Home » লোকালয়ে রাতভর গন্ডারের তাণ্ডব! অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান

লোকালয়ে রাতভর গন্ডারের তাণ্ডব! অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান

দুই দিনের টানা প্রবল বর্ষণে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গ। বিপর্যস্ত পাহাড় থেকে ডুয়ার্সের জঙ্গলপথ। চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতির ধ্বংসলীলার নমুনা। কোথাও জমে আছে জল, ভেঙে গিয়েছে একাধিক সেতু, ডুবে গিয়েছে বনাঞ্চলের রাস্তা। এরই মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৫ জনের বেশি মানুষের। তাদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক, এমনকি জলদাপাড়ার গণ্ডার ও হরিণও। প্রকৃতির তাণ্ডবে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান। জলমগ্ন জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা। এই অবস্থায় সেখানকার জীবজন্তু কেমন আছে তা নিয়ে ইতিমধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। এমনকী জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে গন্ডার ঘুরতে দেখা গিয়েছে। এই অবস্থায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হল জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান। বন্ধ হাতি এবং জঙ্গল সাফারি।

রবিবারই হলং নদীর উপর কাঠের সেতুটি প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়ায় কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে জলদাপাড়ার মূল সংযোগপথ। নদীর জল ফুলে ওঠায় জলদাপাড়া টুরিস্ট লজেও আটকে পড়েন ২০ জনের বেশি পর্যটক। সোমবার সকালে স্থানীয় প্রশাসন ও বনকর্মীরা তাঁদের উদ্ধার করেন। লজের ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার নিরঞ্জন সাহার উদ্যোগে আর্থ মুভারের সাহায্যে পর্যটকদের নদী পার করানো হয়। এখন ওই লজে আর কোনও পর্যটক নেই। বন দফতর জানিয়েছে, পর্যটক ও বনকর্মীদের সুরক্ষার স্বার্থে আপাতত জলদাপাড়ার জঙ্গল পর্যটনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। রাস্তা, সেতু, নদীপথ ও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষতি মূল্যায়ন করে তবেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তোর্ষা, মালঙ্গি, হলং, বুরি তোর্ষা, ও দিনাই নদীর উপত্যকায় বিস্তৃত জলদাপাড়া ডুয়ার্সের এক অনন্য ইকোসিস্টেম। ঘন শাল ও সেগুন বন, বালুময় নদীতীর ও তৃণভূমি মিলে এখানে তৈরি হয়েছে উত্তরবঙ্গের এক প্রাকৃতিক আশ্রয়কেন্দ্র। বৃষ্টির মৌসুমে নদীগুলি চওড়া হয়ে ওঠে, কিন্তু এবারের মতো প্রবল বর্ষণে বহু বনাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় প্রাণীরা আশ্রয় হারিয়েছে। বিশেষ করে গণ্ডার ও হরিণেরা যাদের ঘাসভূমি তাদের মূল বাসস্থান, সেটাই এখন জলের তলায়। উৎসবের লম্বা ছুটিতে অনেকেই এই সময় পাহাড়ে বেড়াতে যান।

প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময় ও তার পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে জলদাপাড়ায় পর্যটকের ঢল নামে। বন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু অক্টোবর মাসেই গড়ে ৭ হাজার থেকে ৯ হাজার পর্যটক জলদাপাড়ায় আসেন —দেশের নানা রাজ্য থেকে, এমনকি বিদেশ থেকেও। গণ্ডার দেখা, জিপ সাফারি, ও হাতির পিঠে ভ্রমণ—সব মিলিয়ে এই মৌসুমেই বনাঞ্চলের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় হয়। এবারের প্রাকৃতিক বিপর্যয় সেই মৌসুমেই বড় ধাক্কা দিল স্থানীয় অর্থনীতি ও হোমস্টে ব্যবসায়ীদের।

বাংলার সবচেয়ে বেশি একশৃঙ্গ গণ্ডার পাওয়া যায় জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে। সাম্প্রতিক গণনায় এখানে গণ্ডারের সংখ্যা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টির মধ্যে, যা রাজ্যের জীববৈচিত্র্যের অন্যতম গর্ব। গণ্ডার ছাড়াও এখানে দেখা মেলে হাতি, চিতল হরিণ, বন্য মহিষ, গৌর, ও নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির। এবারের অতি বৃষ্টিতে বেশ কিছু বন্যপ্রাণীর মৃত্যু হয়েছে বলে বনকর্মীরা আশঙ্কা করছেন।

ভুটান থেকে আসা জলস্রোতে একাধিক বন্যপ্রাণের মৃত্যু হয়েছে। জলে ডুবে গরুমারা জাতীয় উদ্যানের একটি গন্ডারের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার সকালেই গরুমারা জাতীয় উদ্যান লাগোয়া ময়নাগুড়ির রামসাই এলাকা থেকে গন্ডারের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। শিলিগুড়ির কাছেই মেচি নদীতে ডুবে একটি হস্তিশাবকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। জানা গিয়েছে ৩০ টি হাতির পাল মেচি নদী পার হতে যাওয়ার সময় দলছুট হয়ে যায় হস্তি শাবকটি। জলে ডুবে ওই হস্তি শাবকের মৃত্যু হয়েছে।

About Post Author