পুরন্দর চক্রবর্তী ও কোয়েলী বণিক,সময় কলকাতা,১৫এপ্রিলঃ বাংলাদেশ ও অসমের প্রান্তসীমায় অবস্থিত কোচবিহার জেলা। রাজ্যের অধিকাংশ জেলার মতই মূলত গ্রামকেন্দ্রিক এই জেলা। বঙ্গে তথা দেশে প্রথম দফার ভোট ১৯ এপ্রিল। আর সেদিনই কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রের ভোট পর্ব। প্রথম দফার ভোটের আগে কোচবিহারে জিতবে কে? তা নিয়ে পারদ বাড়ছে। এখানে ভোটযুদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাজ্যের প্রধান চারটি রাজনৈতিক শক্তি। বিজেপির হয়ে এখানে লড়বেন কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রের গতবারের সাংসদ ও বিদায়ী কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেসের জগদীশ বর্মা বাসুনিয়া। এই কেন্দ্রে বাম কংগ্রেসের রফা না হওয়ায় কংগ্রেসের হয়ে যেমন পিয়া রায়চৌধুরি প্রার্থী হয়েছেন, তেমনই প্রার্থী হয়েছেন ফরওয়ার্ড ব্লকের নীতিশ চন্দ্র রায়। পাশাপাশি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে জিসিপিএ (GCPA) বা গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশন তাঁদের প্রার্থী দিয়েছে। মাথায় রাখতে হবে কোচবিহারে জিসিপিএ-র প্রভাব অপরিসীম। কী কী ফ্যাক্টর এবারের ভোটে কোচবিহার কেন্দ্রে দেখা যাবে, তা জানার আগে পূর্ববর্তী নির্বাচন, রাজনৈতিক শক্তির অবস্থা এবং নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংখ্যা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দিকে নজর রাখা যাক-
কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে ২০১৬ সালের লোকসভা উপনির্বাচন ও ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির বিশেষ নামগন্ধ ছিল না। ২০১৪ সালেও এই কেন্দ্রে তৃতীয় স্থানে ছিল ভারতীয় জনতা পার্টি। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রবলভাবে শক্তি বৃদ্ধি ঘটে বিজেপির। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের চেয়ে ৩১.৬৪ শতাংশ বেশি ভোট পেয়ে প্রথমবারের মত কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে জয় পায় ভারতীয় জনতা পার্টি। তৃণমূলের পরেশ চন্দ্র অধিকারীকে ৫৪ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে জয়ী হন বিজেপির নিশীথ প্রামাণিক। ২০১৪ সালে এই কেন্দ্রে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন রেনুকা সিনহা। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে ২০১৬ সালে উপনির্বাচন হয়। পার্থ প্রতিম রায় এই কেন্দ্রে তৃণমূলের হয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন। সেবার তৃণমূল প্রার্থী বিজেপির চেয়ে ৪ লক্ষ ১৩ হাজার ভোট বেশি পান। স্বাভাবিকভাবেই ২০১৯ সালে বিজেপি রাতারাতি যাবতীয় সমীকরণ বদলে ফেলে প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়ে ক্ষমতায় আসে। একদা এই কেন্দ্রকে বলা হত ফরওয়ার্ড ব্লকের গড়। ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত আট বার লোকসভা নির্বাচন দেখেছে দেশ। আর এই সময়কালে প্রতিটি নির্বাচনে কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন ফরওয়ার্ড ব্লকের অমর রায় প্রধান। