Home » ইচ্ছে হলেই কি কোনও দেশকে আক্রমণ করতে পারে আমেরিকা? কে আছে ভেনেজুয়েলার পাশে? দেখুন প্রতিবাদের বহর!

ইচ্ছে হলেই কি কোনও দেশকে আক্রমণ করতে পারে আমেরিকা? কে আছে ভেনেজুয়েলার পাশে? দেখুন প্রতিবাদের বহর!

Oplus_131072

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা , ৪ জানুয়ারি : প্রাচীন বা মধ্যযুগে সম্পদ লুঠের ইচ্ছে হলেই এক দেশ বা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়করা অপুর দেশকে বা অপর রাজ্যকে আক্রমণ করতেন। বিশ্লেষকরা বলছেন,  এই যুগে আমেরিকাও ঠিক তাই করে চলেছে। ভূ-সম্পদে পরিপূর্ণ কোনো দেশ দেখলেই আক্রমণ করছে আমেরিকা। পাশাপাশি, নিজেদের ভু-রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বিন্দুমাত্র খর্ব হওয়ার ন্যূনতম  অশনি সংকেত দেখলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  আগ্রাসী হচ্ছে। উল্লেখ্য বিশ্বের খনিজ তেলে প্রথম পাঁচটি দেশের নাম ভেনেজুয়েলা, সৌদি আরব, ইরান, কানাডা ও ইরাক। ২০০৩ সালে ইরাককে মানবতা বিরোধী বলে  সঙ্গে যুক্তরাজ্যকে নিয়ে ইরাক আক্রমণ করেছিল আমেরিকা। ২o২৬ সালে খনিজ সম্পদ ও তেলের আকর্ষণে -মুখে মাদকের কথা বলে ভেনেজুয়েলাকে আক্রমণ করে দেশটির ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়েছে আমেরিকা। ২০০৬ সালে সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, প্রায় উনিশ বছর নিজের প্রাসাদ থেকে মার্কিন সেনার হতে বন্দী হলেন মাদুরো।  সম্পদ দখলের ইচ্ছায় এভাবে একটি দেশ কি আরেকটি দেশকে আক্রমণ করতে পারে?খনিজ ভান্ডারে পরিপূর্ণ কোনো দেশকে ইচ্ছামত আক্রমণ করা কি যায়? কোনও দেশ খেয়ালখুশিমতো আরেকটি দেশকে আক্রমণ করতে পারে কি? রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদ কী রয়েছে? কে আছে ভেনিজুয়েলার পাশে ?

জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনও দেশ অন্য কোনও দেশকে খেয়াল খুশিমতো আক্রমণ করতে পারে না।সনদের ২(৪)(article 2/4 )অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তিপ্রয়োগ করতে পারবে না। অর্থাৎ, এক দেশ কর্তৃক অন্য দেশকে কোনোভাবেই আক্রমণ করা যাবে না যদি না সেটি আত্মরক্ষা  বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ক্রমে হয়। তবে অতীতে যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় “প্রি-এমপ্টিভ স্ট্রাইক” বা আগাম হামলার নীতি গ্রহণ করেছে। United Nations Charter অনুযায়ী এই নিয়মগুলো পরিচালিত হয়। তাতে অ্যামেরিকা বিশেষ পরোয়া করে না।  তবে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলির উপরে হামলা চালালে পাল্টা পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা থেকে যায়।

তাতে কী এসে যায়? রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আক্রমণ চলছে। একটি দেশ আরেকটি দেশকে কার্যত ধ্বংস করে দিচ্ছে যেমন ২০০৩ সালের যুদ্ধে ইরাকে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় আড়াই থেকে তিন লক্ষ মানুষ।  আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিপুল ভূসম্পদ নিয়ে কম সামরিক শক্তিধর দেশগুলি আক্রান্ত হয়ে চলেছে । সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে বলে আমেরিকা ও তার মিত্রদেশ( যুক্তরাজ্য) কোনও সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেট বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সরাসরি অনুমতি ছাড়াই ইরাকে আক্রমণ শুরু করেছিল। পরবর্তীতে,  ইরাকে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র বা আল-কায়েদার সঙ্গে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে খুঁজে পাওয়া গেছে বিশ্বের ৯ শতাংশ খনিজ তেল। একই কথা প্রযোজ্য ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও। বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ খনিজ তেল শুধুমাত্র ভেনেজুয়েলায়। অন্য খনিজ সম্পদও কম নেই তাদের মাটির তলায়, যেমন লিথিয়াম বা কোবাল্ট। ফলে,  মাদকের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সংযোগ তত্ত্ব আদৌ প্রমাণিত হবে কিনা কেউ জানে না। অর্থাৎ, কখনও মানবতা আর কখনও বা মাদকের দোহাই দিয়ে, ক্ষেত্রবিশেষে খনিজ তেল ও খনিজ সম্পদ, আবার কখনও ভু-রাজনৈতিক আধিপত্য দখল বা বিস্তার করতে আগ্রাসন চলবেই। ইরাক ও ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন প্রমাণ করে দিয়েছে কোন দেশি নিরাপদ নয় অথচ রাষ্ট্রসঙ্গ কি করছে? অন্য দেশগুলি প্রতিবাদ কি করেছে? একটু প্রতিবাদের বহর দেখা যাক।

