স্পোর্টস ডেস্ক, সময় কলকাতা, ১০ জুলাই: “তিনি আগামী প্রজন্মের জন্য একজন আইকন এবং অনুপ্রেরণা।” ভারতীয় তথা বিশ্ব ক্রিকেটের কিংবদন্তি ক্রিকেটার লিটল মাস্টার সুনীল গাভাস্কার সম্পর্কে এরকমই মন্তব্য করেছিলেন ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের অপর এক কিংবদন্তি স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস। রিচার্ডসের করা লিটল মাস্টার সুনীল গাভাস্কার সম্পর্কে মূল্যায়ন নিয়ে কথা বলার স্পর্ধা কেউ দেখায় নি । সম্পূর্ণ ব্যাটিং জীবন ধরে স্পর্ধা দেখিয়েছেন স্বয়ং লিটল মাস্টার। ফাস্ট বোলিংয়ের বিরুদ্ধে স্পর্ধা, ভারতীয়দের সম্পর্কে “ভীরু” অপবাদ কাটাবার জন্য পাল্টা জবাব দেওয়ার স্পর্ধা।৭১ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেই আগুনে বোলিংয়ের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তাও মাথায় হেলমেট না পরে। এতো আর মুখের কথা নয়। কিন্তু এই অসাধ্য করে দেখিয়েছিলেন মুম্বইয়ের ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির ২১ বছরের ছেলেটা। পরবর্তী সময়ে বিশ্ব ক্রিকেটে যিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সুনামের সঙ্গে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রায় আড়াই দশক। তিনি সুনীল মনোহর গাভাস্কার। ১০ জুলাই সেই কিংবদন্তি পা রাখলেন ৭৪ বছরে। ফিরে দেখা গাভাস্কার সম্পর্কে, লিটল মাস্টার সম্পর্কে কিছু জানা অজানা কাহিনী:
১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্যারিবিয়ান সফরে যাবে ভারতীয় দল। নেতৃত্বে অজিত ওয়াদেকার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের তখনকার দল তারকাখচিত কে নেই? গ্যারি সোবার্স, ক্লাইভ লয়েড, হোল্ডার, শিলংফোর্ড। তৎকালীন সময়ে সব রথী-মহারথীরা।
সেই সফরেই ডাক পেলেন মহারাষ্ট্রের তরুণ সুনীল গাভাস্কার। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২১ বছর। যদিও সিরিজের প্রথম টেস্টে আঙ্গুলের চোটের কারণে খেলতে পারেননি। দ্বিতীয় টেস্টে সুযোগ পেয়েই বোঝালেন তিনি লম্বা রেসের ঘোড়া। প্রথম ম্যাচের দুই ইনিংসে করলেন যথাক্রমে ৬৫ এবং ৬৭ রান।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভয়ংকর পেস বোলিংকে চোখে চোখ রেখে মোকাবিলা করলেন। চার ম্যাচ খেলে করলেন ৭৭৪ রান করেন। গড় ১৫৪। মজার বিষয় গোল প্রথম টেস্টে দলের তৃতীয় বোলার হিসেবে এক ওভার করেন গাভাস্কার।
দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ারে অনেক শতরান ও অর্ধশত রানের মালিক তিনি। তবে তাঁর প্রিয় ইনিংস কোনটি? গাভাস্কারের মতে ১৯৭৪ ইংল্যান্ড সফরে প্রথম টেস্টে খেলা ইনিংসটি। ইংল্যান্ডের পেস ও সুইং বোলিংয়ের কাছে অসহায় আত্মসমর্পন করে ভারতীয় ব্যাটাররা। বব উইলিস, ক্রিস ওল্ড, অ্যালান নটদের দাপুটে বোলিংয়ের সামনে একা লড়াই করেন গাভাস্কার। প্রথম ইনিংসে তাঁর ব্যাট থেকে আসে ১০১ রান ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৮ রান। ম্যাচটিতে ভারত পরাস্ত হয় ১১৩ রানে। তবে ১০১ রানের ইনিংসটিকে আজও ক্রিকেট জীবনের সেরা ইনিংস মনে করেন গাভাস্কার।