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে অমর রায় প্রধান ফরওয়ার্ড ব্লক থেকে বেরিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। তবে কোচবিহার কেন্দ্র ফরওয়ার্ড ব্লকের হাতছাড়া হয়নি। ২০০৪ সালে এবং ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও এই কেন্দ্রে জয়ী হন ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থীরা। ফরওয়ার্ড ব্লকের অভ্যুত্থানের আগে ১৯৫৭ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস জয়ী হলেও পরবর্তী ৩৭ বছর ধরে বাম শাসনেই ছিল কোচবিহার।
শুধু তাই নয় কোচবিহারের অন্তর্গত বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রেও ফরওয়ার্ড ব্লক রাজত্ব করে এসেছে। দিনহাটায় ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রবাদপ্রতিম নেতা প্রয়াত কমল গুহ ছিলেন শক্তির কেন্দ্রস্থলে। বর্তমান তৃণমূল বিধায়ক উদয়ন গুহের পিতা তিনি। কমল গুহ ১৯৭৭ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দিনহাটায় একটানা বিধায়ক ছিলেন। শুধু তাই নয়, ১৯৭৭ সালের আগেও দুবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। বিগত লোকসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের টিকিটে প্রার্থী হয়েও পরাস্ত হলেও পরেশ চন্দ্র অধিকারী ছিলেন কোচবিহারে ফরওয়ার্ড ব্লকের চারবারের বিধায়ক। তবে বাম ভোট সারা রাজ্যের মত কমেছে কোচবিহারেও। উদয়ন গুহ এবং পরে অধিকারীর মত নেতারা তৃণমূলে যোগদান করার পরে বামেদের সে অর্থে বড় নেতাও নেই কোচবিহারে। ফলে এবারের ভোটে একক ভাবে লড়ে কংগ্রেস বা ফরওয়ার্ড ব্লকের আশা খুবই কষ্টকল্পিত। তাদের পক্ষে দাগ কাটাই কার্যত অসম্ভব। ২০১৯ সালে এই কেন্দ্রে ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী গোবিন্দ চন্দ্র রায় পান ৩.০৭ শতাংশ ভোট। এবারের কংগ্রেস প্রার্থী পিয়া রায় চৌধুরী গতবারও নির্বাচনে লড়েছিলেন। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ছিল মাত্র ২৮০০০ যাকিনা ১.৮৫ শতাংশ। পাশাপাশি, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ও সিপিএমের ক্ষয় চরম আকার নেয়। বাম ও কংগ্রেস এই লোকসভা কেন্দ্র থেকে সম্মিলিত ভাবে মাত্র ১.৮ শতাংশ ভোট পায়। ফলে ২০২৪ সালে তাদের সংখ্যা তাত্ত্বিক দিক থেকে অবস্থান খুব আশাপ্রদ নয়। কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে যে সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে, তার মধ্যে মাথাভাঙ্গা, কোচবিহার উত্তর, কোচবিহার দক্ষিণ, শীতলকুচি ও নাটা বাড়ির বিধায়ক বিজেপির। শুধুমাত্র সিতাই এবং দিনহাটায় বিধায়ক তৃণমূলের। সিতাই কেন্দ্রের বিধায়ক এবার দাঁড়িয়েছেন লোকসভা ভোটে। তিনি বলছেন, মানুষের প্রতিশ্রুতি রাখেন বলেই ৩১ বছর ধরে কখনও ভোটে হারেননি তিনি।
