পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, বৈশাখ ১, ১৪৩৩: “এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ/তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি, অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক।” এসেছে বৈশাখ। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিনে বঙ্গে উত্তাপ বাড়ছে তবুও রয়েছে বঙ্গ সংস্কৃতিতে জুড়ে আবহমান সংস্কৃতির সৌরভ। বাংলার ঐতিহ্যের শেকড়ে নেওয়া যাক বাংলার ঘ্রাণ যা ঘিরে থাকে বঙ্গাব্দের আদি ইতিহাস, সংস্কৃতির উদযাপন।
বাংলায় নববর্ষ ও বঙ্গাব্দের ইতিহা
অষ্টাদশ শতকে কবি ভারতচন্দ্র লিখে গেছেন : ” বৈশাখ এদেশে বড় সুখের সময় / সোনা ফলে গাছে মন্দ গন্ধবহ হয় ” অর্থাৎ বৈশাখ বন্দনা বাঙালির মজ্জাগত হয়েছে অন্তত তিনশো বছর ধরে। সন বা অব্দ নিশ্চিত ভাবেই তখন রীতিমত প্রচলিত। হতে পারে আগে নতুন বাংলা সনের সূচনা হত অগ্রহায়ণ মাসে। কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ষোড়শ শতকে লিখেছেন ” অগ্রহায়ণ মাস, ধন্য অগ্রহায়ণ মাস / বিফল জনম তার নাহি যায় চাষ”। তার আগে কি বঙ্গাব্দ চালু ছিল না? অতি প্রাচীন সময়ের কথা পরে হবে।বঙ্গাব্দ বা নববর্ষ নিয়ে চর্চার আগে বলে নেওয়া যাক, বহুদিন ধরেই আমাদের বঙ্গ সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে নববর্ষ উদযাপন।
নববর্ষ ও বঙ্গাব্দ
নববর্ষ সম্বন্ধে আলোচনা করতে হলে মূলত তিনটি বিষয়ে আলোকপাত করা দরকার। কবে থেকে চলছে নববর্ষ উদযাপন? বঙ্গাব্দ কার হাত ধরে কখন প্রচলিত হয়েছিল, কে এর প্রচলন করেন ? বাংলা সনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে চলে আসবে বাংলা মাসের উদ্ভব নিয়ে চর্চা । সর্বোপরি নববর্ষ উদযাপন ও ঐতিহ্যর পালনের বিভিন্ন দিক কী কী? এনিয়ে কোনো সন্দেহ নিয়ে বঙ্গাব্দের প্রচলন নিয়ে চৰ্চা করেই নববর্ষ উদযাপনের আলোচনায় ঢোকা নিয়মানুগ ও ক্রম অনুসারী হতে পারত। কিন্ত বাস্তবে বিষয়টি হল বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন কে প্রচলন করেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকরা শতধাবিভক্ত। শতভাগে বিভক্ত না হলেও অন্তত পাঁচটি মত অত্যন্ত প্রকট। তাই এ চৰ্চা পরে।
নববর্ষ উদযাপনের সূচনা
আধুনিক সময়ে ঘটা করে নববর্ষের সর্বজনীন উদযাপনের সংবাদ মেলে প্রথম ১৯১৭ সালে। তখন চলছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৪ থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ তখন কয়েক বছর গড়িয়েছে। আর ব্রিটিশ তথা মিত্রশক্তির বিজয় কামনায় পহেলা বৈশাখ দিনটিতে নববর্ষ উদযাপন করা হয়। তবে অনেক আগে থেকেই পূন্যাহ বঙ্গে উদযাপন হত। বছরের শেষ দিনে রাজস্ব আদায় করা হত এবং ঠিক তার পরের দিনই চাষীদের ভুস্বামীরা মিষ্টি মুখ করাতেন। এভাবেই পালন করা হত নতুন বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। বঙ্গে মুর্শিদকুলি খাঁ-র সময় থেকেই এই রীতি চালু হয়। আজও সেই পথ ধরেই চালু আছে হালখাতার খাওয়া দাওয়া। অন্যদিকে, ভারতের পূর্বাঞ্চল জুড়ে নববর্ষ পালন হয় বিক্রমাব্দ বা বিক্রমীদিনপঞ্জি মেনে। এই বর্ষপঞ্জি যে শুরু হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৫৭ অব্দে, তাই বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ধারা ও চর্চা ভিন্ন।
বঙ্গাব্দের প্রচলন
