পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা, ১৭ নভেম্বর : বিহারের ভোট কাটতে না কাটতেই, আরও বিশদে বলা ভালো বিহার ভোটের ফলাফল সামনে আসতে না আসতেই বঙ্গ বিজেপি বঙ্গের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আরও একবার সরব। বঙ্গ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব আইনশৃঙ্খলার পাঠ নেওয়ার প্রশ্নে বলছেন, বিহার থেকে বঙ্গ কে শিখতে হবে। সত্যি কি পশ্চিমবঙ্গে আইনশৃঙ্খলার অবস্থা বিহারের চেয়ে সবদিক থেকে এতটাই খারাপ যে বিহারের কাছে আইনশৃঙ্খলার পাঠ নিতে হবে বাংলাকে? কেন রাজ্যকে বিহার মডেল অনুসরণ করতে বলছেন বঙ্গ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব?
বিহারে বিজেপি জোট এনডিএর জয় জয়কারের পরে বঙ্গ বিজেপি যেন আলাদা ভাবে অক্সিজেন পেয়েছে। এতদিন এস আই আর ও প্রকৃত ভোটার চয়নের তত্ত্বে বঙ্গ বিজয়ের স্বপ্ন দেখা বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্বের মুখে আরও বেশ কিছু তত্ত্ব। বিহারে জয়লাভের পরে উত্তর বঙ্গে সম্প্রতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে পড়েছে। তিনি বলেছেন, রক্তপাত নেই, বুধ দখল নেই, অশান্তি নেই বিহারের হাইভোল্টেজ নির্বাচনে। সেখানেই থেমে না থেকে তিনি বলছেন বঙ্গ কে কোথায় নিয়ে গেছি আমরা সেটা ভাবতে হবে। বিহারের কাছে শিখতে হবে বাংলা কে বলছেন শমীক ভট্টাচার্য। তৃণমূল চলে যাচ্ছে চলে যাবে জানিয়ে শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেছেন বিহার মডেল অনুসরণযোগ্য। সত্যি কি বিহার কে অনুসরণ করে বঙ্গে উন্নয়ন ও উন্নতি আনার ভাবনা করতে হবে? নাকি বিহারে যেভাবে ভোট হয়েছে সেইভাবে ভোট করে বা করিয়ে বঙ্গে বিজেপিকে আনার জন্যই শমীক ভট্টাচার্য বিহার মডেলের কথা বলেছেন।
প্রশ্ন উঠতেই পারে বিহারে এমনকি রূপকথার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছে? প্রথম প্রশ্ন বিহারে সাম্প্রতিক সময় গৃহীত তাৎপর্য মূলক কিছু নীতি নিয়ে। বিহারে আইনশৃঙ্খলায় কী কী দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন এসেছে? এক নজর সেই পরিবর্তনে।
বিহারের সাম্প্রতিক সময়ে গৃহীত আইনশৃঙ্খলা কেন্দ্রিক নীতির মধ্যে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যেমন ২০১৫-১৬ সাল থেকে কার্যকর হওয়া সুরা পান নিষিদ্ধকরণ নীতি যা রাজ্যের আবগারি আইন (Excise Act) অনুযায়ী কার্যকর করা হয়েছে। এই নীতি অনুযায়ী, মদের বিক্রি, কেনা, বিতরণ, উৎপাদন এবং সংরক্ষণের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়াও, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করার জন্য সরকার নতুন নীতি এবং আধুনিকীকরণের দিকেও মনোযোগ দিচ্ছে, যেমন নতুন শ্রম আইন।
সুরা পান নিষিদ্ধকরণ: ২০১৫-১৬ সালে সুরা পান নিষিদ্ধকরণ নীতি চালু করার পর থেকে মদের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে।
শ্রম আইন আধুনিকীকরণ: বিহার সরকার শপস অ্যান্ড এস্টাবলিশমেন্টস এমপ্লয়মেন্ট রেগুলেশন অ্যাক্ট, ২০২৫ চালু করেছে, যা কেন্দ্রীয় শ্রম কোডগুলির সাথে সামঞ্জস্য রেখে পুরনো ১৯৫৩ সালের আইন প্রতিস্থাপন করেছে। এর ফলে সরকারি নিয়মাবলি, বেতন প্রদান, নথি সংরক্ষণ এবং কর্মচারী কল্যাণ সম্পর্কিত প্রক্রিয়াগুলো আধুনিক করা হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন সত্যি কি বিহার আইনশৃঙ্খলা এবং সার্বিক বিচারে বিহার কি ভারতে মডেল রাজ্য হিসেবে গৃহীত হওয়ার পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছে?
শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, বিহার নির্বাচনের সময় রক্তপাতহীন। ভোট লুঠ নেই। কিন্তু কয়েকদিনের ভোট ই কী রাজ্যের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে? বিহারের আইনশৃঙ্খলা কি পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে এতটাই ভালো যে বঙ্গ রাজ্য হিসেবে অনুসরণ করবে বিহারকে?
চোখ রাখা যাক ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) রিপোর্টে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিহারে পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় সামগ্রিকভাবে অপরাধের হার বেশি। তবে, অপরাধের ধরন অনুসারে এই হার ভিন্ন হতে পারে।
বিহারে অপরাধ ২০২৩ সালের প্রতি লাখ মানুষ অনুযায়ী বঙ্গের চেয়ে কম হলেও ২০২৫ সালের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিহারে অপরাধের হার ঊর্ধ্বমুখী।পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান অপরাধপ্রবণ রাজ্যগুলির মধ্যে বিহার অন্যতম।অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে পাটনা এবং অন্যান্য জেলাগুলিতে অস্ত্র আইনের অধীনে বহু মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে,পশ্চিমবঙ্গে অপরাধ বিহারকে টক্কর দেওয়ার মত হলেও এনসিআরবি রিপোর্ট অনুসারে, কলকাতা দেশের সবচেয়ে নিরাপদ শহরগুলির মধ্যে অন্যতম।তবে, সামগ্রিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে অপরাধের সংখ্যা বেশি, যেমন স্বামী কর্তৃক নিষ্ঠুরতা সংক্রান্ত অপরাধের মতো বিষয়গুলিতে মহিলাদের অভিযোগের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।কিন্তু খুন বা পণপ্রথা সংক্রান্ত হত্যা ও অপরাধের ক্ষেত্রে বিহারে অপরাধের সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেকটাই বেশি। সাম্প্রতিক ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) রিপোর্টে তেমনটাই উল্লেখ। খুনের সংখ্যায় সুনির্দিষ্ট ভাবেই ২০২২ সালের রিপোর্টেও বিহার এগিয়ে।
খুনের অপরাধে রাজ্যভিত্তিক একটি রিপোর্টও প্রকাশ করেছে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো। । ২০২২ সালে দেশের রাজ্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে যোগী রাজ্যে। সর্বাধিক ৩ হাজার ৪৯১ জন খুন হয়। এরপরেই রয়েছে বিহার। সেখানে ২ হাজার ৯৩০ টি খুনের ঘটনা ঘটে। পশ্চিমবঙ্গও পিছিয়ে নেই। ২০২২ হিসেবে সেখানেও ১৬৯৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালে উভয় রাজ্যই মোট খুনের ঘটনায় দেশের মধ্যে সামনের সারিতে রয়েছে।এনসিআরবি-এর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে ভারতে খুনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে উত্তরপ্রদেশে। এরপরই রয়েছে বিহার, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলি।দেশে খুনের সিংহভাগ এই পাঁচটি রাজ্যেই ঘটে বলে সমীক্ষায় প্রকাশ।
তবে খুনের ঘটনায় পিছনের সারিতে থাকা রাজ্য তামিলনাড়ু, কেরালা সার্বিক অপরাধে এগিয়ে রয়েছে।সার্বিক অপরাধে বঙ্গ ও বিহার প্রায় গায়ে গায়ে। প্রতি এক লক্ষ মানুষ অনুযায়ী অপরাধের তথ্যকে একপাশে রেখে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভারতে অপরাধের সংখ্যা উত্তর প্রদেশে সবচেয়ে বেশি। তবে, বিভিন্ন ধরনের অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট রাজ্যগুলির মধ্যে ভিন্নতা দেখা যায়।উদাহরণস্বরূপ, মানব ও শিশু পাচারের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ শীর্ষে রয়েছে এবং ঘরোয়া হিংসা বা পারিবারিক হিংসার শিকারও এখানে বেশি। পূর্ব ও উত্তর পূর্ব ভারতের অঞ্চলে হিংসা ও অপরাধের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি, যার মধ্যে বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মণিপুর, ত্রিপুরা, দিল্লি, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশ অন্তর্ভুক্ত।তবে পূর্ব ভারতের নাগাল্যান্ড অপরাধের নিরিখে শান্তিপ্ৰিয় এবং সবচেয়ে কম অপরাধ প্রবণ রাজ্য। সবমিলিয়ে সারা দেশের মধ্যে বিহার সার্বিক অপরাধে বঙ্গকে পেছনে ফেলছে বিভিন্ন দিক থেকে। বিহারের আইন শৃঙ্খলাকে মহান বলার কোনও তথ্য, উপাদান ও তত্ত্ব নেই।
