পুরন্দর চক্রবর্তী ও সানী রায়, সময় কলকাতা, ৩১ আগস্ট : রিকশার ইতিহাস সুপ্রাচীন।অথচ অস্তিত্ব সংকটে অনেকদিন ধরেই ভুগছিল রিকশা।যদি লক্ষ্য করা যায় তাহলে দেখা যাবে নব্বই থেকে একশো বছর গৌরব নিয়ে বাঁচার পরে এই শতকের গোড়া থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে রিকশা। কলকাতা থেকে সুদূর উত্তরবঙ্গ – সর্বত্র চিত্র এক। কেন বিলুপ্তির পথে রিকশা?
উল্লেখ্য, রিকশার জন্ম জাপান বলেই ধরা হয়। জাপানে দুশো বছর আগে উৎপত্তি হলেও যতদূর জানা যায় ভারতে রিকশা আসে প্রথম সিমলায়। জোনাথন স্কোবি নামে এক মার্কিন মিশনারির হাত ধরে ১৯৬৯ সালে সিমলায় প্রথম দেখা যায় রিকশা। বিংশ শতকের গোড়ায় কলকাতার রাস্তায় দেখা যেতে থেকে রিকশাকে। প্রথম দিকে মালটানার জন্যই রিকশা ব্যবহৃত হত।১৯১৪ সালে রিকশাকে মনুষ্যবাহী যান হিসেবে অনুমতি দেয় কলকাতা পুরসভা।১৯২০ সালের পর রিকশা আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে।দক্ষিণ থেকে উত্তর বা অধুনা বাংলাদেশ- সর্বত্র জনপ্রিয় হয় রিকশা। দুহাজার সালের কিছু আগে থেকেই অস্তিত্ব সংকট দেখা দেয় রিকশার। এর কারণ বিবিধ।
মানুষ দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে।রিকশার বিকল্প হিসেবে বেশ কিছু পরিষেবা চালু হতেই রিকশার সংকট ঘনায়। কলকাতায় অটোরিকশা জনপ্রিয় হতে থাকে বছর পঞ্চাশ আগেই। আশির দশকে জনপ্রিয় হওয়া অটো তুলনামূলক বেশি দূরত্ব কম সময়ে কম খরচে নিয়ে যেতে সক্ষম হওয়া রিকশা ছেড়ে অটোর দিকে ঝোঁকে মানুষ। বড় শহর গুলিতেও ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে অটো। পাশাপাশি, অন্য বিকল্প যানও দেখা দেয়। কলকাতা লাগোয়া শহরতলিতে মালবাহী রিকশা ভ্যানে মানুষ যাতায়াত শুরু করেন। বনেদি সংস্কৃতি ছেড়ে টাকা বাঁচাতে আগ্রহী মানুষ রিকশা-ভ্যানে উঠতে শুরু করেন। কিছু কিছু জায়গায় চলে আসে মোটর চালিত রিকশা-ভ্যান। অন্যদিকে, কলকাতায় রিকশার ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেতে থেকে। কলকাতা শহরে হাতেটানা রিকশা থাকলেও ২০০৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই ধরনের পরিবহন ব্যবস্থাকে “অমানবিক” আখ্যা দিয়ে হাতেটানা রিকশা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব আনে।এই সংক্রান্ত ‘ক্যালকাটা হ্যাকনি ক্যারেজ বিল’টি ২০০৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাস হলেও অদ্যাবধি কার্যকর করা হয়নি। হ্যান্ড-পুলড রিকশা ওনার অ্যাসোসিয়েশন এই বিলের বিরুদ্ধে একটি পিটিশন দাখিল করলে বিলের প্রয়োগে অসুবিধা পরিলক্ষিত হয়।কোনো কোনো শহরে যানজট সৃষ্টির জন্য সাইকেল রিকশা নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও পরিবেশবিদরা রিকশা দূষণহীন হওয়ায় রিকশাকে পরিবেশবন্ধু আখ্যা দিয়ে তার পক্ষে সওয়াল করে।
তবুও কালের সাথে সাথে দ্রুতগামী যানের দিকে ঝুঁকতে থাকে মানুষ আর এক্ষেত্রে টোটো বঙ্গজুড়ে চালু হতেই রিকশা মুমূর্ষু হয়ে পড়ে। রিকশাচালকদের ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থেই সংকট দেখা যায়। দক্ষিণবঙ্গে অনেক রিকশাচালক টোটো কিনে চালাতে শুরু করেন কিন্তু আর্থিক কারণে যারা টোটো কিনতে পারেন নি তাঁরা রিকশাকে সম্বল করে বাঁচার চেষ্টা করেন। কিন্তু গতির কারণে এবং দূষণহীন যান হিসেবে টোটোর গ্রহণযোগ্যতা এতটাই বেড়ে যায় রিকশার বিলুপ্তির পথে এগোতে থাকে।
সুদূর উত্তর বঙ্গেও একটা সময় শহর জুড়ে রিকশার রমরমা ছিল চোখে পড়ার মতো। রাস্তায় এখন তেমন ভাবে চোখে পড়ে না রিকশা । টোটোর সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে । টোটোর বাড়বাড়ন্তে সমস্যায় পড়েছেন রিকশা চালকরা। বিভিন্ন শহরের বিভিন্ন জায়গায় হাতে গোনা কয়েকটি দ্বিচক্রযান দেখা গেলেও ভাড়া জোটে না তাঁদের। ময়নাগুড়ির মত উত্তরবঙ্গের শহরের দিকে চোখ রাখলেই বোঝা যাবে রিকশার বিলুপ্তির চিত্র। শতকের গোড়ার দিক গোটা ময়নাগুড়ি জুড়ে প্রায় কয়েক হাজার রিকশাকে চলতে দেখা যেত। বর্তমানে শহরে হাতে গোনা তিরিশটির বেশি সুপ্রাচীন যানটির অস্তিত্ব নেই। যারা রিকশা চালাচ্ছেন তাঁদের কোনওদিন ভাড়া হয় কোনওদিন আবার দিনগুজরানের টাকাটুকু উঠছে না। টোটোর বর্তমান বাজার মূল্য লক্ষাধিক টাকা হওয়ায় টোটো কেনার আর্থিক সঙ্গতি নেই অনেক রিকশাচালকের।ময়নাগুড়ির ট্র্যাফিক মোড়ের মত রাজ্যের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে বসে থাকেন তীর্থের কাকের মত। বঙ্গ জুড়েই একই চিত্র। কালক্রমে সওয়ারি জোটে রিকশায়। ঐতিহ্যের প্রতীক প্রাচীন যান ক্রমেই হারিয়ে যেতে থাকে কালের সাথে সাথে।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
মোথাবাড়ি কাণ্ডের অশান্তির নেপথ্য “খলনায়ক” মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার কিসের ইঙ্গিত?
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