পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা , ১০ মার্চ : ঘোষণা ছিল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। অবশেষে ঘোষিত হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বা সুপ্রিম লিডারের নাম। ভোটের মাধ্যমে ইরানের পরবর্তী সুপ্রিম লিডার হিসেবে মোজতাবা খামেনি-কেই বেছে নিয়েছে ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’। আয়াতুল্লাহ খামেনেই-র সম্পর্কে চর্চা ছিল তিনি পর্দার আড়ালে থাকা ইরানের অন্যতম শক্তিশালী নেতা। একে কট্টরপন্থী হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে তাঁকে নিয়ে বিতর্ক ছিলই , যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রথম দিকে খামেনেইয়ের উত্তরসুরীর নাম গোপনেই রাখতে চেয়েছিল তেহরান। ইতিমধ্যেই ইজ়রায়েলের তরফে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, যিনিই ইরানের সুপ্রিম লিডার হতে চাইবেন, তাঁকেই নিশানা করবে তারা। একই সুর ট্রাম্পের গলাতেও। মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বেশিদিন টিকতে পারবেন না ইরানের নতুন নেতা মোজতাবা খামেনি । শীর্ষ পদে অসীম হওয়ার আগেই কেন তাঁকে নিয়ে এত বিতর্ক? মোজতাবা খামেনেই কেন বিতর্কিত এত বেশিমাত্রায়?
মাহ্শা আমিনিকে মনে আছে? মনে আছে কি হিজাব পরার বিষয়ে আমিনীর গ্রেফতার ও তার মৃত্যু ঘিরে নারী, জীবন, স্বাধীনতা ( Jin, Jiyan, Azadî) সংগ্রাম? যে সংগ্রাম ইরানে শুরু হলেও মূলত একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক স্লোগান, যা নারীর অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে। এই আন্দোলনকে কড়া হাতে রুখতে ইরানে দমন-পীড়ন নীতি চালানো হয়েছিল যার নেপথ্যে মূলত ছিলেন আয়াতুল্লাহ খামেনির দ্বিতীয় পুত্র। অন্তত অভিযোগ সেরকমই ছিল। তিনি এবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। তার নির্বাচনকে ঘিরে প্রধান বিতর্ক কোথায়?
উল্লেখযোগ্য ভাবে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম মূল আদর্শ ছিল রাজতন্ত্র (বংশানুক্রমিক শাসন) নির্মূল করা। মোজতবা খামেনি তাঁর পিতা আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়ায় সমালোচকরা একে রাজতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন, যা বিপ্লবের আদর্শের পরিপন্থী। এখানেই তার নির্বাচনকে ঘিরে প্রধান বিতর্ক দেশে -বিদেশে।
তিনি কট্টরপন্থী ও ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ইরানের অন্যতম সর্বোচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন এবং প্রভাবশালী। ইরাক ইরান যুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। বলাবাহুল্য, আশির দশকে চলা এই যুদ্ধ চলাকালীন তার বয়স খুবই কম। ১৯৮৬ সালে স্বেচ্ছায় এই যুদ্ধের গিয়েছিলেন তিনি। তারপরে তার ক্ষমতা শুধুই বেড়েছে। ২০০৫ এবং ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টরপন্থী মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে জেতাতে তিনি কলকাঠি নেড়েছেন বলে অভিযোগ আছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের গণবিক্ষোভের (গ্রিন মুভমেন্ট) সময় বিক্ষোভকারীদের অন্যতম লক্ষ্য ছিলেন তিনি।
ইরানের সামরিক শক্তিতে তার নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্য। ইরানের প্রভাবশালী আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এবং বাসিজ মিলিশিয়ার ওপর তাঁর গভীর প্রভাব রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ২০২২ সালে মাহসা আমিনি হত্যার প্রতিবাদে চলা আন্দোলন ছাড়াও একাধিক বিক্ষোভ দমনে তাঁর ভূমিকা সমালোচিত।
শুধু বংশতন্ত্র বা কট্টরপন্থা নয় ধর্মীয় দিক থেকেও তিনি প্রশ্নের মুখে। সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য ‘আয়াতুল্লাহ’ পদের যোগ্য ধর্মীয় জ্ঞান প্রয়োজন হলেও মোজতবার বর্তমান পদমর্যাদা ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’, যা এক ধাপ নিচে। সমালোচকদের মতে, তিনি প্রয়োজনীয় ধর্মীয় যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই পদে এসেছেন যা ধর্মীয় গুরু হওয়ার পক্ষে বেমানান।
যুদ্ধ নয় হালে হচ্ছে – মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আগেও ছিল।২০১৯ সালে আমেরিকা তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অভিযোগ ছিল যে, তিনি কোনো সরকারি পদে নির্বাচিত বা নিযুক্ত না হয়েও তাঁর পিতার হয়ে অস্থিতিশীল আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং দমনমূলক অভ্যন্তরীণ লক্ষ্য এগিয়ে নিতে কাজ করছেন। ৮ ফেব্রুয়ারি আয়াতুল্লাহ খামেনির নিহত হওয়ার ১০ দিন পরে এখন বিতর্ক শুধুই দানা বাঁধছে। তবুও মোজতাবা খামেনেই কেন বিতর্কিত হয়ে উঠেছেন তারচেয়েও বেশি নজরে থাকছে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া ইরানের শীর্ষনেতার পদক্ষেপ।


More Stories
জার্সিতে যৌন অপরাধে প্রাক্তন শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
বিপত্তারিণী রক্ষাকবচ, অবশেষে হরমুজ প্রণালী ভারতের জন্য খুলে গেল, রান্নার গ্যাস আসছে
মনসুরেহ খোজাস্তেহ বাঘেরজাদেহ : মার্কিন -ইজরায়েল হানায় খামেনির আহত স্ত্রীর মৃত্যু