Home » ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগের কান্ডারী রহিম স্যার

ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগের কান্ডারী রহিম স্যার

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা,১৭ জুন : ফুটবল নিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করা রহিম স্যার হয়তো আর অন্ধকারে পড়ে থাকবেন না।কোচদের নিয়ে কাহিনী ও চলচ্চিত্র কম নেই।বড় পর্দায় এর আগেও কোনির মত চলচ্চিত্র আমরা দেখেছি, যা মূলত উপন্যাস থেকে নেওয়া। সেখানে ক্ষিদ্দা র মত কোচ আমরা দেখেছি যাদের কোচিং নিয়ে আলেখ্য রীতিমত দর্শককে আপ্লুত করেছে। এবার উপন্যাস বা কল্পকাহিনী থেকে সরে বাস্তব জীবনের ফুটবল কোচ রহিম স্যারকে নিয়ে দর্শকদের সামনে আসছে একটি মুভি। বারবার মুক্তি বিলম্বিত হলেও কিছুদিনের মধ্যেই আসতে চলছে ফুটবল কে কেন্দ্র করে “ময়দান” চলচ্চিত্র।বইটি ভারতের ফুটবলের স্বর্ণযুগের এক দলিল হিসেবে সামনে আসতে চলেছে যা স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবল কোচের জীবনও তুলে ধরবে।বলা হচ্ছে,চলচ্চিত্রটির  লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে বাস্তবের খেলোয়াড়দের প্রামাণ্য  ফুটবল ম্যাচের একটি সিরিজের মাধ্যমে খেলাধুলার সারমর্ম তুলে ধরা।পরিচালক অমিত শর্মা ভারতের পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স এবং থাইল্যান্ডের মতো বিভিন্ন দেশের ফুটবল খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অনেক চেষ্টা করেছেন, যা চলচ্চিত্রটির বিশ্বব্যাপী আবেদনকে আরও তুলে ধরেছে ।  “ময়দান”  চলচ্চিত্রটির  নেপথ্যে যে দলটি কাজ করেছে তাদের বার্তা সুস্পষ্ট। তাদের প্রতিশ্রুতি একটি ব্যতিক্রমী মানের চলচ্চিত্র  উপহার দেওয়া যার যে চলচ্চিত্র ভারতের ঐতিহ্যর দিক থেকে   ভারতকে অত্যন্ত গর্বিত করবে ।”ময়দান” চলচ্চিত্রে কিংবদন্তী ফুটবল কোচ সৈয়দ আব্দুল রহিমের ভূমিকায় দেখা যাবে অজয় দেবগনকে। কে ছিলেন এই সৈয়দ আব্দুল রহিম?

কোচ রহিমের তত্ত্বাবধানে ভারত ১৯৫১ ও ১৯৬২ এশিয়ান গেমসে সোনা জিতেছিল। ১৯৫৬ সালে অলিম্পিক্সে চতুর্থ স্থানও ভারত পায় তাঁর কোচিংয়ে। হায়দ্রাবাদ নিবাসী মানুষটি ৫৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন ও তাঁর প্রয়াণের সাথে সাথে ভারতের ফুটবল গৌরব অস্তমিত হতে শুরু করে।১৯০৯ সালের ১৭ আগস্ট হায়দ্রাবাদে জন্ম আব্দুল রহিমের। ছোটবেলা থেকে ফুটবল প্রেম।ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পরে শিক্ষকতা শুরু করলেও ফুটবল ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান। একদিনের জন্য ফুটবলকে ভুলে যাননি ফুটবল তাঁর জীবনের স্বপ্ন, অনেক কিছু দেওয়ার আছে ফুটবলের মধ্যে দিয়েই। তাঁর প্ৰিয় ফুটবল দেশ ছিল পুসকাসের হাঙ্গেরি।হাঙ্গেরির গুস্তাব সেবেস ছিলেন তাঁর আদর্শ কোচ । রহিম ভালো ফুটবলার ছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্তরে ও ক্লাব স্তরে তিনি তার ফুটবল দক্ষতা তুলে ধরেছিলেন। হায়দ্রাবাদ কামার ক্লাবের হয়ে খেলতেন তিনি। হায়দ্রাবাদের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যেও তিনি ছিলেন অন্যতম। ফুটবলার হিসেবে নিঃসন্দেহে ভালো হলেও কোচ হিসেবে তিনি ছিলেন জিনিয়াস। চল্লিশের দশকের গোড়ায় হায়দ্রাবাদ সিটি পুলিশের কোচ হয়ে তিনি তাঁর কোচিং ভাবনার প্রসার ঘটাতে থাকেন। রহিম স্যার কোচ হিসেবে টেকনিকাল ভাবনার সফল প্রয়োগ ঘটাতে বেশ কিছু নতুনত্ব আনেন । তাঁর কোচিংএ হায়দ্রাবাদ সিটি পুলিশ পাঁচবার টানা রোভার্স কাপ জেতেন। ১৯৫০ সালে ডুরান্ড কাপের ফাইনালে মোহনবাগান দলকে হারিয়ে দেয় হায়দ্রাবাদ সিটি পুলিশ।১৯৪৮ সালে ভারতীয় দলে অলিম্পিকে ব্যর্থতার পরে তিনি ভারতীয় দলের দায়িত্ব তুলে নেন। ১৯৬৩ সালে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় ১৩ বছর ধরে তিনি সেই দায়িত্ব পালন করার ফাঁকে ভারতীয় ফুটবল ধ্যান ধারণার প্রভুত পরিবর্তন ঘটান।

