অনেকটাই স্তিমিত করে দিতে সক্ষম হয়। নির্যাতিতার পরিবারকে গ্রাম থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তার ভাইকে সরকারি চাকরি দেওয়া হয়।

দশ বছর কেটে গিয়েছে।নারীদের সম্মান ফিরে পাওয়ার প্রশ্নে কামদুনি একটি নতুন দিশার উন্মেষ। নির্যাতিতার পরিবারের একাধিক মানুষ চাকরি পেয়ে আন্দোলন থেকে সরে গেলেও নির্যাতিতার পরিবার দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তিই চেয়েছিল। সর্বোপরি, সামগ্রিকভাবে গ্রামবাসীরা নির্যাতিতা মেয়েটি সুবিচার না পাওয়া পর্যন্ত কখনই আন্দোলন থেকে সরে আসে নি আর এজন্যই কামদুনি আন্দোলন আজও দৃষ্টান্ত। নৃশংস নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে একযোগে একটি অখ্যাত গ্রামের মানুষদের একজোট হয়ে রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস কালজয়ী হয়ে থাকতে বাধ্য।

আরও পড়ুন : সিরিয়াল কিলার শোভরাজের ডানহাত অজয় চৌধুরী এখন কোথায়?

About Post Author