পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৬ নভেম্বর :
সমস্যা যখন রোহিঙ্গা
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ তত্ত্ব বা বিষয় বেশ কিছুদিন ধরেই এপার বাংলা – ওপার বাংলায় বেজায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এমুহূর্তে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রোহিঙ্গা তত্ত্ব। সঠিক ভোটার চয়ন করার ক্ষেত্রে রাজ্যে নভেম্বর মাসের চার তারিখে শুরু হয়েছে এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন। আর এই প্রসঙ্গে ঘুরেফিরে আসছে রোহিঙ্গাদের কথা। রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন। এদিন প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব।
রোহিঙ্গা প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপট ও ভারতের নিরিখে বঙ্গের হালচাল
বিহারে ইতিমধ্যেই ভোট শুরু হয়ে গিয়েছে। ইতিপূর্বেই বিহারে SIR প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। নিবিড় সংশোধনের পর চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় প্রায় ৪৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। যার অধিকাংশই মৃত, ভিনরাজ্যে স্থায়ীভাবে বাসস্থান বদল করা বা একাধিক কেন্দ্রে ভোট থাকার কারণে বাদ পড়েছে। এই ৪৭ লক্ষের মধ্যে ঠিক কতজন বাংলাদেশি? বা ঠিক কতজন বিদেশি ভোটার, সেটার স্পষ্ট উত্তর নির্বাচন কমিশন দিতে পারেনি , তেমনই বারবার আলোচিত হওয়া বাংলাদেশী অথবা একদা মায়ানমারের অধিবাসী রোহিঙ্গাদের সংখ্যার স্পষ্ট হিসেব মেলে নি। ৪ নভেম্বর রাজ্যে এস আই আর প্রক্রিয়া চালু হতেই বঙ্গে পথে নেমেছিল শাসক দল। বঙ্গে প্রধান বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী সহ বিজেপির নেতারা অভিযোগ করে থাকেন তৃণমূলের জয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি অনুপ্রবেশকারী এবং তার মধ্যে একটি বিরাট সংখ্যা রোহিঙ্গা দের। বিজেপির তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে রোহিঙ্গা সহ অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। তাঁদের দাবি, বঙ্গে SIR হলেই নাকি সেই সব রোহিঙ্গাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে! আর এখানেই তৃণমূল ফুল চড়িয়েছে রোহিঙ্গা তত্ত্ব নিয়ে। এস আই আর বা SIR বিরোধী মিছিলের পর গিরিশ পার্কের মঞ্চ থেকে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি বলেছেন?
বিজেপি-নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন, “আপনারা বলছেন বাংলায় নাকি প্রচুর রোহিঙ্গা ঢুকে গেছে। প্রচুর বাংলাদেশি ঢুকে গেছে। SIR-এ নাকি বাংলাদেশি খুঁজবে। বিহারে তো SIR হয়েছে, কতজন বাংলাদেশি ছিল? কতজন রোহিঙ্গা ছিলেন খুঁজে পেয়েছেন? তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম ২-৪ টি রোহিঙ্গা এসেছে, তারা তো জেলে! ভোটার তালিকায় কী করে আসবে?”
তৃণমূল সহ বিজেপি বিরোধী বঙ্গের একাধিক দল বারবার বলে আসছে, বিজেপি বঙ্গে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে সুকৌশলে বিভাজনের রাজনীতি করার চেষ্টা করছে বিজেপি। শাসকদল বরাবর বলে আসছে, রাজ্যে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের তত্ত্ব মনগড়া এবং হাস্যকর। বাংলায় মায়ানমারের সীমান্তই পড়ে না। ফলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের প্রশ্নই নেই। কিন্তু বাস্তব ঘটনা যে রোহিঙ্গাতে ছেয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গারা জীবন জীবিকার জন্য ভারতে ঢুকে পড়বে তা আর আশ্চর্য কি? ইতিমধ্যেই যোগী সরকার লখনৌতে ১২ হাজার সাফাই কর্মীর মধ্যে কারা বাংলাদেশী বা রোহিঙ্গা রয়েছে তা জানার জন্য তদন্ত শুরু করেছে। সারা সারা ভারতে বা বঙ্গে এদের সংখ্যা কত? তারা আছে কোথায়? যদি এরা বেশি সংখ্যায় থেকে থাকে তাহলে তারা কি ভোটার?