এরপরেই বলতে হয় ১৯৭৬ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের কথা। তখন ক্যারিবিয়ান দলের অধিনায়ক
ক্লাইভ লয়েড। যেই দলটি ১৯৭৫ সালে বিশ্ব ক্রিকেট সেরার তকমা পেয়ে গিয়েছে। সেই দলের বিপক্ষে এক অনন্য কীর্তি গড়েন গাভাস্কার। বার্বাডোজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচে চতুর্থ ইনিংসে জয়ের জন্য ভারতের প্রয়োজন ছিল ৪০৩ রানের। তখনও চতুর্থ ইনিংসে অত রান তাড়া করে জয় পায়নি কোনো দল। কিন্তু গাভাস্কার এবং গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের অনবদ্য জুটিতে ভর করে সেই ম্যাচ জিতে নেয় ভারত। ২০০৩ সাল অবধি চতুর্থ ইনিংসে রান তাড়া করে জেতার সেটাই ছিল সেরা নজির।
১৯৭৯ সালের ইংল্যান্ড সফরে এমনই আরও একটি অসাধারণ কীর্তি প্রায় গড়ে ফেলেছিলেন গাভাস্কার। ওভালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের শেষ টেস্ট ম্যাচে চতুর্থ ইনিংসে ভারতকে ৪৩৮ রানের লক্ষ্য দেয় ইংল্যান্ড। চতুর্থ ইনিংসে অত রান তাড়া করে সেই সময় কোনও দল জেতেনি। গাভাস্কারের দুর্দান্ত দ্বি-শতরানে ভর ক্রস অসম্ভবকে সম্ভব প্রায় করে ফেলেছিল ভারত। তবে ভারতীয় ব্যাটিংয়ের মিডল ও লোয়ার অর্ডারে দুর্বলতার কারণে ৮ উইকেটে ৪২৯ রানে থামতে হয় ভারতকে। অমীমাংসিত সেই ম্যাচে ২২১ রানের রাজকীয় ইনিংস উপহার দেন সুনীল গাভাস্কার।
মোট ১২৫ টি টেস্ট ম্যাচ খেলেন ভারতীয় ক্রিকেটের লিটল মাস্টার। ২১৪ ইনিংসে করেন ১০১২২ রান। গড় ৫১.১২। সর্বোচ্চ রান ২৩৬। ক্রিকেটার জীবনে মোট ৩৪ টি শতরান ও ৪৫ টি অর্ধশত রান করেন গাভাস্কার। সুনীল গাভাস্কারই টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ১০ হাজার রান সংগ্রহকারী ক্রিকেটার।
পাশাপাশি একদিনের ফরম্যাটে ১০৮ ম্যাচে ৩০৯২ রান করেন। নিজের একদিনের ক্রিকেট কেরিয়ারে একটিই শতরান করেছিলেন। ১৯৮৭ বিশ্বকাপে সেই শতরানটি করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। তাঁর ৮৮ বলে ১০৩ রানের দৌলতে জয় পায় ভারত। ১৯৮৭ সালে মার্চ মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ ও নভেম্বরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একদিনের ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান গাভাস্কার। তারপর থেকে দীর্ঘদিন ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার ও বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছেন। ক্রিকেট ময়দানের এই বর্ণময় চরিত্র ৭৪ পেরিয়ে ৭৫ বছরে পা রাখলেন।একের পর এক সেঞ্চুরি হাঁকানো মানুষটির লম্বা ব্যাটিং জীবনে যেরকম উল্লেখযোগ্য ব্যাড প্যাচ যেমন আসে নি জীবনও থাকুক সেরকমই, এমনটাই কামনা করে সময় কলকাতার পক্ষ থেকে লিটল মাস্টারকে শুভদিনে শুভেচ্ছা।


More Stories
কেকেআর-কে হারালেন, কে এই মুকুল চৌধুরী ?
গ্রেফতার অজি ক্রিকেট তারকা ওয়ার্ণার
কুপার কনোলি জেতালেন পাঞ্জাবকে