Home » প্রিন্সেস ডায়ানা ও তাঁর প্রেমিকেরা

প্রিন্সেস ডায়ানা ও তাঁর প্রেমিকেরা

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :  উনিশশো সাতানব্বই সালের আগস্ট মাসের শেষদিন। ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে বারোটা। দুরন্ত গতিতে ছুটে যাওয়া মার্সিডিস এস-২৮০ ব্র্যান্ডের একটি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্যারিসের অ্যালমা ব্রিজের নিচে টানেলের পিলারে সজোরে আঘাত হানল।সে গাড়িতেই ছিলেন তর্কাতীতভাবে গত শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত ব্রিটিশ রাজবধূ প্রিন্সেস ডায়ানা বা লেডি ডায়ানা । ছিলেন ডায়ানার দেহরক্ষী ট্রেভর জেনিস।সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একমাত্র ট্রেভর জেনিস ছাড়া কেউ প্রাণে বাঁচেনি। গাড়ির চালক হেনরি পল ও দোদি ফায়েদ ও ওই দুর্ঘটনায় মারা যান।লেডি ডায়ানা ও তাঁর
তদন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী ধারণা করা যায় গাড়ির পেছন পেছন ধাওয়া করা নাছোড়বান্দা পাপারাজ্জিদের ( বিশেষ আলোকচিত্রী )পেছনে ফেলার জন্যই গাড়িচালক দ্রুতগতিতে গাড়ি চালান এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু আজো রহস্যাবৃত রয়ে গেছে প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যু। প্রশ্ন থেকেই গিয়েছে এ এক নিছক দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড? গাড়িচালককে দায়ী করা হয় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর জন্য। কিন্তু ডায়ানা এবং দোদি ফায়েদ কারুরই কেন সিটবেল্ট বাঁধা ছিলো না? সিটবেল্ট বাঁধা থাকলে অন্তত ডায়ানা বেঁচে যেতে পারতেন। গুজব ছড়িয়েছিলো ডায়ানা হয়তো অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। গুজব এও রটে,তার প্রেমিক দোদি ফায়েদের সন্তান ছিল ডায়ানার গর্ভে। তবে কি ইংল্যান্ডের রাজপরিবার কর্তৃক-ই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে?

ফ্রান্স সুইজারল্যান্ড সীমান্তের আল্পস পর্বতের মতোই তুষার ঢাকা ধূসর কুয়াশার মতোই রহস্যে মাখা এ প্রশ্নের জবাব আজো সবার অজানা।আজও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মনে প্রিন্সেস ডায়ানা এক অসামান্য মানবী হিসেবে বেঁচে আছেন।  কেন এই অনন্ত কৌতূহল সবার লেডি ডায়ানাকে ঘিরে? কেন পৃথিবীব্যাপী বহু মানুষ লেডি ডায়নাকে নিজেদের আপন ভেবেছেন? লেডি ডায়ানার রূপমাধুরী নাকি তাঁর জীবনযাত্রা নাকি তাঁর বহুচর্চিত একাধিক প্রেম ডায়নাকে তুলে এনেছিল খ্যাতির আলোয় যার ফলে খ্যাতি ছাড়া বিতর্ক রয়ে গেছে ডায়নার জীবন এবং মৃত্যু ঘিরে? প্রশ্নের জট রয়েই যায়।


ডায়ানা ফ্রানসিস স্পেন্সারের  জন্ম ১৯৬১ সালের ১ জুলাই। ডায়ানার জন্ম ব্রিটিশ এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। ডায়ানা বেড়ে উঠে সানড্রিনঘাম প্রদেশের পার্ক হাউসে। লেডি ডায়না তার শিক্ষাজীবন কাটান ইংল্যান্ড এবং সুইজারল্যান্ডে। ডায়নার বিয়ে যেমন রূপকথার বিয়ে বলে বর্ণিত ছিল, বিবাহ পরবর্তী জীবনে আমৃত্যু জনপ্রিয় ডায়নাকে নিয়ে মানুষের মধ্যে ছিল কৌতূহল ও চৰ্চা।

বিবাহিত জীবন ছাড়াও অন্তত তিনজন পুরুষের বিবাহ বহির্ভূত বা বিবাহ বিচ্ছেদ পরবর্তী সময়কালীন গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন ডায়না। মৃত্যুর আগে তাঁর সম্পর্ক গভীরতায় গড়ায় দোদি ফায়েদের সঙ্গে।অপর অন্তত যে দুই পুরুষের সঙ্গে ডায়নার মেলামেশা ছিল গভীর তাঁদের অন্যতম ছিলেন জেমস হেউইট।