প্রথমে নজর রাখা যাক রোহিঙ্গা কারা? স্বাভাবিকভাবেই একের পর এক প্রশ্ন? এবং সর্বোপরি, চলতে থাকা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের রোহিঙ্গা ইস্যু ঘিরে বিশেষ তাৎপর্য কি?
রোহিঙ্গাদের আদি বাসস্থান মায়ানমার থেকে উৎখাত কেন হল তারা? কেন রোহিঙ্গাদের ঘিরে ভারত-বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে? আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রভাব রয়েছে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিভিন্ন দেশের টালমাটাল পরিস্থিতির। দেখে নেওয়া যাক রোহিঙ্গাদের উদ্ভবের ইতিহাস এবং তাদের বর্তমান অবস্থা।
রোহিঙ্গা সমস্যা
বসুধৈব কুটুম্বকম মানে বসুধা বা পৃথিবী-ই আত্মীয় অর্থাৎ গোটা পৃথিবী এক পরিবার – ভারতীয় দর্শনের এই প্রাচীন কথাটি এখন শুধুমাত্র মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা হচ্ছে না। যেমন ভারতে করা হচ্ছে না, তেমনভাবেই ভারতের বিভিন্ন প্রতিবেশী বাংলা দেশেও নয়। কারণ সবাইকে বা সারা পৃথিবীর মানুষকে আশ্রয় দিলে আইনি এবং দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে কথাটির তাৎপর্য ভিন্ন মাত্রা নিতে পারে এবং বৃহৎ ভাবে দেখলে বিষয়টি বিপদ বা ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে বা ওঠে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় শরণার্থী প্রসঙ্গে তৈরি হচ্ছে সংকট । আর এখানেই জড়িয়ে রয়েছে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ, বারবার উঠে আসছে রোহিঙ্গাদের কথা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা। পাশাপাশি মায়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় এবং মানবিক সংকট নিয়ে তত্ত্বকথায় ভয়ংকর ভাবে বিতর্ক দানা বেঁধেছে । এই মানবিক সংকট এখন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উল্লেখ করা দরকার, ভারতে যে বেশ কিছু রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করে তা বিভিন্ন সময় সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাদের সাধারণভাবে অবৈধ অভিবাসী হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে বা হচ্ছে। বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার আগে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে আরও সম্যক ভাবে জেনে নেওয়া প্রয়োজন। এনিয়ে আরও একবার বলা যাক- রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শর মধ্যে ফারাক রয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতবাদ এক এক রকম। রোহিঙ্গারাই হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ইস্যু।
রোহিঙ্গা কারা এ নিয়েও একাধিক তত্ত্ব বা মতবাদ রয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের উৎপত্তি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমেই বলা যায়, অষ্টম শতাব্দীতে আরবদের আগমনের মধ্যে দিয়ে বর্তমান মায়ানমারের আরাকানে মুসলমানদের বসবাস শুরু হয়। এই অঞ্চলের বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠিই পরবর্তীকালে রোহিঙ্গা নামে পরিচিতি লাভ করে।