পুরন্দর চক্রবর্তী ও দীপ সেন, সময় কলকাতা, ২৫ নভেম্বর: মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় মঙ্গলবার মতুয়াগড় গিয়েছিলেন। বারাসাত হয়ে কলকাতা ফেরার পথে মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি আটকে বিক্ষোভ দেখানো হয়। বারাসাত হাসপাতালের মর্গে থাকা মৃতের দেহ থেকে চোখ খোয়া গিয়েছে যার পেছনে রয়েছে অশুভ চক্র, অভিযোগ তোলে মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি আটকে পথ বিক্ষোভকারী মৃতের পরিবার। অতঃপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় মৃতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। মুখ্যমন্ত্রী মৃতের পরিবারের উদ্দেশ্যে বলেন, গোটা বিষয়টির তদন্ত হবে। তিনি এও বলেন, মৃত যুবকের মাকে চাকরি দেওয়া হবে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তদন্তের আশ্বাস ও চাকরির প্রতিশ্রুতির পরে ও বলাবাহুল্য এই ঘটনায় যে অভিযোগ উঠে এসেছে তা ভয়ঙ্কর এবং গুরুতর।
মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি আটকে বিক্ষোভ – একটি চোখ এবং একটি চাকরির প্রতিশ্রুতি। বারাসাত মেডিক্যাল কলেজ তথা হাসপাতালের মর্গে মৃতের দেহ থেকে চোখ খোয়া যেতেই এই বিষয়টি রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে আরেকবার প্রশ্ন তুলল। কিন্তু দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো বছরের তিরিশের যুবকের চোখ খোয়া গেল কী করে? কী আছে নেপথ্যে? হাসপাতাল মৃতের পরিবারকে জানায় – ইদুরে চোখ খুবলে নিয়েছে। অন্যদিকে মৃতের আত্মীয় পরিজনের দাবি, এরকম সুনিপুন ভাবে চোখ ইঁদুর খুবলে নিতে পারে না। তাঁদের প্রশ্ন, অন্য কোথাও দাগ নেই,খালি চোখটুকুই তুলেছে ইঁদুর? তাঁরা এও বলছেন, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে অঙ্গ পাচার চক্র। এই অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।
ইঁদুরের কাণ্ড নাকি অঙ্গ পাচারকারীর কাজ? মর্গে থাকা মৃতের চোখ উপড়ে নেওয়ার নেপথ্যে ঠিক কি কারণ খুঁজে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে সময় কলকাতার তরফে।
হাসপাতাল থেকে মৃতের চোখ খোয়া যাওয়া এবং মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি আটকে বিক্ষোভ দুটি ঘটনা পরস্পর সম্পর্কিত হলেও বিষয় দুটির আলাদা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। যশোর রোডে মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি আটকানোর মধ্যে সিএম সিকিউরিটি কতটা তৎপর তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে, মৃতের শরীর থেকে একটি চোখ চলে যাওয়ার বিষয়টি সরকারি পরিষেবায় অত্যন্ত তাৎপর্যবাহী। মৃতের পরিবার দেহ পাচার চক্রের যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছে যে অভিযোগ বারাসাত মর্গের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা নস্যাৎ করে দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, বারাসাত হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে ইঁদুরের উৎপাত। অন্যদিকে, ফ্রিজিং সিস্টেম খারাপ। বরফ জমতে পারে না ও বাইরের থেকে আনা বরফ দ্রুত গলে যায়। নজরদারি থাকলেও সুযোগ পেলেই ইঁদুর মৃতের শরীরে দাঁত বসায়। ফলে কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে যায়।
বারাসাত হাসপাতালের মর্গের সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি দুটি ঘটনা ঘটেছে। এক যুবকের চোখ ও এক মহিলার ঠোঁট খুবলে নিয়েছে ইঁদুর। মর্গের তরফে দাবি করা হয়েছে, দুটি ক্ষেত্রেই পরিবার প্রাথমিকভাবে বিষয়টি মেনে নেয়। দেহ নিতেও তারা রাজি হয়ে যায়। চোখ হারানো ব্যক্তির পরিবার, কেন হঠাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল তা নিয়ে ধন্ধে মর্গের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা।
বারাসাত মর্গের সঙ্গে যুক্ত থাকা লোকেদের বক্তব্য যাচাই করার সুযোগ নেই কারণ সি সি টিভি ফুটেজ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে মৃতের দিদি সুজাতা বণিক বললেন, ইঁদুরের কাজ নয়- বারাসাত হাসপাতালে ব্যবসা শুরু হয়েছে।
তবে এ নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই যে -ক্ষোভে আটকে পড়া মুখ্যমন্ত্রী তদন্ত করার কথা বললেও, ইঁদুরের কাণ্ড নাকি অশুভচক্র তা প্রমাণ করা যাবে না। তবে, বারাসাত মেডিকেল কলেজের দায়িত্বে থাকা আধিকারিকরা দায় এড়াতে পারেন না কিছুতেই। কারণ মৃতের পরিবারের ক্ষোভ স্বাভাবিক।
