Home » লেত্রঁজে : আলব্যার কাম্যু-র চেনা পৃথিবীর অচেনা মানুষ

লেত্রঁজে : আলব্যার কাম্যু-র চেনা পৃথিবীর অচেনা মানুষ

Oplus_131072

অর্ঘ পাত্র সময় কলকাতা , ১০ জানুয়ারি : “There is no love of life without despair of life” (জীবনের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া জীবনের হতাশা নেই)….আলব্যার কাম্যু এভাবেই তাঁর জীবন দর্শন  তুলে ধরেছেন তাঁর লেখা দিয়ে।তাঁর জীবন দর্শন উপলব্ধি  করার চেষ্টা যেন অচেনা মানুষকে চেনার প্রচেষ্টা । তাঁর উপন্যাস লেত্রঁজে যা ইংল্যান্ডে দা আউটসাইডার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে  দ্যা স্ট্রেঞ্জর নামে ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয় তার গভীরে প্রবেশ করার আগে কিছু চর্চার দরকার পড়ে যায়।

আলব্যার কাম্যুকে এককথায় ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। তিনি ছিলেন একজন ফরাসি দার্শনিক, লেখক, নাট্যকার, সাংবাদিক, বিশ্বযুক্তরাষ্ট্রবাদী ও রাজনৈতিক সক্রিয়তাবাদী। ১৯৫৭ সালে ৪৪ বছর বয়সে, নোবেল ইতিহাসের দ্বিতীয়-কনিষ্ঠতম প্রাপক হিসেবে, তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর কাজগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল লেত্রঁজে (১৯৪২), ল্য মিৎ দ্য সিজিফ (১৯৪২), লা পেস্ত (১৯৪৭), লম রেভল্তে (১৯৫১) এবং লা শ্যুৎ (১৯৫৬)। দুর্ঘটনায় খুব অল্প বয়সেই প্রাণ হারান তিনি। তবুও তাঁর লেখা  আমাদের নিয়ে যায় অন্য জগতে যেখানে আমরা দেখি মারসো, যেকিনা কাহিনীর মুখ্য চরিত্র যার আগে-পিছে তখন আর কেউ নেই। সে কেবলমাত্র নিজের কাজ নিয়ে, নিজের তৈরি জগত নিয়ে ব্যাস্ত থাকে। অথচ এধরনের একজন মানুষকেই হৃদয়হীন, উদ্ভট সমাজ নেতিমূলক ভাবে নিস্ক্রিয় হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। পাশাপাশি নানান অপচেষ্টায় সিদ্ধহস্ত মানুষদের ইতিবাচক দৃষ্টিতে সক্রিয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অর্থাৎ যে সমাজ যে ধরনের নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে সে সমাজে সে ধরনের মানুষকে মূল্যায়ন করা হয়। তাই লেত্রঁজে, আউটসাইডার বা স্ট্রেঞ্জার – উপন্যাসে মারসো অচেনা নয়। আলব্যার কাম্যু নিশ্চিতভাবেই অচেনা করে তুলে ধরেন নি তাঁকে। আরও গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করা যাক।

