চুমকি সূত্রধর, সময় কলকাতা, ২২ সেপ্টেম্বর: কেষ্ট মণ্ডল তখন তিহাড়ে। গত লোকসভা ভোট প্রচারে গিয়ে বারবার বীরভূমে প্রিয় কেষ্টকে স্মরণ করেছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেছিলেন, ভোট মিটে গেলেই কেষ্ট ছাড়া পেয়ে যাবেন! ঠিক সেটাই ঘটল! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাই মিলে গেল! সিবিআইয়ের করা গরু পাচার মামলায় গত ৩০ জুলাই শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়েছিলেন অনুব্রত মণ্ডল। তখনই তাঁর অনুগামীরা মনে করছিলেন, এ বার ইডি-র মামলাতেও জামিন পাবেন কেষ্ট। গত শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর সেই মামলায় জামিন পেলেন অনুব্রত।
আরও পড়ুন East Bengal: দ্বিতীয় ম্যাচে আজ মাঠে নামবে ইস্টবেঙ্গল, কেরালার বিরুদ্ধে অভিষেক হতে পারে আনোয়ারে
একসময় অনুব্রত মণ্ডলের নাম শুনলেই বীরভূমে বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খেত। বীরভূমে দলের সংগঠনটা বেশ পোক্ত হাতেই সামলেছেন কেষ্ট মণ্ডল। গোটা জেলা তাঁর হাতের মুঠোয় ছিল। দলকে বিধানসভা-লোকসভা-পঞ্চায়েত ভোট সহ সব নির্বাচনেই জয়ে এনে দিতেন অনুব্রত। জেলা ধরে রাখার ক্ষেত্রে তৃণমূল সুপ্রিমোর ভরসার জায়গা ছিল কেষ্ট। কিন্তু, গরু পাচার মামলায় গ্রেফতার হয়ে টানা ২৫ মাস তিহাড়ে বন্দি ছিলেন অনুব্রত মণ্ডল। স্বাভাবিকভাবেই অনুব্রত শ্রীঘরে যেতেই বীরভূমে শাসকদলের সংগঠন অভিভাবক হারিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে অনুব্রতর উপর আস্থাশীল তা তিনি বারবার বুঝিয়েছেন। অনুব্রত মণ্ডল গ্রেফতার হওয়ার পর গত দু’বছরে বীরভূমে কাউকে জেলা সভাপতি করা হয়নি। তার একটা কারণ হল, বিকল্প মুখের অভাব। দ্বিতীয় কারণ, অবশ্যই দলে গোষ্ঠী কোন্দল। অনুব্রত বাদ দিয়ে বাকি যাঁরা মুরুব্বি রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে আপাত বনিবনা থাকলেও রেষারেষির চোরাস্রোত প্রবল বলেও বারবার প্রকাশ পেয়েছে। অনুব্রতহীন জেলায় বিজেপি জব্বর কামড় দিতে চেয়েছিল। কিন্তু জেলায় লোকসভার দুটি আসনেই ডাহা হেরেছে। দল ধরে রাখতে পেরেছে জমি। অবশেষে গত শুক্রবার তিনি জামিন পেয়েছেন। তার পরই জেলার নেতারা বিক্ষিপ্ত ভাবে বলতে শুরু করেছেন, ‘খাঁচার বাঘ’ আসছেন। সিউড়ি, বোলপুর, নানুরের ইতি উতি অকাল বসন্ত। উৎসব উৎসব পরিবেশ। এক সময় ঘোর অনুব্রত-বিরোধী হিসেবে পরিচিত বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি ও জেলা তৃণমূলের কোর কমিটির সদস্য কাজল শেখ নিজেও বোলপুর শহরে পথচলতি মানুষের হাতে মিষ্টি তুলে দিয়েছেন। উচ্ছাস প্রকাশ করেছেন।

