Home » বাংলাদেশ কি স্মরণ করল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ?

বাংলাদেশ কি স্মরণ করল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ?

সময় কলকাতা ডেস্ক, চুমকি সূত্রধর, ১৬ ডিসেম্বর: নেই কোনও কুচকাওয়াজ।  ফিরল না প্রতিবছরের সেই চেনা ছবি। তবুও সোমবার বাংলাদেশ পালন করলে বিজয় দিবস। প্রশ্ন হল, বাংলাদেশ কি স্মরণ করল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ? বাংলাদেশ কি স্মরণ করল ভারতের অবদান ? 

সোমবার মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৫৪তম বর্ষ পালন করল বাংলাদেশ। কিন্তু যাঁর হাত ধরে বিজয় দিবস এসেছিল বাংলাদেশে, সেই মুজিব-উর-রহমানের নাম একবারও উল্লেখ করেননি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা! ভারতের হাত ধরেই স্বাধীনতা এসেছিল। কিন্তু বিজয় দিবসে ভারতের জন্য একটাও শব্দ খরচ করেননি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস। প্রায় ৩০ মিনিটের ভাষণের অধিকাংশ সময়টাই ‘পৃথিবীর ঘৃণ্যতম স্বৈরাচারী শাসক’ শেখ হাসিনাকে আক্রমণ শানিয়েছেন। আর নিজের সরকারের ঢাক পিটিয়েছেন। বিজয় দিবসের আগে শুক্রবার রাত থেকে দেশের নানা প্রান্তে সভা-সমাবেশ করল আওয়ামী লিগ। ঢাকা-সহ দেশের বড় শহরগুলিতে একাধিক সভা করে শেখ হাসিনার দল। এই সভা চলাকালীনই কোথাও কোথাও পুলিশ ও সেনা পৌঁছে বাধা দেয়। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে কয়েকদিন আগেও আওয়ামী লিগের সভা-সমাবেশে হামলা করে পথচলতি মানুষ। অথচ, শুক্রবারের বিভিন্ন সভা- সমাবেশে ভিড় করেন তাঁদের অনেকেই। কীভাবে আওয়ামী লিগ সভা এভাবে সভা করতে পারল তা নিয়ে সরকারের অন্দরে প্রশ্ন উঠেছে। গোয়েন্দা ব্যর্থতার দিকেও আঙুল তুলেছেন অনেকেই উপদেষ্টাই। একমাত্র করোনার বছরগুলি বাদে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ কখনও বন্ধ থাকেনি বাংলাদেশে। দিনটি ভারতীয় সেনা বাহিনীও বিজয় দিবস হিসাবে পালন করে। তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সোমবার বাংলাদেশ ও ভারত যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয়ের ৫৪ তম বার্ষিকী পালন করল, তখন রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ দু’দেশের সম্পর্ক সবচেয়ে শীতল। হয়তো আগে এই পরিস্থিতি কখনও তৈরি হয়নি।

