বরফ গলা আগেই শুরু হয়েছিল। এ বার তা গলে পুরোপুরি জল হল। গত ২২ সেপ্টেম্বর চতুর্থীর সন্ধ্যায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যখন সাক্ষাত্ করেছিলেন, তখনই খানিকটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তখনও এক মাসও কাটেনি। তার মধ্যে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও দীর্ঘ বৈঠক সেরে ফেলেন। তবে এবার পাকাপাকি ভাবে দিদির হাত ধরলেন কানন। তৃণমূলে যোগ দিলেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়। সঙ্গী শোভনের সবসময়ের ছায়াসঙ্গী বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি ও মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের হাত ধরে যোগ দিলেন শোভন-বৈশাখী। তৃণমূল আমার কাছে পরিবারের মতো। ঘরে ফিরে ভাল লাগছে। দলের পতাকা হাতে নিয়ে বলেন শোভন। সঙ্গে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসাও করলেন, অভিষেক এনকারেজ করেছেন।
একসময় তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি। তাঁকে কানন বলে ডাকতেন মমতা। ছাত্র রাজনীতিতে কংগ্রেসে হাতেখড়ি। মমতার ছত্রছায়াতেই কার্যত তাঁর রাজনৈতিক উত্থান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করার পর কংগ্রেস ছেড়ে তাঁর দলে যোগ দেন শোভন। ২০১০ সালে কলকাতা পুর নিগমের দায়িত্ব তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে জেড প্লাস ক্যাটেগরির সিকিউরিটিও দেওয়া হয় শোভনকে। ভারতের প্রথম কোনও শহরের মেয়র হিসেবে তিনি জেড প্লাস সিকিউরিটি পান। দীর্ঘদিন মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। যে পদে ২০১৮ সালের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ছিলেন তিনি। ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রীও। রাজ্য সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব ছিল।
মমতার কানন কেন তৃণমূলে কোণঠাসা হয়েছিলেন?
বছর আটেক আগে তাঁর পারিবারিক দ্বন্দ্ব সামনে আসে। ২০১৭ সালে স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায়ের থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ চেয়ে মামলা করেন শোভন। সেইসময় বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে শোভনের সম্পর্ক নিয়েও জল্পনা বাড়তে থাকে। রত্নার বাবা দুলালচন্দ্র দাসও তৃণমূলের নেতা। সেইসময় অনেক তৃণমূল নেতা বলতে থাকেন, বৈশাখীর সঙ্গে সম্পর্কের জেরে দলের বিভিন্ন কাজে মনসংযোগে ব্যাঘাত ঘটে শোভনের। ধীরে ধীরে দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েন মুখ্যমন্ত্রীর কানন। তৃণমূলের সঙ্গেও দূরত্ব বাড়ে। পরে তৃণমূল ছেড়ে ২০১৯ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। তবে কোনওদিনই সক্রিয় ছিলেন না। পরে অবশ্য পদ্মশিবিরের প্রতি বিরূপ হয়ে দল ছেড়ে দেন। রাজনীতি থেকেই সরে এসেছিলেন। তার পরে অবশ্য মমতার সঙ্গে তাঁর একাধিক বার সাক্ষাৎ হয়েছে।
কয়েক বার দিদির বাড়িতে ভাইফোঁটাও নিতে গিয়েছিলেন। যদিও আরও পরে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনি দেখা করেন। নেত্রীর সঙ্গে তো বটেই, দলের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। তৃণমূল ছাড়া, বিজেপিতে যোগ দেওয়া, আবার বিজেপি ছেড়ে একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া— এই সাত বছরে অভিষেকের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। এবার সেই যোগাযোগ হয়। আগামী এক-দু’মাসের মধ্যেই ফের তৃণমূলের সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে পারেন শোভন, সেই জল্পনা ছড়িয়েছিল। যদিও এই জল্পনা তৃণমূলে বহুদিন ধরেই রয়েছে। ২০২৩, ২০২৪ সালের ২১ জুলাই তৃণমূলের বার্ষিক সভার আগেও শোভনের তৃণমূল ওয়াপসির জল্পনা ডালপালা মেলেছিল। কিন্তু প্রতিবার তা জল্পনাই থেকে গিয়েছে। তবে এবার এক মাসের ব্যবধানে অভিষেক এবং মমতার সঙ্গে শোভনের সাক্ষাতের পর অনেকেরই মনে হয়েছিল, এ বার বিষয়টি আগের মতো নয়। তা অনেক ‘নিবিড়’।
ইতিমধ্যেই এনকেডিএ চেয়ারম্যান পদে যোগ দিয়েছেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। এবার ঘাসফুলে কাননের কামব্যাক।
বিজেপিতে থেকেও শোভন কখনও ভাইফোঁটা নিতে চলে গিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে, আবার রাজ্য সরকারের আয়োজনে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে শোভন-বৈশাখীকে দেখা গিয়েছে সামনের সারিতে। এবার বিলম্বিত বোধদয়। ছাব্বিশের ভোটের আগে ফের তৃণমূলে শোভন-বৈশাখী। এবার রাজনৈতিক মহলে আলোচনা, তবে কি ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে টিকিট পাচ্ছেন শোভন? সেক্ষেত্রে নিজের এলাকা বেহালা পশ্চিমেই তাঁকে প্রার্থী করা হবে? উত্তর দেবে সময়।


More Stories
মোথাবাড়ি কাণ্ডের অশান্তির নেপথ্য “খলনায়ক” মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার কিসের ইঙ্গিত?
বকেয়া ডিএ-র সুখবর : কবে টাকা পাবেন সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীরা?
এবারের ভোট বাংলার আত্মাকে রক্ষা করার লড়াই, ব্রিগেডে বললেন প্রধানমন্ত্রী