অচেনা বলতে আমরা কি বুঝি? অভিধানের ভাষায়, যা চেনা নয় আমাদের কাছে তাই অচেনা। যদি বলি অচেনা মানুষ যা চেনা! অদ্ভুত লাগছে শুনতে তাই না! অদ্ভুতই লাগার কথা, ইংরেজিতে যাকে বলে অক্সিমোরণ। যার মানে হল, যা পরস্পরের বিপরীত। তাই প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে এই চরিত্র নিজেই নিজের কাছে অচেনা। শুধু এমনটাই নয়, নিজেই নিজের কাছের মানুষের কাছে অচেনা। দর্শনের কথায় যাকে বলে “একজিস্টেন্সিয়ালিজম” বা অস্তিত্ববাদ যা স্বভাবতই অদ্ভুত বলে প্রথমে মনে হতে পারে। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা যায় যা খুবই স্বাভাবিক। যা আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। আমাদের জীবন যেমন সরলরেখায় চলে না, কামুর  মারসো চরিত্রও সরলরেখায় চলেনা। উপন্যাসের শুরুর দিকেই আমরা দেখতে পাই, শুনি তার উচ্চারণ – Mother died today or may be yesterday I don’t know… ” যা স্বাভাবিক ভাবেই পাঠকের মনে সৃষ্টি করে এক গভীর ধোঁয়াশা ও রাগের সমন্বয়। পরবর্তীকালে দর্শনের গভীর তত্ত্বে একে অস্তিত্ববাদের এক নিদর্শন বলা যেতে পারে। এবার আসা যাক ইতিহাসের কথায়। সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন, মানুষের মধ্যে সমন্বয় যখন খুবই ভঙ্গুর হয়ে উঠেছিল তখন থেকেই এই দার্শনিক তত্ত্বের প্রকট হওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পাওয়া যায়। দূরত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। শুধু এই সকল কারণ না। আর্থসামাজিক কারণ ও এক বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। সবশেষে এই কথা বলাই যেতে পারে,  মারসো এমন একটি চরিত্র যার কোন কাজই পূর্বপরিকল্পিত নয়।  মারসো ডুবে থাকে নিজের একটি পৃথিবীতে যার সবকিছুই একে অপরের সাথে যুক্ত। তার প্রেমিকা থেকে শুরু করে তার মায়ের মৃত্যু। সবকিছুই যেন একে অপরের সাথে যুক্ত। সে ঘটায় এক হত্যাকাণ্ড। উপন্যাস তুলে দেখায় বাস্তবে হত্যাকাণ্ডের কারণে নয়, মিথ্যার আশ্রয় না নেওয়ার কারনে আদালত ফরাসি জনগনের নামে কোন এক পাবলিক স্কোয়ারে মারসোর শিরোচ্ছেদ করার ঘোষণা দেয়। আদালত খুনের ঘটনার চেয়ে মৃত মায়ের মুখ দেখতে না চাওয়া, শব্দদেহের পাশে বসে সিগারেট খাওয়া এবং মায়ের মৃত্যুতে তার চোখের জল না দেখার মধ্যেই তার অপরাধ খুঁজে নেয়। বিচারের রায় কার্যকর হওয়ার আগে আদালতের নিয়ামানুযায়ী পাদ্রী মারসোকে একগুচ্ছ প্রশ্ন তুলে ধরে ।  পাশাপাশি, পাপের জন্য ক্ষমা চাইতে বলে ঈশ্বরের কাছে। এখানে মারসো অবলীলায় জানায়,  পাপ যে কি সেটাই সে জানেনা তবে সব সময় সে সত্যটাই বলার চেষ্টা করেছে। মারসো  আরও বলে পাপের শাস্তির রায় যখন মানুষই দিয়ে দিয়েছে তখন ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চেয়ে লাভ কি আর? মারসোর মনে হয়, তাকে  বিশ বছর পর তাকে ঠিকই মরতে হত। তাই  দুঃখ পাওয়ার মতো কিছু নেই তার। এভাবেই তার কাজ ইচ্ছের মিশে যায় । আলব্যার কাম্যুর উদ্দেশ্য ছিল এই জীবন এবং আমাদের মহাবিশ্বের অযৌক্তিকতা বা অর্থহীনতার মধ্যে দিয়ে অস্তিত্ববাদকে প্রদর্শন করা। আর সেজন্যই প্রধান চরিত্র মারসো তার নিয়তিকে গ্রহণ করে এবং তার কাজের দায়িত্ব ও ফলশ্রুতি  দিয়ে সে অযৌক্তিকতার সমাধান করে। কম একাকীত্ব বোধ করার জন্য সে চায় যে তার মৃত্যুদণ্ডের দিন অনেক দর্শক থাকুক এবং তারা ঘৃণার চিৎকার দিয়ে অভ্যর্থনা জানাক। মারসোর চিন্তা ও ভাবনা নতুন এক পৃথিবীর দরজা খুলে দেয়, বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক পাঠ হওয়া ফরাসি উপন্যাস লেত্রঁজে- কে স্বতন্ত্র করে তোলে আর পাঠককে অনন্য এক উপলব্ধি উপহার দেয় । এ যেন অচেনার মধ্যে দিয়ে চেনা জীবনকে জানার পাঠ।।

About Post Author