ডায়ানার সঙ্গে চার্লসের প্রথম দেখা হয় ১৯৭৭ সালে। তখন ডায়ানার বয়স মাত্র ১৬ বছর। তখন প্রিন্স চার্লস ডায়ানার বড় বোন লেডি সারাহ’র সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে । কিছুদিন পরেই গ্রীষ্মের অবকাশে সপ্তাহ- শেষে চার্লস ডায়নার সান্নিধ্যে আসেন। দেখাতেই চার্লস ডায়ানাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। ডায়ানাকেই রাজপরিবারের রাজবধূ বরণ করার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেন। চার্লসের এই ভালো লাগার পরিণতিই বোধহয় ডায়ানাকে এনে দেয় হাজার হাজার মানুষের ভালোবাসা।

ডায়না ও প্রিন্স চার্লস  সম্পর্কটা আরো কিছুটা পরিণত হয় এক জলযাত্রা ভ্রমণে। এর কিছুদিন পরই এক আমন্ত্রণ পত্র পেয়ে রাজপরিবারে যান ডায়ানা। সময়টা তখন ১৯৮০ সালের নভেম্বর মাস। লেডি ডায়ানাকে আন্তরিকভাবে অভিবাদন জানান কুইন এবং দ্য ডিউক অব এডিনবার্গ।
পরবর্তীকালে প্রিন্স চার্লস ডায়ানাকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার কিছুদিন পরই জনচক্ষুর আড়ালে বাগদান হয় ডায়ানা-চার্লসের।অতঃপর ২২ বছর বয়সী ডায়ানার বিয়ে হয়ে যায় প্রিন্স অব ওয়েলস চার্লসের সঙ্গে।
প্রিন্স চার্লস ও ডায়ানার বিয়ে রূপকথার বিয়ে বলেই বর্ণিত । বিশ্বের প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন দর্শক এটি টেলিভিশনে উপভোগ করেন এবং ৬০০,০০০ দর্শক রাস্তায় নেমে আসেন প্রিন্স এবং প্রিন্সেসকে এক নজর দেখার জন্য।

চার্লস-ডায়না বিবাহিত জীবনের শুরুর মিষ্টি দিনগুলো কাটে কেসিংটন প্যালেস এবং হাইগ্রোড হাউসে। প্রিন্সেস ডায়ানার প্রথম গর্ভধারনের কথা প্রকাশ হয় ১৯৮১ সালের ৫ নভেম্বর। ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে গর্ভধারণের ঠিক ১২ সপ্তাহের মাথায় ডায়ানা নিজ বাসস্থানের সিঁড়ি থেকে পড়ে যান। এতে ডায়ানা প্রচণ্ড আঘাত পেলেও ভ্রূণ ছিল অক্ষত । তবে পরবর্তীতে ডায়ানা স্বীকার করেন তিনি এই কাজটা স্বেচ্ছাকৃত ভাবে করেছিলেন। কারণ হিসেবে জানা যায় ডায়ানা নিজে ওই সময়টায় খানিকটা উপেক্ষিত অনুভব করছিলেন এই সত্যি প্রমাণের জন্যই তিনি কাজটি করেছেন।
ডায়ানা ছিলেন এমন অদ্ভুত এবং খানিকটা একগুঁয়ে স্বভাবের একজন মানুষ। নিজেকে অবহেলার পাত্র হিসেবে মেনে নিতে পারতেন না কখনই।ডায়ানার আধুনিকতা আজো সারা বিশ্ব জুড়ে অসংখ্য মানুষের মুগ্ধতা। অত্যন্ত আধুনিক এই রাজবধূ ছিলেন সেসময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয়। এমনকি ডায়ানার জনপ্রিয়তায় ছাড়িয়ে যান প্রিন্স চার্লসকে । ডায়ানা জনপ্রিয়তার উৎস ছিলেন সাধারণ মানুষ,যাদের কাছে গেলে ডায়ানা তাদের সঙ্গে মিশে যেতেন সহজে। এই সহজ সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা ডায়ানাকে বিখ্যাত করে তুলেছিল পৃথিবীব্যাপী।