এবার জানা দরকার, বঙ্গাব্দের প্রচলন কবে। এনিয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। তবে মোটের ওপরে ৫৯৩ বা ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ বা এপ্রিলে শুরু হয়েছিল বঙ্গাব্দের প্রচলন। বঙ্গাব্দের উদ্ভাবক হিসাবে অন্তত চারজন বা পাঁচজন রাজা, নবাব বা সম্রাটের নাম পাওয়া যায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটি নাম রাজা শশাঙ্ক এবং মোঘল সম্রাট মহামতি আকবর। এছাড়াও একাধিক নাম বঙ্গাব্দের প্রচলনকারী হিসেবে উঠে আসে। ফলে ঐতিহাসিক তথ্যের ঘনঘটায় কিঞ্চিত বিভ্রান্ত হতে হয়। কারণ প্রথম নামটি শ্রঙশণ নামে জনৈক তিব্বতী রাজার। কথিত আছে, ৬০০ খ্রিস্টাব্দের সামান্য কিছু আগে বঙ্গ আক্রমণ করেন শ্রঙসণ এবং মধ্য ও পূর্ব ভারতের বেশ কিছু অংশ জয় করেন। তিনি নাকি বাংলা সনের প্রচলন করেন। তাঁর নামের সঙ্গে কেন জড়িয়ে গেল বঙ্গাব্দ? এর একটি অনৈতিহাসিক যুক্তি রাজার নামের সঙ্গে সনের শব্দ মিল। অন্য যুক্তি এত সহজে খারিজ করা যায় না। ফ্রান্সের বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও প্রাচ্যবিদ সিলভা লেভি তাঁর লে নেপাল গ্রন্থে ১৯০৫ সালে লিখেছেন শ্রঙসন পূর্ব ভারতের বিজয় পর্বের পরেই বঙ্গাব্দের প্রচলন করে বাংলা সন কথাটি রাখতে শুরু করেন। অবশ্যই এ যুক্তির বিরোধ করে ঐতিহাসিকরা বলেছেন শ্রঙসন আদৌ পূর্ব ভারত জয় করেছিলেন কিনা এবং কবে জয় করেছিলেন, তার কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। বাস্তবে ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, শ্রঙশনের যে সময়কাল সেই সময় তিব্বতের পরাক্রমশীল নৃপতি ছিলেন সংসটেন গাম্বো যার রাজত্বকাল সপ্তম শতকের শুরুর দিকে। বঙ্গাব্দ প্রচলনের তথ্যনিয়ে চর্চায় এর পরের নামটি সুলতান হোসেন শাহের। পুঁথি গবেষক যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য নিশ্চিতভাবে এই তথ্য উপনীত হয়েছেন, সুলতান হোসেন শাহ-এর সময় বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন চালু হয়। এজন্য কিছু যুক্তি তিনি পেশ করলেও সন তারিখে কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে। হোসেন শহর রাজত্বকাল পঞ্চদশ শতকের গোড়া থেকে ষোড়শ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত। আবার একই সঙ্গে উঠে আসে হোসেন শাহের পুত্র নসরৎ শাহের নাম, যিনি নসরাত শাহী সন প্রচলন করেছিলেন। আর তার প্রচলন করা নসরৎ শাহী অব্দের সঙ্গে বঙ্গাব্দের সামান্য সময়ের হেরফের রয়েছে। তবে মোঘল সম্রাট আকবরকে অবশ্যই বিভিন্ন বঙ্গাব্দের প্রবর্তনকারী হিসেবে মানেন। মহামতি আকবরের রাজত্বকাল ছিল ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। অনেক পুঁথিতেই বঙ্গাব্দকে যাবনি বৎসর বলে অভিহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ মুসলমান মহারাজ বঙ্গাব্দের প্রচলন করেছেন এমনটাই ধারণা করা অমূলক নয়। অমর্ত্য সেন ও মনে করেন বঙ্গাব্দ প্রচলন হয়েছিল আকবরের সময়কালে। আবুল ফজলের মতে, আমির ফয়জুল্লাহ সিরাজির প্রচেষ্টায় বঙ্গাব্দের প্রচলন হয়। সন ও সাল দুটি আরবি – ফারসি শব্দ। সর্বোপরি আকবরের হয়ে যে যুক্তিটি পেশ করা যায়, ফসল কাটার পরে খাজনা আদায়ের সাম্যতা আনতে সম্রাট আকবর ফসলি সনের প্রবর্তন করেন। হিজরী সনের ক্ষেত্রে চান্দ্রমাস থাকায় ৩৫৪ দিনের হিসেবে ফসল ফলনের সময় মিলত না। আর এইজন্যই আকবরের প্রচেষ্টায় ১৫৮৪ সালের মার্চ মাস (মতান্তরে ১৫৮৬ সালে) বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে গণনা পদ্ধতি যখনই কার্যকর করা হোক, এই গণনা পদ্ধতি কার্যকরী করার সময়কাল ধরা হয় ৫ই নভেম্বর ১৫৫৬। ওই দিনই সম্রাট আকবর সিংহাসনে বসেন। ঐতিহাসিকরা বলেন, প্রথমের নাম ছিল ফসলি সন। পরে বঙ্গাব্দ নামটি চলে আসে। তবুও সন তারিখের কিসে ঐতিহাসিকরা মিলিয়ে দেখালেও জটিলতা থেকেই যায়। ফলে আরেকটি সূত্রের সন্ধান চলছিল। সন তারিখের ব্যবধান নিয়ে অংকের হিসাবে জটিলতা দূর হয় যখন সর্বশেষে রাজা শশাঙ্কের নাম উঠে আসে । ঐতিহাসিক