যদিও দিনহাটায় ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৫৭ ভোটে জিতেছিলেন বিজেপির নিশীথ প্রামাণিক, কিন্তু সাংসদ পদ না ছাড়ায় উপনির্বাচন হয়। উপ নির্বাচনে জিতে দিনহাটার বিধায়ক হন তৃণমূলের উদয়ন গুহ। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিজেপির পক্ষে ভোট ছিল ৪৯ শতাংশরও বেশি, বাক্সে তৃণমূলের ভোট পড়েছিল ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ দু বছরের মধ্যে বিজেপির আরও শক্তি বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়। এবার কী অবস্থা, ইস্যুই বা কীকী? কোন বিষয় গুলি ভোটে প্রভাব ফেলতে চলেছে? প্রথমে জেনে নেওয়া যাক ভোট ময়দানে নেমে প্রার্থীরা কে কি বলছেন? নিশীথ প্রামাণিক আত্মবিশ্বাসী, দেশজুড়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিজেপির উন্নয়নমুখী কর্মকাণ্ডের শরিক সাধারণ মানুষ। মহিলারাও রয়েছেন তাঁদের পাশে। অন্যদিকে তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ তৃণমূলের জগদীশ বর্মা বাসুনিয়াও আত্মবিশ্বাসী। উত্তরবঙ্গে বারবার আসছেন প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী, যা বিগত ভোটে এতটা প্রবলভাবে দেখা যায়নি। কোচবিহার কেন্দ্রে ভোটের প্রচারে এবার জোর মনযোগ দিয়েছে তৃণমূল। তারা ঘ্রান পেয়েছে এই কেন্দ্রে তাদের সাফল্যের সম্ভাবনা আছে। এর একটি কারণ যেমন, বিগত ভোটে তৃণমূল-বিজেপির মধ্যে জয়-পরাজয়ের অঙ্কের হিসেবে ফারাক বিশাল কিছু ছিল না এবং তৃণমূলেরও বেশকিছু বিধানসভা কেন্দ্রে যথেষ্ট শক্তি আছে, তারচেয়েও বড় ফ্যাক্টর হতে পারে বিভিন্ন স্তরে বিজেপির প্রতি ক্ষোভ। প্রথমেই উল্লেখ্য, বিজেপির প্রতি রাজবংশী এবং আদিবাসীদের ক্ষোভ ভোটের আগে পরিষ্কার চোখে পড়ছে। মনে রাখা দরকার কোচবিহার কেন্দ্রে রয়েছেন প্রায় ৩৫ শতাংশ রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁরা বিজেপির বিরুদ্ধে ফুঁসছেন এ যেমন সত্যি, তেমন তৃণমূলের ওপরেও তাঁরা কতটা খুশি তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। তাঁরা কী বলছেন….
একথা সত্যি যে বিক্ষিপ্তভাবে রাজবংশীদের টুকরো টুকরো বক্তব্য শেষ কথা হতে পারে না। বরং অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজবংশী এবং জিসিপিএ নেতাদের বক্তব্য। বলা ভালো, জিসিপিএ মূলত দুই নেতা কেন্দ্রিক। একজন বংশীবদন বর্মণ, অপরজন অবশ্যই নগেন্দ্র রায়, যার পরিচিতি অনন্ত মহারাজ নামে। এখন দেখার অনন্ত মহারাজের ভূমিকা এবারের ভোটে কী হয়? এ নিয়ে কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না যে জিসিপিএ নেতা অনন্ত মহারাজের প্রভাব রাজবংশীদের মধ্যে অপরিসীম। রাজনৈতিক মহল ও বিশ্লেষকরা মনে করে থাকেন যে, রাজবংশী ভোটব্যাঙ্কের একটি বিরাট অংশ জিসিপিএ-তে অনন্ত মহারাজের অনুগামী। লোকসভা ও বিধানসভা ভোটে এই অংশ সরাসরি বিজেপির পাশে ছিল। তাঁকে বিজেপির তরফে রাজ্যসভায় পাঠানো হলেও তাঁদের স্বার্থ রক্ষা না হওয়ায় বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি তাঁদের সংগঠন। অনন্ত মহারাজ নিজেও দ্রুত বিষয়টি উপলব্ধি করেন। প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চে তাকে দেখা গেলেও তিনি বিজেপির প্রার্থী পদ ঘোষণার পর থেকেই ক্ষুব্ধ। তিনি এও বলেছেন, রাজ্য বিজেপি তাঁকে অবজ্ঞা করেছে। তিনি প্রায়শই বিজেপির প্রতি নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেলছেন। তাঁর বেসুরো হওয়ার কারণ কী? বিজেপি