আন্তর্জাতিক সংস্থা রাষ্ট্রসংঘ  (UN) আমেরিকার এই পদক্ষেপকে একটি “বিপজ্জনক নজির” বলে সতর্ক করেছে।  ইউরোপীয় কমিশনও এই ঘটনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

রাশিয়া এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে এবং মাদুরোর মুক্তি দাবি করেছে। চীন একে “আধিপত্যবাদী আচরণ” বলে বর্ণনা করে আমেরিকার প্রতি অন্য দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে “সন্ত্রাসী আগ্রাসন” ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।

ব্রাজিল, মেক্সিকো, চিলি, কলম্বিয়া, কিউবা এবং নিকারাগুয়া এই সামরিক পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে এবং একে জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থী হিসেবে বর্ণনা করেছে।বেলারুশ ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলার নিন্দা জানিয়ে মাদুরো সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেছে।

ভারতের অবস্থান রীতিমত চোখে পড়ার মতো। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (MEA) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনাবলী “গভীর উদ্বেগের বিষয়” এবং ভারত পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। ভারতের নজরদারিতে আমেরিকার কিছু এসে যাবে না বলাই বাহুল্য।

বামপন্থী দলসমূহ প্রতিবাদ করতে নেমে এরকম ক্ষেত্রে  পথ হেঁটে থাকেন।বিভিন্ন দেশের বামপন্থী দল বিশেষ করে ভারতের কমিউনিস্ট দল এবং আমেরিকার অভ্যন্তরে “পার্টি ফর সোশ্যালিজম অ্যান্ড লিবারেশন” (PSL) এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে বিক্ষোভ করেছে। প্যালেস্টাইনের  হামাস ও ইসলামিক জিহাদ আন্দোলন এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ এই মার্কিন হামলাকে “সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড” বলে নিন্দা জানিয়েছে। ভেনেজুয়েলার উপরে আমেরিকার হামলায় জনসাধারণ প্রতিবাদ ও চোখে পড়ছে। রাস্তায় নামছেন সাধারণ মানুষ। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিক্ষোভ দেখিয়েছে সাধারণ মানুষ।  শিকাগো, ওয়াশিংটন ডি.সি., ফিলাডেলফিয়া, সান ফ্রান্সিসকো এবং ডালাসের মতো বড় বড় শহরে কয়েকশ মানুষ “No War on Venezuela” এবং “No Blood for Oil” স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ করেছে। ইকুয়েডর, এল সালভাদর এবং কিউবার সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে।

এই হল প্রতিবাদের বহর! সাধারণ মানুষ যুগে যুগে বিভিন্ন কারণে প্রতিবাদ করে থাকেন, তারপরে তাঁরা ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। রাষ্ট্রসংঘ আমেরিকার বিরুদ্ধে যে নকলন্তহীন শৃঙ্গ তা বারবার প্রমাণ হয়েছে। চীন ও রাশিয়া মৌখিকভাবে প্রতিবাদ করেছে আর প্রতিবাদ এসেছে যাদের কাছে আমেরিকার আগ্রাসন রীতিমতো আতঙ্ক ও উদ্বেগ। আমেরিকা তাদের দেশের নিরাপত্তার কাছে হুমকি, যেমন খনিজ তেলে পরিপূর্ণ ইরান। ভেনেজুয়েলার  অবস্থা দেখে সোচ্চার হয়েছে মূলত তাদের পার্শ্ববর্তী  ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলি। অন্য দেশগুলি যেমন ভারত উদ্বেগ সহকারে নজর রাখছে, খুব মেপেঝুঁকে পরামর্শ দিচ্ছে। এইরকম হাল অধিকাংশ দেশের কারণ আমেরিকাকে চটালে বিপদ। হাতে ও ভাতে দুভাবেই মরতে হবে। সুতরাং সাধু সাবধান!

 

About Post Author