পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা , ৪ মে : IPL 2024 ভারতীয় দলের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। বিশ্বকাপে ভারতের সম্ভাব্য প্রথম একাদশে এমন চারজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় রয়েছেন যারা আইপিএল ২০২৪ সংস্করণে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে প্রায় প্রতিটি ম্যাচে খেলেছেন। এঁরা হলেন ভারতীয় অধিনায়ক রোহিত শর্মা, সূর্য কুমার যাদব, যশপ্রীত বুমরা এবং মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স দলের হয়ে আইপিএলে এবারের অধিনায়ক হার্দিক পান্ডিয়া। এঁরা প্রত্যেকেই ভারতীয় দলের অধিনায়কত্ব করেছেন কোনও না কোনও সময়।হার্দিক পান্ডিয়া ছাড়া বাকি তিনজনের পারফরম্যান্স খুব যে খারাপ তাও নয় বরং ভালোই বলা যেতে পারে। এদের মধ্যে যশপ্রীত বুমরা-র পারফরমেন্স তাক লাগানোর মত। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী দশটি দলের মধ্যে বোলার হিসেবে বুমরার পারফরমেন্সের ধারে কাছে নেই অন্য কেউ। রোহিত শর্মা আইপিএলে বরাবর যেরকম খেলে থাকেন তেমনটাই খেলেছেন। সূর্য কুমার যাদব প্রতিযোগিতার শুরুতে ফিট ছিলেন না , পরে একাধিক ভালো ইনিংস খেলেছেন। যে দলের তিনজন গুরুত্বপূর্ণ প্লেয়ার ভালো খেলছেন সেই দল এবারের আইপিএলে মুখ থুবড়ে পড়ল কেন? কেন ১১ টি ম্যাচে তিনটি ম্যাচ জিতে দশ দলের ৯ নম্বরে অবস্থান করছে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ? মুম্বাইয়ের ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে চেষ্টা করা হল এই প্রতিবেদনে।

মুম্বাইয়ের ব্যর্থতার কারণ একাধিক হলেও হার্দিক পান্ডিয়াকে অধিনায়ক করার সিদ্ধান্ত বুমেরাং হওয়া মুম্বাইয়ের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে প্রধান বলেই বিবেচনা করছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা। অধিনায়ক কি করে “খলনায়ক” হয়ে উঠতে পারেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হার্দিক পান্ডিয়া।২০২২ ও ২০২৩ সালে গুজরাট টাইটান্স আইপিএলে চাম্পিয়ান ও রানার্স হয়েছিল হার্দিক পান্ডিয়ার হাত ধরে। ২০২৪ সালে তাকে অধিনায়ক করে নিয়ে আসা হয় মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স দলে। রোহিত শর্মাকে অধিনায়কত্বের পদ থেকে সরানো হয় । রোহিতের নেতৃত্বে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স। মুম্বাইকে ২০২৩ সালের আইপিএলে প্লে-অফে তুলেছিলেন রোহিত শর্মা। কয়েক মাস আগেই শেষ হওয়া বিশ্বকাপ ক্রিকেটে রোহিত শর্মার ফর্ম ছিল তুখোড়। তার অধিনায়কত্বও দেশে ও বিদেশে প্রশংসিত হয়। তার জনপ্রিয়তা আকাশ স্পর্শ করে। এরপরেও রোহিত শর্মাকে মুম্বাই দলে স্রেফ খেলোয়াড় হিসেবে রেখে হার্দিক পান্ডিয়াকে অধিনায়ক করে নিয়ে আসা হয় যা অত্যন্ত আলোড়ন ফেলে দেয় । মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ফ্রেঞ্চইসির এই সিদ্ধান্ত মানতে পারেননি মুম্বাই সমর্থকরা। হার্দিক পান্ডিয়া অধিনায়ক হলে তবেই মুম্বাই দলে তিনি ফিরবেন এমন প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তা গৃহীত হওয়ায় রোহিত শর্মার অপসারণ ঘটে অধিনায়কত্ব থেকে। চোখের মণি রোহিত ট্র্যাজিক নায়ক হয়ে ওঠেন, হার্দিক হয়ে ওঠেন দর্শক সমর্থকদের চক্ষুশুল। কালেকালে, হার্দিককে অধিনায়ক করার সিদ্ধান্ত কার্যত বুমেরাং হয়ে ফেরে। কারণ হার্দিক কে অধিনায়ক করায় দলের ফোকাস নড়ে যায়, হার্দিককে অধিনায়ক হিসেবে মানতে পারেননি ভারতীয় দলে বিভিন্ন সময় অধিনায়কত্ব করা সূর্য কুমার যাদব এবং যশপ্রীত বুমরা যা তাঁদের বিভিন্ন সময় সোশ্যাল নেটওয়ার্ক করা পোস্ট থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়। এছাড়াও ভারতীয় দলে খেলা ঈশান কিষান বা অন্য অনেক তরুণ মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স প্লেয়ারদের কাছে রোল মডেল রোহিত শর্মা। তাদের চোখে একমাত্র অধিনায়ক রোহিত শর্মা, অন্য কাউকে অধিনায়ক হিসেবে তারা মানতে চাইছিলেন না। পাশাপাশি,রোহিত শর্মার সঙ্গেও হার্দিক পান্ডিয়ার রসায়ন মোটেই ভালো ছিল না। মাঠে বিভিন্ন সময় তা ধরা পড়তে থাকে। অতঃপর চূড়ান্ত সময় আরও ভুল সিদ্ধান্ত ধরা পড়তে থাকে। কলকাতা নাইট রাইডার্সের সঙ্গে মরণবাচন ম্যাচে মাঠের বাইরে জায়গা হয় রোহিত শর্মার। ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার হিসেবে ব্যাট করতে নামানো হয় রোহিতকে। সবমিলিয়ে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ থেকে মাঠ সর্বত্র খেলোয়াড়দের মনোবল তলানিতে পৌঁছে যায়।