তাকে রাজ্যসভায় পাঠালেও রাজবংশীদের স্বার্থে তিনি যে যে দাবি তুলেছিলেন, তাঁর দাবি পূরণ হয়নি। না হয়েছে গ্রেটার কোচবিহারের দাবি পূরণ, না হয়েছে চিলা রায়ের মূর্তি স্থাপন, না হয়েছে নারায়ণী ব্যাটেলিয়ান ঘিরে তাঁদের স্বপ্ন পূরণ। অভিযোগ, বিজেপি রাজবংশীদের কোনও দাবি-দাওয়া পূর্ণ করেনি, কোনও রকম উন্নয়ন হয়নি বিজেপির পক্ষ থেকে। ফলশ্রুতি বিজেপি প্রার্থী নিয়েও তিনি সরব। আগে বিজেপির প্রচার এবং বিজেপি শীর্ষে থাকা নেতৃত্বের মঞ্চে তাঁকে যেমন দেখা যেত, তেমন তাঁর সমর্থক ও তাঁর সংগঠনের কর্মীদের উপস্থিতি দেখা যেত। তাঁদের পতাকাও উড়ত। এখন তিনি মঞ্চে থাকলেও তাঁর সমর্থকদের আর দেখা যায় না। বিজেপির প্রচারে তাঁরা অদৃশ্য। তবে তাঁর সমর্থকরাও অনন্ত রায়ের ওপরে কিঞ্চিত রুষ্ট। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই রণকৌশল সাজায় তৃণমূল।
একদিকে একদা অনন্ত মহারাজের অনুগামীদের মধ্যে বর্তমানে বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে গোপন বৈঠক সারেন তৃণমূলের জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিক। অন্যদিকে, অনন্ত মহারাজকে কাছে পাওয়ার জন্য তৃণমূল অগ্রসর হয়। অনন্ত মহারাজ নিজেও জানেন গ্রেটার কোচবিহারের ইস্যুগুলি পূর্ণ না হওয়ায় তার অনুগামীরা তার থেকে দূরে সরছেন। ফলে তৃণমূলকে সমর্থনের প্রশ্নে মৌনতা সম্মতির লক্ষণ নিয়েই ভোটের সাত দিন আগে তার স্ট্যান্ড পয়েন্ট তৈরি করেছেন। রাজ্যসভার সাংসদ হওয়ার কারণে বিজেপির সরাসরি বিরোধিতা না করলেও ভোটের ময়দানে কতটা তৎপর হবেন তা নিয়ে সন্দেহ কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। অনন্ত মহারাজ বিজেপিকে খোলাখুলি সমর্থন জানাচ্ছেন না, তৃণমূল বিরোধের কথাও তার মুখে শোনা যাচ্ছে না। ফলে অনন্ত মহারাজ ইস্যুতে এবং তাঁর অনুগামীদের ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল। তাঁর অনুগামীদের একাংশ মুখে বলছেন, কর্মসংস্থানের প্রশ্নেই তারা মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিতে ভরসা রাখছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুধুমাত্র এই তাসই খেলেননি, তিনি যা যা করেছেন এবং যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা নির্বাচনী প্রচারে তার মূল অস্ত্র। মুখ্যমন্ত্রী বা তৃণমূল কী করেছে বা কী কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে সে প্রসঙ্গে ঢোকার আগে যা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে, তা হল জিসিপিএ বা গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের অনন্ত মহারাজ ছাড়া বাকিদের ভূমিকা। ভোটের ময়দানে জিসিপিএ অবতীর্ণ। ভোটের সাত দিন আগেও জিসিপিএ ভোটে নিজস্ব শক্তিতে লড়তে চাইলেও দেখা গিয়েছে দুটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে তাদের তুলনামূলক অনুরাগ তৃণমূলের প্রতি কিঞ্চিৎ বেশী শুধু নয়, তাঁরা প্রার্থী দিলেও তৃণমূলকে খোলামেলা সমর্থন জানিয়েছেন। তারা চান তাদের দাবিদাওয়া পূর্ণ হোক এবং বিজেপির উপরে বিশ্বাস করে তারা ঠকেছেন, এমনটাও জানিয়েছেন জিসিপিএ প্রার্থী অমল দাস। তিনি কী বলছেন….