অনুব্রত মণ্ডল ‘খাঁচার বাঘ’, এই উপাধির পেটেন্ট ফিরহাদ হাকিমের। অনুব্রত মণ্ডল গ্রেফতার হওয়ার পর বীরভূমে তৃণমূলের জেলা সংগঠনের মনোবল চাঙ্গা রাখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ববি হাকিমকে পাঠিয়েছিলেন। তিনিই গিয়ে বলেছিলেন, অনুব্রত মণ্ডল হলেন খাঁচার বাঘ। সে এখন খাঁচায় তাই শিয়ালরা লাফালাফি করছে। বাঘ যেদিন বেরিয়ে আসবে শিয়ালরা সব খাঁচায় ঢুকে যাবে! অনুব্রতর জামিন মিলতেই সেই কথাই আরও একবার আওড়েছেন ফিরহাদ। এখন কৌতূহলের বিষয় হল, এবার অনুব্রত বীরভূমে ফেরার পর তাঁকে কি ফের দলের জেলা সভাপতি করা হবে ? ফের কি বীরভূমের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠবেন কিংবদন্তী ‘কেষ্ট দা’ ? অনুব্রতের অনুপস্থিতিতে জেলায় সংগঠন চালানো জেলা কোর কমিটির কী হবে? অনুব্রতকে ছাড়াই পরপর দু’টি নির্বাচন অর্থ্যাত্ ২০২৩-এর পঞ্চায়েত এবং ২০২৪-এর লোকসভায় বীরভূমে সাফল্যের সঙ্গে উতরেছে এই কোর কমিটি। তৃণমূলের প্রথম সারির নেতা থেকে জেলার অনেকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অনুব্রতকে দল কোনও শাস্তি দেয়নি। তাঁর বদলে কাউকে জেলা সভাপতিও করেনি। সংগঠন পরিচালনা করেছে কোর কমিটি। ফলে পদ এবং চেয়ার যে অনুব্রত ফিরে পাবেন, তা নিয়ে অধিকাংশ নেতার কোনও সংশয় নেই।

কিন্তু অনুব্রত স্বমহিমায় ফিরলে মমতা কি ফের তাঁর প্রিয় কেষ্টর হাতে সংগঠনের রাশ তুলে দেবেন? আরও বড় কথা হল, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কি তাতে রাজি হবেন? এক গত ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলের শুদ্ধিকরণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। স্বজনপোষণ, আত্মতুষ্টির কোনও জায়গা নেই। দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থার নেওয়ার কথা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। অনুব্রতর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এখনও প্রমানিত নয়। কিন্তু এটাও ঠিক, একদা মাছ ব্যবসায়ীর এত সম্পত্তি ও আয়ের উৎস নিয়ে সন্দেহের পরিবেশ রয়েছে। চাল কল, ডাল কল, জমি, জমা, প্রতিপত্তি, লটারি, সায়গল হোসেন – গোটা ব্যাপারটা প্রশ্নের উর্ধ্বেও নয়। সেই সঙ্গে রয়েছে গরু ও কয়লা সংক্রান্ত অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন। তা ছাড়া অনুব্রতর বিরুদ্ধে স্বজনপোষণের অভিযোগের তালিকাও লম্বা। এটাও ঠিক যে, গত ২৫ মাস অনুব্রত মণ্ডল যে তিহাড়ে ছিলেন, দলের রাজ্য স্তরের কোনও নেতাই খোঁজ নিতে যাননি। দিল্লিতে আন্দোলনের জন্য গেলেও কাজের ফাঁকে তিহাড়ে ঘুরে আসেননি কেউই। এসবের মাঝেই ঘটেছে আরেক কাণ্ড। সম্প্রতি আরজি কর কাণ্ডের প্রেক্ষিতে আবহ এখন এমনই যে সরকার ও সংগঠনে স্বচ্ছতার দাবি রয়েছে মানুষের। সেই পরিস্থিতিতে অনুব্রত পাশ করবেন কিনা সেই প্রশ্নও রয়েছে। আগামী ২০২৬ পর্যন্ত কোনও নির্বাচন নেই। ফলে জেলায় ফিরে কি কেষ্ট ফের স্বমহিমায় থাকবেন নাকি নাকি নখ-দন্তহীন ডোরাকাটার ইতিহাস লেখা হবে, সেটাই দেখার।
#AnubrataMondal #Latestbengalinews #Cowsmugglingcase


More Stories
তৃণমূলের শ্বাসকষ্টের আরেক শিকার অভিষেক ঘনিষ্ঠ শুভ্রকান্তির পদত্যাগ
অর্জুন সিংকে ‘চমকানো’ বনিকে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরালো পুলিশ
“দত্তপুকুরের শাহজাহান “গোপাল কাঞ্জিলালকে আদালতে তোলা হল