রোহিঙ্গা শব্দটি প্রাক-উপনিবেশিক কালে ‘রুইঙ্গা’ বা ‘রোয়াঙ্গিয়া’ হিসেবে উচ্চারিত হত, যার মানে ‘রোহাং এর বাসিন্দা’। আরাকানের পূর্ব নাম ‘রোহাং’ বা ‘রাখাঙ্গা’ বা ‘রোসাঙ্গা’ থেকে শব্দটি উদ্ভূত বলে মনে করা হয়। আবার অনেকের ধারণা, আরবী ‘রহম’ শব্দ থেকে নামটি এসেছে, যা আরবী বনিকদের দেয়া নাম। ১৭৯৯ সালে লেখা ফ্রান্সিস বুকানানের প্রবন্ধেও রোহিঙ্গাদের কথা এবং রোহিঙ্গাদের ভাষা রোহিঙ্গা (Rooinga) উল্লেখ আছে। ঐতিহাসিক মতামত বিভিন্ন রকম।১৮১৫ সালে জোহান সেভেরিন ভাতেরও তার কম্পেন্ডিয়ামে রুইঙ্গাদের নিজস্ব ভাষাসহ একটি বার্মিজ নৃগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ বার্মার আরাকানে ‘রোহিঙ্গা জামায়েতুল উলামা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য ক্রিস্টিনা ফিঙ্কের মতো অনেকেই ভাবেন, রোহিঙ্গা আসলে জাতিগত পরিচয় না, বরং আরাকান বা রাখাইনে একটি মুসলিম অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ১৯৫০ সাল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের প্রেক্ষিতে দেয়া একটি রাজনৈতিক পরিচয়। তবে এ অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে,নবম-দশম শতাব্দীতে বর্তমান মায়ানমারের আরাকান রাজ্য ‘রোহান’ কিংবা ‘রোহাঙ’ নামে পরিচিত ছিল, সেই অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবেই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের উদ্ভব। অর্থাৎ রোহিঙ্গারা পূর্বতন বার্মা, অধুনা মিয়ানমারের পশ্চিম অঞ্চলের মুসলমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। বর্তমানে সংখ্যায় অন্তত ২০ লাখ রোহিঙ্গা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যার অধিকাংশ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পাশে উত্তর রাখাইন রাজ্য নামে নামকরণ করা পূর্ববর্তী আরাকান রাজ্যের তিনটি টাউনশিপে বাস করে। মায়ানমারের জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশ বামার এবং দশ শতাংশ শান ৭% কাইন এবং ৪% রাখাইন। বাকিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা।আদি ও অনাদি কাল ধরে আরাকানে তামবুকিয়া, তুর্ক-পাঠান, কামাঞ্চি এবং রোহিঙ্গাদের বাস। তামবুকিয়াদের ইতিহাস শুরু হয়েছে অষ্টম শতক থেকে, যখন তাদের পূর্বপুরুষরা রাজা মহা তায়িং চন্দ্রের শাসনামলে আরবদেশ থেকে দক্ষিণ আরাকানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। তুর্ক-পাঠানরা আরাকানের সর্বশেষ রাজধানী ম্রোহং-এর শহরতলি এলাকায় তাদের প্রধান নিবাস গড়ে তোলে। আরাকানি রাজা মীন সোয়া মুয়ং ওরফে নরমিখলা বাংলার সেনাবাহিনীতে কর্মরত তাঁর পূর্বপুরুষদের সহায়তায় রাজক্ষমতা পুনর্দখল করে। তামবুকিয়াদের মতো তারা রাজার অনুমোদনক্রমে আরাকানে স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলে।কামানঞ্চিদের পূর্বপুরুষ এসেছিল মোগল সম্রাট শাহ সুজার বংশধরদের মধ্য থেকে। আওরঙ্গজেব দিল্লীর সিংহাসন দখলের পর তারই ভাই বাংলার গভর্নর শাহ সুজা সপরিবারে আরাকান রাজার দরবারে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তাদের বংশধরদের অনেককেই রমরী দ্বীপে দেখা যায়।
এই রোহিঙ্গারা কেন ও কিভাবে নিজেদের দেশ ছাড়লেন? কীভাবে তাঁরা অন্য দেশের ভূগোল ইতিহাস ও রাজনীতির বিষয় হয়ে উঠলেন? বর্তমান ভারতের বিশেষ নিবিড় সংশোধনে তারা কতটা দাগ কাটতে চলেছেন তা নিয়ে থাকছে পরবর্তী পর্ব।


More Stories
নারদা কাণ্ডে “৫ লাখ টাকা ঘুষ “-এর উল্লেখ সুখেন্দু শেখরের সাংসদকে আক্রমণে
২৮ বছর পরে কংগ্রেসে কি ফিরবেন মমতা?
তৃণমূল বিধায়ক ও সাংসদদের ভাবমূর্তি সমূলে ধ্বংস করে বড় জয় বিজেপির