এবার আসা যাক, রাজনৈতিক পরিসরে। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যারা জড়িয়ে রয়েছেন তাঁরা কতটা বিশুদ্ধ ভাবমূর্তির? ২০ নভেম্বর নীতিশ কুমার দশম বার শপথ নেবেন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। প্রশান্ত কিশোর অভিযোগ করেছেন, বিহারে গত মন্ত্রীসভার অন্যতম সদস্য এবং মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের ডেপুটি সম্রাট চৌধুরী তারাপুর হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত। ৭ জনের খুনের অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।কিন্তু তিনি দোষী সাব্যস্ত নন। বিহারের অনেক রাজনৈতিক নেতা দোষী সাব্যস্ত। বাহুবলি নেতা পাপ্পু যাদব আবার বাম নেতা খুনে অভিযুক্ত শুধু নন আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। বিহারে একাধিক বাহুবলি নেতা খুন ও ধর্ষণে এবং অন্য অপরাধে বারবার অভিযুক্ত হয়েছেন। বঙ্গে নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে দুর্নীতির। তাঁদের অধিকাংশ বিরুদ্ধে একের পর এক আনা অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে শুনানি চলেছে। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় তারা জেলেও থেকেছেন।কিন্তু দাগি আসামির ছাপ্পা কারো গায়ে পড়েনি। পাপ্পু যাদব অপরাধী প্রমাণিত হয়ে এবং একদা আরজেডির নেতা পাপ্পু এখনও বিহারে অন্যতম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সম্প্রতি প্রাক্তন বাম এমএলএ মনোজ মঞ্জিল, আলিনগরের প্রাক্তন বিজেপি এমএলএ মিশ্রিলাল যাদব, আরজেডির অনিল কুমার সাহানি,অনন্ত সিং এঁদের অপরাধ প্রমাণিত। লালু প্রসাদ যাদব একাধিক মামলায় দোষু সাব্যস্ত হয়েছেন। তাঁর কথা বাদ দিলেও অপরাধী প্রমাণ হওয়া, একাধিক মুখ রয়েছে বিহারের রাজনীতিতে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময় দেখা যাবে, রানীগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক সোহরাব আলি ছাড়া কেউই অপরাধী প্রমাণিত হননি। যদিও অনেক তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধেই একের পর এক আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তাঁরা জেলে থাকলেও অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি। অন্যদিকে বিহারে পাপ্পু যাদব বা বিজেপির জীবেশ মিশ্র, জিতেন্দ্র স্বামীরা আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। বিজেপির মিছিলাল যাদবের বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগ প্রমাণিত আদালতের শুনানিতে।
স্বাভাবিকভাবেই, আইনশৃঙ্খলার পাঠ কেন্দ্রিক আলোচনার শেষে প্রশ্ন করাই যায় খুন, ধর্ষণ, ডাকাতিতে যে রাজ্যের নেতা, বিধায়ক ও সাংসদরা দোষী প্রমাণিত হয়েছেন সেই বিহার কোনও ভাবেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মডেল রাজ্য হতে পারে কি? যে রাজ্যের বিধায়করা অন্য দলের নেতাকে খুনের অভিযোগে দোষী প্রমাণিত হন সেই রাজ্য রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আদর্শ হয়ে উঠতে পারে কি? বঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারে কিনা অন্য প্রশ্ন তথাপি শিক্ষার ইনডেক্স ও মাথাপিছু জিএসডিপিতে বঙ্গের তুলনায় পিছিয়ে থাকা বিহার কী করে সার্বিক ভাবে বঙ্গের আদর্শ হতে পারে তা হয়তো বিজেপির নেতৃত্ব যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারবেন না।


More Stories
রাজ্যসভায় নীতিশ, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী কে এবার?
কেন পদত্যাগ করলেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস?
প্রকাশ্যে মাছ-মাংস বিক্রি বন্ধ!