সময় কলকাতা ডেস্ক, ৩০ সেপ্টেম্বর :কাশফুল, নীল আকাশ আর ঢাকের বাদ্যির যোগফল পুজো, বিশেষ করে উৎসবের আগে ঢাকের বাজনা শুনলে মনে হয় মা দুগ্গা ঘরে আসছেন। তাই ঢাকের সুরেলা শব্দ বাঙালির বুকে আলোড়ন তোলে, আনে উৎসবের জোয়ারের রেশ। যারা ঢাক বাজান তাঁরা পুজোয় প্রাণসঞ্চার করেন বছরের পর বছর। দুর্গাপুজোয় ঢাকিদের ভূমিকা অপরিহার্য। উত্তরবঙ্গের ঢাকিরা কেমন আছেন -কতটা আলোয়, কতটা অন্ধকারে আছেন?জলপাইগুড়ির ঢাকিপাড়া দেবনগরের ঢাকিরা-ই বা কেমন আছেন?
দূর্গাপূজা এলেই ডাক পড়ে ঢাকিদের। ফি- বছরের মত এবছরও ঢাকিদের পাড়া জলপাইগুড়ির দেবনগরে গিয়ে একদিকে দেখা যাবে ঢাকের শব্দ, ঢাকিরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন পুজোর, অন্যদিকে তাদের মনে রয়েছে আক্ষেপ ও হতাশার সুরও। এই পাড়ায় বেশ কিছু পরিবারের বাস। সারাবছর বিক্ষিপ্ত ভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাজনার কাজ করলেও তাঁরা তাকিয়ে থাকেন দূর্গাপূজা সহ অন্যান্য পূজার দিকে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির পর পরিস্থিতি পাল্টেছে।
অনেকে আগে ভিনরাজ্যেও পুজোয় যেতেন কিন্তু করোনার পর পুরোপুরি বাইরে যাওয়া বন্ধ। ফলে শিল্পীদের নতুন প্রজন্মের অনেকেই ঘরছাড়া। তারা ঢাক, বাঁশি, সানাই, হারমোনিয়ামের বদলে কেউ কড়াই- কর্নিক-পাটা হাতে তুলে নিয়ে ভিন রাজ্যে রাজ মিস্ত্রির কাজে যোগ দিয়েছেন । আবার কেউ টোটোর স্টিয়ারিং ধরেছে। এই পাড়ার শুভঙ্কর হাজরার মত যুবকদের দাবি,’আগের মত কদর নেই ঢাকিদের। ঘাম ঝড়ানো খাটুনির তুলনায় পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না। তাই নতুন প্রজন্ম ভিন্ন পেশার দিকে ঝুঁকছে।’
ঢাকিরা তাঁদের দুঃসময়ের কারণ বোঝেন।করোনার প্রভাব চলে গেলেও রেশ চলে যায়নি এখনও। পূজা কমিটির গুলো আগের মত চাঁদাও তুলতে পারে না। ফলে তাদের পারিশ্রমিকের কোপ পড়ে। তবে কিছুটা সুদিন আসবে সেই আশায় আছে নিতাই হাজরার মত অনেক ঢাকি। নিতাই এর দাবি,’করোনার পর ধীরে ধীরে হলেও সামান্য আলো দেখা যাচ্ছে । ঢাকি সম্প্রদায় আশায় আছেন,সুদিন ফিরে আসবে।
উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ির দেবনগরে বংশপরম্পরায় বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত বয়স্করা কেউ কেউ ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত। তাদের চোখেমুখে আক্ষেপের চিহ্ন স্পষ্ট। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন বাদ্য-বাজনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সরকারি ভাতা পান। উত্তরের জলপাইগুড়ির ঢাকিরা বঞ্চিত হয়েই থেকেছেন। রবি গুহ যিনি এক বর্ষীয়ান শিল্পী জানালেন,শিল্পীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রশাসনের কাছে যেতে যেতে তাদের জুতো ক্ষয়ে গেছে । বৃদ্ধভাতা বা শিল্পী ভাতা না পেলে ঢাক ও কাঠি তুলে রাখতে হবে।
দূর্গাপূজা সবার কাছেই আনন্দের। পূজার ক’টা দিন ঢাকিদের কাছে বাড়তি অর্থ উপার্জনের সময়। সেসময় পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে তাঁরা পরিবার ছেড়ে মণ্ডপে দিবারাত্র পড়ে থাকে। অথচ উপার্জন যে সেভাবে হয় তাও নয়।তবুও পিতা- প্রপিতামহের পেশায় তাঁরা আনন্দের লহরী তোলেন, মর্ত্যলোক ভেসে যায় শব্দ তরঙ্গে। আবাহন থেকে বিসর্জনে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোর সঙ্গী ঢাক। অথচ সেই ঢাকে বোল তোলেন যারা তাঁদের কপালে ভ্রূকুটি যুগের সাথে সাথে গভীরতর হয়েই চলেছে।ঢাকিদের ঘামে ভেজা শরীর ও ভারী হৃদয় একটু আর্থিক নির্ভরতা খোঁজে। ঢাকিদের দাবি,সেদিকে নজর দিক পুজা কমিটি ও প্রশাসন। এই দাবিই উঠছে ঢাকি পাড়ায়।
পুজোর কটা দিন পরিবার ও বাড়ির মানুষদের সঙ্গে কাটানোর স্বপ্ন তাঁরা দেখেন না। তাঁদের ঢাকের শব্দে যখন দশদিশা মুখরিত হয়, তখন তাঁদের চোখে একটাই স্বপ্ন ভেসে ওঠে। পুজোর দিনগুলোর বাড়তি দু পয়সা আয়ে যেন সংসার অধিকতর সচ্ছল হয়ে ওঠে, তাঁদের সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে। সারাবছর যারা পুজোর দিন গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন অর্থের জন্য, তাঁদের সুরলহরী অর্থাগমের ফাঁকে মানুষের মনে এনে দেয় আনন্দ। প্রশ্ন একটাই ঢাকিরা কি আদৌ আনন্দে রয়েছেন? উত্তরবঙ্গের ঢাকিদের প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?


More Stories
অভিষেক নিগ্রহ পর্ব : আদতে হয়েছিল কী? বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল, নেতা-নেত্রীরা কী বলছেন!
প্রাক্তন বিধায়ক রফিকুরের ভাই আনিস গ্রেফতার
তৃণমূলের শ্বাসকষ্টের আরেক শিকার অভিষেক ঘনিষ্ঠ শুভ্রকান্তির পদত্যাগ