সময় কলকাতা ডেস্ক, ৩ অক্টোবরঃ আবারও সালিশি সভাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক। মালদহের রতুয়ায় এক যুগলকে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ উঠল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরেই তাঁদের মারধর করা হয় বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের মারধরের ভিডিও স্যোশাল মিডিয়ায় (ভিডিও-র সত্যতা যাচাই করেনি সময় কলকাতা) পোস্ট করেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।

সালিশি সভা বসিয়ে বিচারের নজির নতুন নয়। দীর্ঘ দিন ধরেই গ্রামবাংলায় নানা সমস্যার সমাধান হয়েছে নানা ধরনের সালিশি সভায়। কখনও পাড়ার মন্দিরের সামনে, কখনও পঞ্চায়েত দফতরে, কখনও বা পাড়ার ‘গণ্যমান্য’দের বাড়িতে। ক্লাবঘর, কাউন্সিলারের দফতরে বা থানায় ‘বড়বাবুর’ ঘরে সালিশি সভা বসার উদাহরণও রয়েছে। অনেক সময়েই সেখানে ‘সুবিচার’ হয়েছে বলে দাবি করা হয়। আবার সালিশি সভায় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও কম নয়। তবে সালিশি সভা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠার সাম্প্রতিক উদাহরণও রয়েছে।
বেশ কিছুদিন আগেই সালিশি সভায় এক যুবক-যুবতীকে বেধরক পেটানোর ঘটনায় শিরোনামে উঠে এসেছিল। ঘটনাস্থল ছিল উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ায়। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সুবিচার করেছিলেন খোদ তৃণমূল নেতা তাজমুল ওরফে জেসিবির বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে যদিও আইন নিজের হাতে তুলে গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি। তবে সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের সালিশি সভায় বিচার করার ঘটনা সামনে উঠে এল। এবার ঘটনাস্থল মালদহের রতুয়া দুই ব্লকের সম্বলপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা। অভিযোগ সালিশি সভায় ডেকে নিয়ে এক মহিলা ও এক পুরুষের উপর নৃশংস অত্যাচার করে গ্রামের মাতব্বররা। এই ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় তৃণমূল নেতারা জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভাইরাল ভিডিও-তে দেখা যায় মহিলাকে বেদম বাঁশ পেটা করা হচ্ছে। ব্যথায় কাতরালেও কোনও রেয়াত করা হয়নি। যদিও ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি সময় কলকাতা। সেই ভিডিও স্যোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি লিখেছেন, “চোপড়া, আরিয়াদহ, কোচবিহার, তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। এটাই পশ্চিমবঙ্গের ছবি হয়ে উঠেছে। এক মহিলার হাত পিছনে বেঁধে দিয়ে মারধর করেন তৃণমূল কংগ্রেস নেতা মহম্মদ আনারুল হক। কেন তৃণমূল নেতারা মনে করেন, যে মহিলাদের মারধর করার বিশেষাধিকার রয়েছে তাঁদের?” পোস্টে ট্যাগ করে জাতীয় মহিলা কমিশন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বিরোধী দলনেতা।
এই ঘটনা নিয়ে তৃণমূলকে নিশানা করেছেন বিজেপি নেতা অমিত মালব্য। তিনি বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনে পশ্চিমবঙ্গের কোনও মহিলা সুরক্ষিত নয়। শরিয়া আইন চলছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরতেই হবে। তিনি এক অপ্রতিরোধ্য দুর্যোগ।” অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা মহম্মদ আনারুল হকের মা বলছেন, কে হাত বেঁধেছে, কে মেরেছে, তা জানেননা। যদিও, এসবের মাঝেই জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব বলছেন, এটা সম্পূর্ণ পারিবারিক ব্যাপার, তৃণমূল কংগ্রেস নেতা মহম্মদ আনারুল হক দলের কেউ নয়।
আরও পড়ুনঃ Governor CV Anand Bose: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের বিক্ষোভের মুখে রাজ্যপাল বোস
সমাজমাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল হতেই উঠেছে নিন্দার ঝড়। স্বাভাবিকভাবেই সব সালিশি সভাতেই এভাবে নিদান যখন দেওয়া হয়, তখন স্থানীয় প্রশাসনের কাউকেই সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রশাসনের ভূমিকা নজরে আসে ঠিক ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পরেই যখন তা সবার নজরে আসে তখনই। উত্তর দিনাজপুরের ঘটনাটির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল, মালদহের রতুয়ার ঘটনাটিতেও ঠিক তাই হয়েছে। তবে শুধু উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া ইসলামপুর কিংবা মালদহের রতুয়াই নয়, সমাজের এই অসুখ বহুদিনেরই। কয়েকদিন আগেই শিলিগুড়ির লাগোয়া ফুলবাড়িতেও পাড়ার মাতব্বরেরা মহিলাকে মারধর করেছিলেন। সেই অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মঘাতী হয়েছিলেন ওই মহিলা। অতীতে ফরাক্কার তোফাপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামে ছেলের বিয়ের কথা গ্রামবাসীকে না জানানোর ‘অপরাধে’ বসেছিল সালিশি সভা। সেখানে বিবাদ থেকে খুন হয়ে যায়। ২০২২ সালে পশ্চিম মেদিনীপুরের চাকিরহাটে দোকানে আগুন লাগানোর ঘটনায় গণৎকারের মাধ্যমে অভিযুক্তকে ‘দোষী সাব্যস্ত’ করে সালিশি সভা। এর পরে ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকা জরিমানার নিদান দেওয়া হয় ‘দোষী’র পরিবারকে। শুধু তা-ই নয়, ওই পরিবারের জমির দলিলও মাতব্বরেরা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ। প্রশ্ন একটাই, সমাজে পুলিশ-প্রশাসন থাকতে কেন বারবার আইনের দ্বারস্থ না হয়ে মানুষ সালিশি সভা বসায়। কেন প্রশাসনকে পাত্তা না দিয়ে আইন মানুষ নিজের হাতে তুলে নেয়। কথায় আছে, শিক্ষা ছাড়া ক্ষমতা ক্ষমা শেখায় না। যারা এটা করছে, তাদের কাছে ক্ষমা মানে দুর্বলতা আর কাপুরুষতা।


More Stories
মোথাবাড়ি কাণ্ডের অশান্তির নেপথ্য “খলনায়ক” মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার কিসের ইঙ্গিত?
বকেয়া ডিএ-র সুখবর : কবে টাকা পাবেন সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীরা?
এবারের ভোট বাংলার আত্মাকে রক্ষা করার লড়াই, ব্রিগেডে বললেন প্রধানমন্ত্রী