পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৫ জুলাই : সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল….. ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান ম্যাচ বঙ্গে ডার্বি নামেই পরিচিত আর শতাব্দীপ্রাচীন কলকাতা ফুটবল লিগের ডার্বি ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব এবার কি পাবে বারাসাত? কী অবস্থা বারাসাত স্টেডিয়ামের?
আজ পর্যন্ত যা হয়নি তাই কি হবে? বারাসাত ফুটবল মাঠ নতুন ইতিহাস কি গড়বে? রাজ্যে ক্ষমতা বদলের নতুন ইতিহাস গড়ে ওঠার পরে বারাসাত বিদ্যাসাগর ক্রীড়াঙ্গন ফুটবল মাঠে কি নতুন ইতিহাস গড়বে? গড়ের মাঠে বা সল্টলেকের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের ডার্বি ম্যাচ বারবার অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু মহানগরী লাগোয়া বারাসাতের বিদ্যাসাগর ক্রীড়াঙ্গনে আজ পর্যন্ত মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের ফুটবল ম্যাচ আয়োজিত হয়নি। যদি ইতিহাসের দিকে ঘুরে তাকানো যায় তাহলে বলা দরকার ১৮৯৮ সালে শুরু হয়েছিল কলকাতা ফুটবল লিগ। ৫০ মিনিট থেকে ৭০ মিনিট, ৭০ মিনিট থেকে ৯০ মিনিট এবং খালি পা থেকে বুট জুতো- সময়ের সাথে সাথে বদলেছে কলকাতা ফুটবল লীগের ঘরানা। ১৮৯৮ সালে প্রথম কলকাতা ফুটবল লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল গ্লস্টারসায়ার রেজিমেন্ট। ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মোহনবাগান প্রথমবার ১৯১৫ সালের কলকাতা ফুটবল লিগে অংশ নেয়। ১৯২০ সালে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়, শুরু হয়ে যায় ময়দানের চিরাচরিত ঘটি বাঙাল যুদ্ধ। ১৯২৫ সালে প্রথমবার কলকাতা ফুটবল লিগে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল মুখোমুখি হয় যে খেলায় ইস্টবেঙ্গল নেপাল চক্রবর্তীর দেওয়া একমাত্র গোলে মোহনবাগান কে হারিয়ে দেয়। লিগ বা শিল্ডে অর্থাৎ কলকাতার মাটিতে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান ম্যাচের উন্মাদনা অন্য মাত্রা পেতে থাকে বিংশ শতকের গোড়া থেকে। তবে একুশ শতকের গোড়ার দিক থেকে কলকাতা লিগের ঐতিহ্য ধরে রাখলেও জৌলুস হারাতে শুরু করে। গত এক দশক ধরে দেখা গিয়েছে কলকাতা ফুটবল লিগ দর্শক হারিয়েছে, আগের মত দর্শকরা মাঠমুখী হন না। তবে কলকাতা সংলগ্ন উত্তর ২৪ পরগণা ও নদিয়ায় ফুটবল ঘিরে উন্মাদনা বিন্দুমাত্র কমেনি। বঙ্গের ফুটবল নিয়ামক সংস্থা আইএফএ বড় দলগুলির খেলা জেলার কল্যাণী এবং বারাসাতে অনুষ্ঠিত করতে থাকে বিগত দশকে। এরই মাঝে ২০১৭ সালে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে শুরু হয় যুব বিশ্ব কাপ ফুটবলের আসর। কৃত্রিম ঘাস বা অ্যাস্ট্রো টার্ফ তুলে ফেলে বিদেশ থেকে সবুজ ঘাস এনে বসানো হয় যুবভারতীতে। সেই সময় সল্টলেকে মাঠ সংস্কারের কাজ চলার জন্য বারাসাতের বিদ্যাসাগর ক্রীড়াঙ্গন বড় ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পেতে থাকে। আই লীগের বহু ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে বারাসাত স্টেডিয়ামে। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহামেডান এবং সারা ভারতের সেরা দলগুলি আই লিগের খেতাব জয়ের জন্য বারাসাত মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নামত। শুধু মোহনবাগান বনাম ইস্টবেঙ্গল সিনিয়র দলের ম্যাচই হয়নি বারাসাতে।

অতঃপর সাময়িকভাবে নেমে আসে দুঃসময়। সমস্যা দেখা দেয় অন্যত্র। খারাপ স্টেডিয়াম, পরিকাঠামগত সমস্যা তো ছিলই পাশাপাশি সারা বিশ্বজুড়ে যখন কৃত্তিম ঘাসের মাঠে খেলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল তখনও বারাসাতে এস্ট্রো টার্ফ বা কৃত্তিম ঘাসে খেলা হত। কৃত্তিম ঘাসে বড় দলের প্লেয়াররা চোট আঘাত পেতে থাকেন। বড় দলের আপত্তিতে বারাসাত স্টেডিয়ামে বড় খেলা বন্ধ হয়ে যায়। করোনার সময় বারাসাত স্টেডিয়ামকে করোনা আক্রান্তদের সেফ হোম হিসেবে ব্যবহার করা হতে থাকে। ততদিনে হানাবাড়ির চেহারা নিয়েছিল বারাসাত