এবার প্রশ্ন হল, সোমবার বিজয় দিবসে ইউনুস ও তাঁর সরকারি-বেসরকারি সহযোগীরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করল কী ? গোটা ভাষণে যাঁর হাত ধরে বিজয় দিবস এসেছিল বাংলাদেশে, সেই মুজিব-উর-রহমানের নাম একবারও উল্লেখ করেননি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা! পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ে ওঠার সময় পাক সেনার বিরুদ্ধে শুধু ভারতের জওয়ানেরাই লড়াই করেছে, জীবন দিয়েছে, তাই নয়, সমগ্র ভারতবাসীর অবদান রয়েছে এই মুক্তিযুদ্ধে। যে এক কোটি শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসেন, তারা শুধু সরকারি সাহায্য পেয়েছিলেন তা নয়, সাধারণ মানুষও সেসময় তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ৭১-এর শরণার্থীর বোঝা এপারের মানুষ বহন করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এটাও এক অনন্য প্রাপ্তি। কিন্তু এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তা স্মরণ করল কী ? নিয়ম রক্ষার খাতিয়ে যা যা করণীয়, শুধুমাত্র তাই তাই করল বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশের সেনা বাহিনী বিগত ৫৪ বছরে একটিই যুদ্ধ করেছে। জন্মকালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেই একমাত্র যুদ্ধের সাফল্যই তাদের সম্বল। তবে শুধু সেনাই নন, সেনার সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে ছিল পুলিশ, আনসার সহ একাধিক বাহিনী। এই পরিস্থিতিতে সেই দিনটিকে বাংলাদেশ ঠিক কতটা সম্মান জানানো তা নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন থেকেই গেল। অন্তর্বর্তী সরকার বলে, সেনা বাহিনী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত তাই, বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ এবার বন্ধ ছিল। সরকারি ব্যাখ্যা সকলের ঠিক কতটা হজম হল, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে গেল। কারণ, কুচকাওয়াজের জন্য হাজার হাজার সেনার দরকার পড়ে না। কিন্তু যেন এই তাল কাটল, সে প্রশ্ন তো উঠেই। উত্তর হল, মহম্মদ ইউনুস এবং তাঁর সরকারের প্রশাসনিক ও বৌদ্ধিক উপদেষ্টারা আসলে বাংলাদেশের জন্মকেই অস্বীকার করতে চাইছেন। স্বভাবতই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিরুদ্ধেই তাঁরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন তা কার্যত স্পষ্ট সেদেশের সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপে। এই ইতিহাস মোছার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক পদক্ষেপ তুলে ধরা যেতে পারে। একটি বড় উদাহরণ হল, সেদেশের সংবিধান সংশোধনের অপেক্ষায় না থেকে ইউনুস সরকার তড়িঘড়ি ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি বাদ দিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়। এমনকী, মহম্মদ ইউনুস সরকারের দাবি মেনেই বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, ‘জয় বাংলা’ আর বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান নয়। পাশাপাশি, ৭ মার্চ ঢাকার সমাবেশে স্বাধীনতা ও মুক্তির ডাক দিয়ে শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার দিন-এর রাষ্ট্রীয় ছুটি বাতিলের সিদ্ধান্তের থেকেও অবাক করেছে দিবস উদযাপনের সরকারি তালিকা থেকে দিনগুলিকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত।

গত শনিবার শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবসে ইউনুস সরকারের উদ্যোগ-আয়োজন দেখে গোড়ায় মনে হয়েছিল সুমতি ফিরেছে। বেলা বাড়তে দেখা গেল, শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি স্তম্ভের ফলকটি কালো পর্দায় ঢেকে দেওয়া হয়, যাতে ৫২ বছর আগে সেটির উদ্বোধক শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি দেশবাসীর চোখে না পড়ে। এমনকী, প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসের জুতো পরে শহিদ বেদিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের মতো বিষয়গুলোও কারোর নজর এড়ায়নি। এই উদাহরণ গুলি কি যথেষ্ট নয় ? গত ৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান কন্যা তথা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের আনন্দ উদযাপনে যারা শেখ মুজিবুরের ধানমণ্ডির বাড়ি ভাঙচুর করে, আগুন ধরিয়ে দেয়, তাদের সঙ্গে ইউনুস সরকারের ভাবনাচিন্তার যে কোনও ফারাক নেই, গত চার মাসে তা ইউনুস ও তাঁর উপদেষ্টার কথা ও কাজে বোঝা গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এই সরকার যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্মরণ করতে এই দায়সারা পন্থা অবলম্বন করবে, উদাসীনতা দেখাবে, এটাই হয়তো স্বাভাবিক ছিল আজকের দিনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু কারণ কী? আসল কারণটি হল, যে পাকিস্তানের থেকে রক্তের লড়াই করে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই দেশের সঙ্গে সদ্য পিরিত হওয়ায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়কে ইউনুস সরকার বড় করে তুলে ধরতে চাইছে না। ইউনুস সরকার যাদের সঙ্গে ঘর করছে সেই জামায়াতে ইসলামি এবং বিএনপি-র কোর রাজনীতির অংশ হল ভারত বিরোধিতা। ভারত বিরোধী অবস্থানকে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রাপ্তিগুলির বিরোধিতার সঙ্গে জুড়ে নিয়েছে। আর ঠিক এই সময়ই তাদের পাকিস্তান প্রেমও লুকোনো যায়নি। যে পাকিস্তানের থেকে রক্ত দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা অর্জন করতে সাহায্য করেছিল ভারত। এর থেকেই প্রমাণ মিলল, ইতিহাসের স্মৃতিগুলো শুধু গায়ের জোরেই মুছে ফেলা সম্ভব নয়, কখনও কখনও সম্ভব উপদেষ্টা, আমলাদের হাতের কলমের খোঁচাতেই। কিন্তু, এভাবে কী মুছে ফেলা যায়? প্রশ্নটা থেকেই যায়।

About Post Author