অনন্ত মহারাজকে বাদ দিলে রাজবংশী নেতৃত্বের প্রধান মুখ বংশীবদন বর্মণ। ভোটে নিজেদের দলীয় প্রার্থী লড়লেও রাজবংশী নেতা বংশী বদন বর্মন তৃণমূলের প্রচারে নেমে পড়েছেন। তৃণমূল তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে বললেও, পৃথক রাজ্যের দাবি তৃণমূল কতটা মেনে নেবে, তা নিয়েও থেকে যাচ্ছে প্রশ্ন। তবে বীর যোদ্ধা চিলা রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং নারায়ণী সেনায় কর্মসংস্থানের প্রশ্ন ও সার্বিক উন্নয়নের দিকে চোখ রেখে জিসিপিএকে তৃণমূল কাছে টানতে চাইছে। জিসিপিএ-র তৃণমূলকে সমর্থন কোচবিহারের মতো টানটান প্রতিদ্বন্দ্বিতার আসরে বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে। জিসিপিএ নাকি তৃণমূল, রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষ কোথায় ভোট দেবেন? বংশী বদন বর্মনের বক্তব্যে পরিষ্কার, রাজবংশী মানুষের ভোট যেন বিজেপিতে না যায়। রাজবংশীদের ভোট পাওয়া, নিদেন পক্ষে বিজেপির রাজবংশী ভোট ধ্বংস করা, এদিকেই তৃণমূলের পাখির চোখ। আর এখানে তাৎপর্যপূর্ণ এবং কোচবিহার কেন্দ্রের সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে কামতাপুরি নেতা জীবন সিংহের নিজের ডেরা থেকে পাঠানো বক্তব্যে। তিনি আবার বলছেন, তৃণমূলের প্রতি জিসিপিএ-র সমর্থন দুর্ভাগ্যজনক। তবে জীবন সিংহ কেন্দ্রের পাশে থাকলেও এবারের ভোটে কতটা তিনি প্রভাব ফেলবেন, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে উন্নয়নের প্রশ্ন। নদীবাঁধের চাহিদা বা আবাস যোজনা এখানে কম গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। মূল প্রশ্ন উন্নয়ন, যা ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও রয়েছে প্রার্থীদের মধ্যেই। বাম ও কংগ্রেস প্রার্থীরা ভোট যাই পান না কেন, তাঁরা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ইস্যুতে বিঁধছেন মূলত বিজেপিকে।
এবার আসা যাক স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান ও স্ট্র্যাটেজি নিয়ে। কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্র ঘিরে পাক খেতে থাকা বিভিন্ন ইস্যুতে বিজেপি কিছুটা হলেও মাটি হারাচ্ছে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। আগেও দেখা গিয়েছে রাজবংশী ভাষাকে বঞ্চনার জন্য বিজেপি বিধায়কদের যেমন মিহির গোস্বামীদের দায়ী করে সরাসরি রাস্তায় নেমেছেন রাজবংশীরা। ভাষাগত দিক থেকে রাজবংশী ভাষাকে বঞ্চনার অভিযোগ বা সামান্যতম কমন ডিমান্ডগুলি না মানার অভিযোগ ওঠায় বিজেপির অস্বস্তি বেড়েছে। এর মধ্যে যা যা দাবি রয়েছে, তাকে চিহ্নিত করে ফেলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি রাজবংশীদের সেন্টিমেন্টকে হাতিয়ার করেছেন। তৃণমূলের সুপ্রিমো দাবি করেছেন, রাজবংশী ভাষায় প্রচুর স্কুল করা হয়েছে। আরও করা হবে। রাজবংশীদের স্বার্থে প্রকৃত উন্নয়ন তৃণমূল করেছে, করে চলেছে এবং করবে। তিনি বলেছেন, চিলা রায়ের কথা দেশ জানুক তিনি চান। রাস্তা ও বিমানবন্দরের ক্ষেত্রেও তৃণমূল পদক্ষেপ নিয়েছে। নারায়ণী সেনায় আরও কর্মসংস্থান বাড়বে, দাবি মুখ্যমন্ত্রীর।