প্রাসঙ্গিকভাবে,বারাসাত মর্গের দায় যে আধিকারিকদের উপরে সরাসরি বর্তায় তাঁরা ফরেনসিক মেডিসিন ডিপার্টমেন্টের আধিকারিক। সুতরাং, চোখ চুরির অভিযোগ কেন্দ্রিক সবচেয়ে বড় দায় এসে পড়তেই পারে ফরেনসিক মেডিসিনের এইচ ও ডি -র উপরে। অন্যদিকে, বারাসাত হাসপাতালের সর্বময় কর্তারাও এর দায় থেকে হাত ঝেড়ে ফেলতে পারেন না।
বারাসাত হাসপাতাল কিছু দিন আগেই মেডিকেল কলেজের রূপ পেয়েছে। গঠনতান্ত্রিকভাবে পাল্টেছে অনেক কিছুই। দীর্ঘদিন ধরেই বারাসাত হাসপাতালের সুপারের দায়িত্বে ছিলেন সুব্রত মণ্ডল। বারাসাত হাসপাতাল নতুন স্ট্যাটাস পাওয়ার পরে তিনি হালে হন অতিরিক্ত সুপার। তথাপি হাসপাতালে তাঁর কাজকে তিনি সীমাবদ্ধ করেননি, তাঁর কর্মতৎপরতা ও কমেনি । তাঁকে সম্প্রতি বদলি করে দেওয়া হয়েছে। ডেপুটি সুপারের বদলির কয়েকদিনের মধ্যে একটি কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠল যেরকম অভিযোগ সুপার বা ডেপুটি সুপার হিসেবে থাকা তিনি থাকার সময় হয়নি। বর্তমানে বারাসাত মেডিক্যাল কলেজের সুপারের দায়িত্ব রয়েছেন অভিজিৎ সাহা। বিপুল কর্মকাণ্ডর কেন্দ্র বারাসাত হাসপাতালের নাড়ি নক্ষত্র রাতারাতি জানা তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক নয়। সুব্রত মণ্ডল থাকায় তাঁকে বেগ পেতে হয় নি। সাম্প্রতিক অতীতে বারাসাত হাসপাতালে বেশ কিছু বিষয়ে বেশ কিছু প্রশ্নচিহ্ন উঠলেও সুব্রত মণ্ডলের আমলে একটিও এরকম বড় অঘটন ঘটে নি। হাসপাতালের কর্মচারীরা বলে থাকেন যে, সুব্রত মণ্ডল কখনোই ঘড়ি ধরে হাসপাতালের তদারকি করতেন না, তিনি বাড়তি সময় দিতেন হাসপাতালে । তাঁর সবদিকে নজর ও ছিল।
একথা বলা বাহুল্য , ব্যক্তি কখনোই প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বে হতে পারে না। সুব্রত মণ্ডল এমুহূর্তে বারাসাত হাসপাতালে নেই বলেই এরকম ঘটনা- একথারও কোনও বাস্তব ভিত্তি থাকা উচিত নয়। কারণ অভিজিৎ সাহা সবে এসেছেন, তাঁকেও সময় দেওয়া বাঞ্ছনীয় কারণ পরিকাঠামগত ত্রুটিগুলি সদ্য গজিয়ে ওঠেনি।
চোখ চুরির অভিযোগ কেন্দ্রিক হাসপাতালের অজুহাত বা ঢাল হয়ে ওঠা সমস্যাগুলি আগেও ছিল।বরফ জমার সমস্যা বা ইঁদুরের সমস্যা নতুন নয়। সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যাচ্ছে না, গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু যন্ত্রাদির অভাব নিয়ে ও রয়েছে প্রশ্ন। সিসিটিভির ফুটেজ সব জায়গায় রাখা যেতে পারে কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে তবে সিসিটিভির কমতি নেই বারাসাত হাসপাতালে। একাধিক গঠনতান্ত্রিক সমস্যা রয়েছে বারাসাত হাসপাতালে তবে সুযোগ-সুবিধা ও কম নেই। আই সি ইউ থেকে নিওনেটাল ডিপার্টমেন্ট সবকিছুই আপগ্রেডেড। প্রশ্ন এখন, মর্গ নিয়ে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র স্টাফ জানিয়েছেন, সুব্রত মণ্ডল থাকাকালীন বারাসাত হাসপাতালের গঠন তান্ত্রিক সমস্যা গুলি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে নি কারণ তিনি অগ্নীশ্বর হয়ে হাসপাতালের সমস্যাগুলির বিকল্প কিছু পথ করে রেখেছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মচারী জানান, সুব্রত মণ্ডল না থাকায় হেলথ সিস্টেম সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে একথা না বলা গেলেও বারাসাত হাসপাতালে প্রভাব পড়েছে তাঁর অনুপস্থিতিতে। তবে যারা নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন বা নিচ্ছেন তাঁদের সময় দিতে হবে। তিনি এও বলেন, এবারের চোখ খোয়া যাওয়ার ঘটনা যুক্তি তর্কের ঊর্ধ্বে। তবে দেহ পাচারকারী চক্র ই যদি থাকতো তাহলে আগেই টের পাওয়া যেত। এই আশঙ্কা নেই বলে দাবি করে ও তিনি বলেন, তবুও আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে এরকম অবাঞ্ছিত ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।
তবুও একথা বলাই বাহুল্য,সবমিলিয়ে একটি চোখ, বিক্ষোভ, প্রতিশ্রুতির জের কাটছে না। কোথাকার জল কোথায় গড়ায়, এখন সেটাই দেখার।
মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি আটকে বিক্ষোভ #মুখ্যমন্ত্রীরগাড়িআটকেবিক্ষোভ


More Stories
পুলিশের উর্দি পরে সিভিক ভলেন্টিয়ারের দাপাদাপি
ডাম্পিং গ্রাউন্ডে থাকা উচিত ট্রাফিক পুলিশের, কেন বললেন সব্যসাচী দত্ত
মোথাবাড়ি কাণ্ডের অশান্তির নেপথ্য “খলনায়ক” মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার কিসের ইঙ্গিত?