ভারতীয় ফুটবলে  তার হাত ধরে আসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন।তাঁর কোচিং পর্বের আগে ভারতীয় ফুটবল ব্রিটিশদের মত সনাতন ড্রিবলিং নির্ভর ছিল। তিনি এসে পাসিং নির্ভর ফুটবলের ওপরে জোর দেন। স্কিল, স্ট্যামিনা বাড়ানোর পাশাপাশি অনামী ট্যালেন্টকে খুঁজে বার করার জন্য তাঁর জহুরির চোখ ছিল।১৯৫১ সালে তাঁর প্রথম সাফল্য ইরানের মত শক্তিশালী ফুটবল দলকে এসিয়াড ফাইনালে ১-০ গোলে হারিয়ে সোনা জয়ের মধ্যে দিয়ে আসে। ১৯৫২ সালে অলিম্পিক্স এ ভারত যুগোশ্লাভিয়ার কাছে দশ গোল খায়। এর প্রধান কারণ ছিল খালি পায়ে খেলা। এরপরেই ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন বুট পরে খেলা বাধ্যতামূলক করে। তবে এও বলা হয় হেলসিঙ্কি অলিম্পক্স দল গঠনের ক্ষেত্রেও রহিম স্যারকে ভারতীয় ফুটবল কর্তারা স্বাধীনতা দেননি।১৯৫৬ মেলবোর্ন অলিম্পিকসে ভারত ঘুরে দাঁড়ায় ও চতুর্থ স্থান পায়।১৯৬০ এও অলিম্পিকে ভারতের পারফরমেন্স ফেলে দেওয়ার মত ছিল না। গ্রুপ লিখে বিদায় নিলেও ফ্রান্সের সঙ্গে ১-১ গোলে ম্যাচ শেষ করে ভারত।হাঙ্গেরি, পেরুকেও কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলে দেয় ভারত।

 

মাঝে দুটি এশিয়ান গেমসে চূড়ান্ত সফল না হলেও মৃত্যুর এক বছর আগে ১৯৬২ সালে ভারত সোনার দৌড়ে ফেরে।ফাইনালের আগে ক্যান্সারে ভুগতে থাকা ও জীবনের প্রায় শেষ পর্বে দাঁড়িয়ে থাকা বিনিদ্র রহিম স্যার ফুটবলার দের কাছে তাঁর শেষ আকুতি জানান,”কাল আপ লোগো সে এক তোফা চাহিয়ে, কাল আপ সোনা জিতো।”ছাত্ররা কথা রেখেছিলেন ফাইনালে। রহিম স্যারের ট্যাকটিক্স ও ভোকাল টনিক কাজ করেছিল।পিকে বলরাম চুনী গোস্বামী থঙ্গরাজ রামবাহাদুর অরুন ঘোষরা কথা রেখেছিলেন।দক্ষিণ কোরিয়া তখন তুখোড় ফর্মে। কিন্তু অসম্ভব সাধন করেছিলেন ভারতীয়রা।সেদিন আহত স্টপার জার্নেল সিং স্ট্রাইকার হয়ে ভারতকে ২-০ গোলে এগিয়ে দেন। দ্বিতীয়ার্ধে কোরিয়ান রা একটি গোল শোধ করলেও জার্নেল -অরুন ঘোষরা জয় নিশ্চিত করেই মাঠ ছাড়েন। সোনা উপহার দেন তাঁদের প্ৰিয় রহিম স্যারকে। ১২ বছরের মধ্যে দেশ ফুটবলের দ্বিতীয় বার এশিয়া শ্রেষ্ঠ হয়।ক্যান্সারে ক্ষয়ে যেতে থাকা সৈয়দ আব্দুল রহিমের এই ছিল বিরাট প্রাপ্তি।এই প্রাপ্তিকে বুকে ধরেই ১৯৬৩ সালে ১১ জুন তারার দেশে পাড়ি দেন রহিম স্যার।ফুটবল ভাবনায় যুগের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা রহিম স্যার বাস্তবেই ছিলেন এমন এক অসামান্য নক্ষত্র যাকে কোনও বিশেষণ দিয়ে তুলনা করা যায় না।।

About Post Author