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তৃণমূলের রাজবংশীদের পাশে পাওয়ার জন্য আগ্রাসী ভূমিকা ও রাজবংশীদের একটা বিরাট ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিজেপি আদৌ এই ক্ষোভ বিক্ষোভের অবসান ঘটিয়ে, নিজেদের আসন ধরে রাখতে পারবে কি? তবে কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে সাফল্য ও ব্যর্থতার বীজ লুকিয়ে রয়েছে বিভিন্ন জনজাতি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় এবং উত্তরবঙ্গ তথা ডুয়ার্সের উন্নয়নের প্ৰশ্নে চাহিদা পূরণের মধ্যে। অত্যন্ত পরিষ্কার যে, বিজেপি-তৃণমূল বাদে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ যদি থাকত, তবে তাকে হয়তো সমর্থন করতে পারত ভোটের নির্ণায়ক বিভিন্ন শক্তি ও কোচবিহারের সাধারণ আমজনতা। ভোটে স্রেফ সম্ভবনার কথা বলে কোনও শর্ত রেখে এগোনোর প্রশ্ন ও সুযোগ নেই। কোচবিহারের মানুষ ভোটকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিজেদের দাবি আদায়ের প্রধান প্ল্যাটফর্ম ভাবছেন। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে লড়াই বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে, সেখানে বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ বেড়ে চলার ইঙ্গিত মিলছে। বিজেপির কতটা ভোট ক্ষয় হয় এবং তা তৃণমূলের কতটা সুবিধে করে দেয় এটা দেখার। উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক সাধারণ মানুষ যে তৃণমূলের প্রতি খুব খুশি তাও নয়। হলে আরও জটিলতর হয়েছে কোচবিহারের ভোটের সমীকরণ।
রাজবংশী বা রাজবংশী ব্যতিরেকে সাধারণ মানুষ সকলেই মনে করেন কোচবিহার তুলনামূলকভাবে অবহেলিত। তাঁরা উত্তরবঙ্গের প্রকৃত উন্নয়ন চান আর তাই ভোটে সাফল্য লাভের অন্যতম সমীকরণ উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন। কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গের মানুষের কথা ভাবা যতটা কঠিন, তাঁদের উন্নয়ন ঘটানো আরো কঠিন মনে করছেন কোচবিহারের এক বিশাল সংখ্যক মানুষ। তৃণমূল বা বিজেপির অবশ্যই বেশ কিছু নিশ্চিত ভোট রয়েছে। ভোটের আগে দল বদলের পালা অব্যাহত। নিশীথ প্রামাণিক নাকি জগদীশ বর্মা বাসুনিয়া? নাকি ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে তৃতীয় কোনও শক্তি? আপাতদৃষ্টিতে কোচবিহার কেন্দ্রের সমীকরণ রীতিমত গোলমেলে। তবে বিজেপির ভোটবাক্সে টান পড়তেই পারে। কারণ উত্তরবঙ্গের বহু মানুষ বিজেপির উপরে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তৃণমূল এই ক্ষোভের ডিভিডেন্ট ভোট বাক্সে নিয়ে আসতে পারে কিনা সেটাই দেখার। তৃণমূল কংগ্রেস বিরাট কিছু শক্তি বৃদ্ধি না করলেও নিশীথ প্রামাণিকের জয় খুব যে মসৃন হবে না, তা কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রের ভোটের নির্ণায়ক বিভিন্ন শর্তগুলি থেকে অত্যন্ত পরিষ্কার। জগদীশ বর্মা বাসুনিয়া চোখ রাখছেন বিজেপি ভোট বাক্সে ক্ষয়ের দিকে, যা তৃণমূলের লাভ ঘটাতে পারে। গত লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে যাই হয়ে থাকুক, এবার তৃণমূল আসন ফিরে পাওয়ার জন্য বিবিধ রণকৌশল সাজিয়েছে। তাই কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রের লড়াই সেয়ানে সেয়ানে, যেখানে পালা বদলের সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
#2024loksabhaelection
#Latestbengalinews


More Stories
ময়নাগুড়িতে গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত ২ তরুণী , আহত ৫
মধ্যমগ্রামে ভয়াবহ আগুন, মৃত্যু ১
রাজনীতির উর্দ্ধে উঠে নেতা যখন পরীক্ষার্থীদের মুশকিল আসান