Home » শহীদ হওয়ার ২০০ বছর পরেও বিপ্লবী বীর তিরৎ সিং মেলাচ্ছেন ভারত বাংলাদেশকে

শহীদ হওয়ার ২০০ বছর পরেও বিপ্লবী বীর তিরৎ সিং মেলাচ্ছেন ভারত বাংলাদেশকে

অমিত পাল ও পুরন্দর চক্রবর্তী (বাংলাদেশ ও ভারত),  সময় কলকাতা ,১৯ ফেব্রুয়ারি : ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে দেশকে স্বাধীন করার সংগ্রামের অন্যতম প্রবাদপ্রতিম বিপ্লবী নেতা তিরৎ সিংয়ের অবদানের কথা বর্তমান প্রজন্মের অনেকেরই জানা নেই। উনিশ শতকের গোড়ায় পাহাড়ি জাতি খাসিদের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন তিনি। তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে একসূত্রে জড়িয়ে আছে বর্তমান ভারত ও বাংলাদেশ। দুশো বছর আগে উ তিরৎ সিং অখণ্ড ভারতবর্ষকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন ব্রিটিশদের অপশাসন থেকে। তাঁর সঙ্গে ব্রিটিশদের যে ভুখন্ড নিয়ে সংঘাত বাঁধে তা ছিল অধুনা ভারত ও বাংলাদেশের অংশ। তাঁর প্রতি আজও শ্রদ্ধা অম্লান বাংলাদেশ ও ভারতে। সম্প্রতি ব্রিটিশ বিরোধী খাসি আন্দোলনের বিপ্লবী বীর যোদ্ধা উ তিরৎ সিংয়ের ভাস্কর্য উন্মোচন করা হয়েছে ঢাকায়।শুক্রবার ধানমন্ডির ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে স্থাপিত ভাস্কর্যটি উন্মোচন করেন মেঘালয়ের উপ-মুখ্যমন্ত্রী স্নিয়াওভালাং ধার এবং ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মা।

উল্লেখ্য, তিরৎ সিং সাইয়েম ছিলেন একজন লড়াকু পাহাড়ি খাসি জনজাতি প্রধান এবং দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা। তিনি সিয়েমলিহ গোষ্ঠীর অন্তর্গত ছিলেন এবং মেঘালয়ের খাসি পাহাড়ের একটি অঞ্চল নংখলাউয়ের সায়েম বা রাজা ছিলেন।  ভারতের এখনকার মেঘালয় রাজ্য ঔপনিবেশিক আমলে ‘খাসি হিলস’ নামে পরিচিত ছিল। সেখানকার নংখলাও অঞ্চলে ১৮০২ সালে জন্মগ্রহণ করেন উ তিরৎ সিং।ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সঙ্গে সিলেটকে যুক্ত করে ব্রিটিশদের একটি সড়ক নির্মাণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেমেছিল খাসি জনগোষ্ঠী। ঠিক কী হয়েছিল?

১৮২৬ সালে, ব্রিটিশরা ইয়ান্ডাবু চুক্তির সমাপ্তি ঘটিয়ে তাদের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় একটি শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে।সুরমা উপত্যকা (আসামে এবং আংশিকভাবে বাংলাদেশে) ব্রিটিশদের দখলে চলে গিয়েছিল। তারা সহজ পরিবহন এবং কৌশলগত উদ্দেশ্যে এই দুটি অঞ্চলকে সংযুক্ত করতে চেয়েছিল। এ জন্য তাদের খাসিয়া পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে রাস্তা তৈরি করতে হয়েছিল।

রাস্তা নিয়ে শুরু হয় সংঘাত যা বৃহত্তর আকারে নেয় খাসি আন্দোলনের রূপ ।১৮২৯ সালে শুরু হওয়া ব্রিটিশ বিরোধী খাসি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খাসি পাহাড়ের তিরৎ সিং।  ১৮২৯ সালের এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে তিরৎ সিংয়ের অধীনে খাসি বাহিনী ব্রিটিশ গ্যারিসন আক্রমণ করে যার ফলে দুই ব্রিটিশ পদস্থ আধিকারিকের প্রাণ যায়।ব্রিটিশরা অবিলম্বে প্রতিশোধ নিতে উদ্যত হয়। ব্রিটিশ ও খাসি জনজাতির মধ্যে  যে লড়াই শুরু হয়েছিল, খাসিরা সাহসী ও নির্ভীক হলেও তাদের শত্রুদের আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতে পেরে ওঠেনি।তা সত্ত্বেও, তিরৎ সিং এবং তার সৈন্যরা চার বছর ধরে ব্রিটিশদের সাথে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়েছিল।খাসিদের সংগ্রাম ব্রিটিশরাজের ভিতে নাড়া দিয়েছিল।

গেরিলা যুদ্ধে বুলেটের আঘাত সহ্য করে, তিরৎ সিং পাহাড়ের একটি গুহায় লুকিয়েছিলেন।১৮৩৩ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশদের দ্বারা বন্দী হন। বিচারের পর, তাকে  ঢাকা কারাগারে পাঠানো হয়। ঢাকা কারাগারে ১৮৩৫  সালের জুলাই মাসের ১৭ তারিখে তিনি বন্দী অবস্থায় প্রয়াত হন।তার মৃত্যুদিনকে ‘তিরৎ সিং দিবস’ হিসাবে পালন করা হয় সর্বত্র।

বাংলাদেশের সম্প্রতি  তিরৎ সিংয়ের ভাস্কর্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে তাঁর শ্রদ্ধা জানিয়ে মেঘালয়ের উপ-মুখ্যমন্ত্রী স্নিয়াওভালাং ধার বলেন, “খাসি জনগোষ্ঠীর অপ্রতিরোধ্য চেতনার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তিরৎ সিং। যে ঢাকায় তিনি শহীদ হয়েছেন, সেখানে তাঁর ভাস্কর্য উন্মোচন ‘খাসি পাহাড়ের বীরের’ প্রতি যথাযথযোগ্য সম্মান প্রদর্শনেরই অংশ।”

হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেন, “ঔপনিবেশিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে তার সাহসিকতা ও নিজের জনগণের স্বাধীনতার জন্য নিঃস্বার্থ সাধনার প্রকাশ হয়ে থাকবে তিরৎ সিংয়ের এই ভাস্কর্য।”এই ভাস্কর্য মেঘালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক নৈকট্যেরও প্রকাশ হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ভারত ও বাংলাদেশের ভুখন্ড রক্ষায় প্রাণ দিয়েছিলেন বীর যোদ্ধা তিরৎ সিং। মৃত্যুর ১৮৯ বছর পরেও ভারত বাংলাদেশকে মেলাচ্ছেন তিনি। দূর হয়ে যাচ্ছে ভৌগোলিক দূরত্ব।।

আরও পড়ুন মঙ্গলপান্ডে বা ক্ষুদিরাম নন, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম শহীদ জয়কৃষ্ণ রাজাগুরু

About Post Author