খেলোয়াড় হিসেবেও হার্দিক পান্ডিয়া চরম ব্যর্থ হতে থাকেন। ১৫ কোটি টাকা দিয়ে গুজরাট টাইটান্স থেকে নিয়ে আসা হার্দিক পান্ডিয়ার আইপিএলে অবদান ছিল গড়পড়তার থেকেও খারাপ। প্রথম ৯ টি ম্যাচে ৪ টি উইকেট পান ওভারপ্রতি বারো রান দিয়ে। এই নটি ম্যাচে মুম্বাই দলের ভাগ্য কার্যত নির্ধারিত হয়ে যায়। দশম ও একাদশ ম্যাচ মিলিয়ে আরো চারটি উইকেট পেলেও ওভার পিছু রান দেওয়া কমেনি হার্দিক পান্ডিয়ার। ব্যাট হাতেও অবস্থা করুণ থেকেছে হার্দিক পান্ডিয়ার। ১১ টি ম্যাচ খেলে একটিও অর্ধশত রানের মুখ দেখেননি তিনি। ব্যাটিং গড় ১৯ এর সামান্য বেশি। দলের খারাপ অবস্থার মধ্যে লিডিং ফ্রম দ্যা ফ্রন্ট হতে পারতেন যিনি, সেই হার্দিক পান্ডিয়া রোহিত শর্মার বিকল্প হিসেবে মুম্বাই সমর্থকদের কাছে ছিলেন সারা মরশুম ধরেই অপ্রিয়।তাঁর শরীরী পরিভাষা এবং রোহিতকে সম্মান না করার প্রচারের জন্য মুম্বাইয়ের দর্শকের কাছে খলনায়ক হয়ে ওঠেন হার্দিক । ফিল্ডিংয়ের সময় বাউন্ডারি লাইনের কাছে গেলেই তাঁকে ছুঁড়ে দেওয়া হতে থাকে বিভিন্ন কটূক্তি। মুম্বাইয়ের ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গেলে বলতেই হবে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স দলের থিঙ্ক ট্যাঙ্কের গুটি কয়েক মানুষ ছাড়া এবং খুব সম্ভব হার্দিক পান্ডিয়া ছাড়া বিশেষ কেউ হার্দিকের নেতৃত্বাধীন মুম্বাই দলের সাফল্য আশা ও করেন নি, হয়তো চান ও নি।

এছাড়া বেশ কিছু ক্রিকেটিয় বিষয় মুম্বাইয়ের ব্যর্থতার কারণ। যেমন, ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব। তিলক ভার্মা ছাড়া ব্যাটিংয়ে কেউ ধারাবাহিকতা দেখান নি। পেসার হিসেবে যশপ্রীত বুমরা-র ওপরে অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকতে হয়েছে। বিদেশি পেসাররা উইকেট পেলেও প্রচুর রান দিয়েছেন। স্পিনাররা সফল হতে পারেন নি। পীযুষ চাওলা ছিলেন ২০২৩ সালের ছায়ামাত্র। সবচেয়ে বড় কথা, দরকারি মুহূর্তে ম্যাচ ফিনিশ করতে দেখা যায়নি মুম্বাই দলের কোনও ব্যাটারকে। মোক্ষম সময় আউট হয়ে তারা ফিরেছেন সাজঘরে। হার্দিক পান্ডিয়ার ব্যর্থতা এবং গ্রিনকে ছেড়ে দেওয়ার পরে বিকল্প অলরাউন্ডার না রাখা মুম্বাইয়ের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে অন্যতম। বাড়তি অলরাউন্ডার না রাখায় তাদের দলচয়নে ভারসাম্যের অভাব দেখা দেয়। একমাত্র অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়া দাগ কাটতে পারেন নি। সবমিলিয়ে, মুম্বাইয়ের ব্যর্থতার কারণ প্রধানত নিহিত ঘরের দর্শকের কাছে ‘খলনায়ক’ হয়ে ওঠা হার্দিক পান্ডিয়ার মধ্যে।।


More Stories
চেন্নাইয়ানকে হারিয়ে মোহনবাগানকে টপকে ইস্টবেঙ্গল তিন নম্বরে
কেকেআর-কে হারালেন, কে এই মুকুল চৌধুরী ?
গ্রেফতার অজি ক্রিকেট তারকা ওয়ার্ণার