স্টেডিয়াম। ছিল বিষাক্ত সাপ খোপের আড্ডা। অতি সম্প্রতি তৃণমূল জমানার প্রায় শেষ দিকে বারাসাতের বিধায়ক চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার ও উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের দায়িত্বে থাকা নারায়ণ গোস্বামী সহ তৃণমূল নেতারা বারাসাত স্টেডিয়ামের সংস্কারে মনোযোগী হন। প্রচুর টাকা বরাদ্দ করা হয় বারাসাত স্টেডিয়ামের পেছনে। নতুন করে সেজে ওঠে বারাসাত স্টেডিয়াম। তবুও ২০১৭ সালের পরে বারাসাত স্টেডিয়ামে বড় মাপের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল না হওয়ায় বারাসাত স্টেডিয়াম স্টেডিয়াম সংলগ্ন অঞ্চল ভূতের বাসা হয়ে ওঠে। হানাবাড়ির চেহারা নেওয়া বারাসাত স্টেডিয়ামকে পুনরায় পুরনো গৌরব ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগে হন বারাসাতের নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর চ্যাটার্জি। মাঠ কে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তাঁর উদ্যোগে ২০২৬ সালের কলকাতা ফুটবল লিগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ খেলার দায়িত্ব পেয়েছে বারাসাত। এই দুটি খেলা যদি বারাসাত স্টেডিয়াম সফলভাবেও আয়োজন করতে পারে তাহলে এবছরই হয়তো ডার্বি ম্যাচের আসর বসতে পারে বারাসাত বিদ্যাসাগর ক্রীড়াঙ্গনে। মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল কলকাতা ফুটবল লিগের মুখোমুখি হতে পারে বারাসাতে। বারাসাতে ডার্বি আয়োজন করার কারণ ক্রীড়া মহলের সূত্রে যা জানা গিয়েছে তা অনেকটা এইরকম, সম্প্রতি কলকাতা লিগ জৌলুস হারানোয় বারাসাত মাঠে এই ধরনের ম্যাচ করালে দর্শকদের মধ্যে উন্মাদনা বাড়তে পারে। রিজার্ভ দল খেলায় বড় ম্যাচের উন্মাদনা কিছুটা কম থাকে ও দর্শক জমায়েত কম হয়। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন পরিচালনা ও ম্যাচ আয়োজনের তুলনায় ছোট স্টেডিয়ামে খরচ অনেক কম। ফলে ছোট মাঠে প্রতিযোগিতা আয়োজন করলে বড় ম্যাচ নিয়ে ও টিকিট নিয়ে অনেক বেশি ডিমান্ড বাড়তে পারে এবং মাঠ ভর্তি দর্শক পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি, সদ্য সংস্কার হওয়া বারাসাত স্টেডিয়ামে স্থানীয় ম্যাচ আয়োজনের মাধ্যমে পরিকাঠামোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে। বারাসাত মাঠকে ঢেলে সাজানো হয়েছে, জল নিকাশি ব্যবস্থা ও স্প্রিংলার অত্যন্ত সক্রিয়। মাঠে জল ও কাদা জমে থাকার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। আলো বা ফ্লাড লাইট পর্যাপ্ত বলেই মনে করা হচ্ছে। মাঠে পানীয় বোতল বা বর্জ্য পদার্থ পড়ে নেই। ঝকঝকে তকতকে মাঠ ও স্টেডিয়াম। তবে ট্রায়াল বা মাঠের চূড়ান্ত পরীক্ষা হবে আগামী ৭ ও ৯ তারিখের কলকাতা লিগের দুটি ম্যাচে। ভরা বর্ষায় মাঠ কতটা উপযোগী তা যেমন দেখে নেওয়া যাবে, আলো ও গ্যালারির তথা দর্শকদের সুব্যবস্থা থাকলেও এই দুটি ম্যাচ প্রমাণ করে দেবে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ অনুষ্ঠিত করার জন্য বারাসাত স্টেডিয়াম কতটা প্রস্তুত। বিধায়ক শংকর চ্যাটার্জী মনে করেছেন বারাসাত স্টেডিয়াম ও মাঠ একদম তৈরি। একদিন আগে মাঠে ঘুরে গিয়েছেন আইএফএ সেক্রেটারি অনির্বাণ দত্ত। মাঠের দায়িত্বে থাকা আধিকারিকরা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে এবং মৌখিকভাবে ফিট সার্টিফিকেট দিয়েছেন অনির্বাণ দত্ত। সংবাদমাধ্যমকেও অনির্বাণ দত্ত জানিয়েছেন মাঠের অবস্থা বেশ ভালো। চূড়ান্ত পরীক্ষা বা প্রথম দুটি ম্যাচের অগ্নিপরীক্ষায় বারাসাত মাঠ ও স্টেডিয়াম। সময়ই বলবে বারাসাতে অদূর ভবিষ্যতেই মোহনবাগান বনাম ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ হবে কিনা!


More Stories
বিশ্বকাপে ইতালির ট্র্যাজিক নায়ক ফ্রাঙ্কো বারেসি প্রয়াত
নীলগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির সামনে মজুত বাজিতে বিস্ফোরণ
মুখে জ্বলন্ত সিগারেট সহ প্রধানমন্ত্রীর প্রতিকৃতি পোড়ানোর ছবি পোস্ট করে গ্রেফতার বারাসাতের ছাত্র আন্দোলনকারী