সুনীল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় শশাঙ্ককে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ই এপ্রিল ছিল পহেলা বৈশাখ। ঐদিনই গৌড়বঙ্গের সামন্ত রাজা শশাঙ্ক নিজেকে স্বাধীন রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং বঙ্গাব্দের সূত্রপাত সেদিন থেকেই। নৃতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসিক অতুল সুরের মত, অনেকেই এই মতের সমর্থক। যদি সত্যিই এই তারিখে শশাঙ্ক নিজেকে স্বাধীন রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন তাহলে বলতেই হবে এরচেয়ে অকাট্য যুক্তি আর নেই। বঙ্গাব্দের সঙ্গে শশাঙ্কের সম্পর্কে উল্লেখ করা সন তারিখ সঠিক সাল তারিখ মিলে যাচ্ছে। ব্রতীন্দ্র মুখোপাধ্যায় এখানে আপত্তির কথা তুলছেন ও বলেছেন, এই ঐতিহাসিক সন তারিখের কোনও প্রামাণ্য নথি নেই। কিন্তু বাস্তব হচ্ছে, ষষ্ঠ শতকের শেষ ভাগ থেকে সপ্তম শতকের সূচনা পর্যন্ত শশাঙ্কের রাজত্বকালের সুনিশ্চিত সময়সীমা পাওয়া যায়। খ্রিস্টাব্দের সঙ্গে বঙ্গাব্দের ফারাক ৫৯৪ বছরের। সেক্ষেত্রে শশাঙ্ককে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসেবে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার উপায় নেই। এক্ষেত্রে একটি বিষয় বলার, বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসেবে আকবরের স্বপক্ষে যতই যা বলার থাকুক, আকবরের সময়ের বহু আগে থেকে বিভিন্ন মন্দিরে বঙ্গাব্দের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। ফলে আপাতদৃষ্টিতে অনেক ঐতিহাসিক মেনে নিচ্ছেন সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হলেও শশাঙ্ক বঙ্গাব্দের প্রবর্তক।তবুও এর বিপক্ষে প্রচুর মত রয়েছে।শশাঙ্ক না আকবর – নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই। বঙ্গাব্দের প্রচলন নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যায়। তবে ধোঁয়াশা থাকেনা বঙ্গাব্দের মাসগুলির নাম নিয়ে। এবং এখানেই উল্লেখ করা দরকার, হিজরি অব্দের মাসগুলির নামের সঙ্গে বঙ্গাব্দের মাসগুলির নামের কোনও মিল নেই। এবং আমরা দেখতে পাই, জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে বাংলা মাসের নামকরণ হয়েছে একেকটি নক্ষত্রের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে। যেমন বিশাখা নক্ষত্র থেকে নাম হয়েছে বৈশাখ, শ্রাবন মাসের নাম হয়েছে শ্রবণা নক্ষত্র থেকে, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন প্রভৃতি।

নববর্ষের ঐতিহ্য
নববর্ষের ঐতিহ্য নিয়ে সবশেষে,যে বিষয়টি আলোচনা করা দরকার তা নববর্ষ উদযাপনের বিভিন্ন দিক, ঐতিহ্য ও ধারা নিয়ে। ঋতুভিত্তিক সময়পঞ্জির পাশাপাশি সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন দিক পরিবর্তন হয়েছে নববর্ষের। এখন আর পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বছরের প্রথম দিন গণ্য না হয়ে রাত বারোটার সময় থেকে গণ্য হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই দিনটিকে “মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দিবস” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মিশ্র সংস্কৃতির ইতিহাস এসে বঙ্গের ঐতিহ্যর মধ্যে লীন হয়েছে বঙ্গাব্দের সূচনা লগ্ন, নববর্ষে প্রথম দিনে। এদিন বার পুজো হয় বাংলার বিভিন্ন ক্লাবে। বেশভূষা বা খাদ্য বা ঈশ্বর বন্দনা মিশে থাকে সাধারণ মানুষের গৃহ থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। পুরনো মলিনতাকে বিদায় দিয়ে বাঙালির আশায় বুক বেঁধে নতুনকে বরণ করার দিন নববর্ষ। নতুনত্বের মধ্যেও শাশ্বত উদযাপন ।।


More Stories
চিকিৎসকের বঙ্গসংস্কৃতির উদযাপন নববর্ষে
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
বেজি কি সাপের বিষে কাবু হয় না?