৮২ সালের ২১ জুন চার্লস-ডায়ানার প্রথম সন্তান প্রিন্স উইলিয়ামের জন্ম হয়। এর দুবছর পর জন্ম হয় প্রিন্স হ্যারির, ১৯৮৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। কিন্তু চার্লস বরাবরই ডায়ানার কাছে একটা রাজকন্যা চাইতেন । কিন্তু ডায়ানা ততদিনে জেনে যান তার গর্ভের সন্তান উইলিয়ামের মতই আরো একটি ছেলে সন্তান। তবে ডায়ানা এ সম্বন্ধে রাজপরিবারের কাউকে কিছু জানাননি। এমনকি প্রিন্স অব ওয়েলসকেও না। পরবর্তীতে হ্যারির জন্ম চার্লসকে খুব একটা সুখকর অনুভূতি দেয়নি। ডায়ানার অটোগ্রাফিতে ডায়ানা বলেছিলেন, ‘‘চার্লস হ্যারিকে দেখে শুকনো মুখে বলছিল ও একদম তোমার মত দেখতে হয়েছে। এমনকি ওর সোনালি চুল ও।’’ বিষয়টি ছিল ইঙ্গিতবাহী।

নিশ্চিতভাবেই এসময় একটি মিথ্যে গুজব ছড়িয়েছিল ডায়ানাকে নিয়ে। হ্যারি ডায়ানা-জেমস হেয়ুইতের ছেলে বলে ভাবছিল অনেকে। তবে কিছুদিন পর অনেক তথ্য অনুযায়ী জানা যায় ডায়ানা-হেয়ুইতের প্রেম হয়েছিল হ্যারির জন্মের বেশকিছু দিন পরে।ডায়ানার কাছে ডায়ানের সন্তানদের চাইতে প্রিয় কিছু ছিল না। তিনি তার সময়ের বেশিরভাগ সময়টুকুই দিতেন তার দুই ছেলেকে। ডায়ানা বলতেন, ‘‘আমি আমার সবটুকু দুঃখ, একাকীত্ব ভুলে থাকতাম আমার সন্তানদের দিকে তাকিয়ে।”বিয়ের ৫ বছরের মাথায় চার্লস ডায়ানা দম্পতির মতের অসামঞ্জস্যতা ও ১৩ বছর বয়সের পার্থক্যের অমিল খুব প্রকটভাবে দেখা দিতে থাকল। ওই সময়টাতেই চার্লস তার সাবেক প্রেমিকা ক্যামিলা পারকারের সঙ্গে প্রেম শুরু করেন। এবং পরবর্তীতে ডায়ানাও জেমস হেয়ুইতের সঙ্গে প্রেমে জড়ান।ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রাক্তন ক্যাভালরি অফিসার হেউইট ছিলেন রাজপরিবারের রাইডিং অফিসার। যুবরানির সঙ্গে সম্পর্কের কথা তিনি নিজেও স্বীকার করেছিলেন।

আরেকটি সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন উঠেছিল । শিল্পসামগ্রীর ডিলার প্রয়াত অলিভার হোয়ারের সঙ্গেও ডায়ানার প্রেম নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়। তবে এই সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে ডায়ানার দাবি ছিল, অলিভার আর তিনি ছিলেন শুধুই ভাল বন্ধু।

উল্লেখ্য,১৯৯৬ সালের ২৮ আগস্ট প্রিন্সেস ডায়ানা এবং প্রিন্স চার্লসের সরকারি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে । তথাপি আলোচনা থেকে তবু ছিটকে যাননি এই আধুনিক রাজবধূ। আজও তাঁকে নিয়ে আগ্রহের ছিটেফোঁটা কমেনি ভক্তদের।

যুবরানী ডায়নার আরেকটি প্রেমঘটিত সম্পর্ক ইতিমধ্যে ব্যাপ্তি পায়।চিকিৎসক ও কার্ডিয়াক সার্জেন হাসনাত খানের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন ডায়না। যুবরানি ডায়ানার প্রাক্তন বাটলার, পল বারেল জানাচ্ছেন, ধনকুবের ডোডি আল ফায়েদ হয়তো তাঁর মালকিনের যাবতীয় পার্থিব চাহিদা পূরণ করতে পারতেন, কিন্তু এ কথা সন্দেহাতীত যে কার্ডিয়াক সার্জন হাসনাত খান-ই ছিলেন ডায়ানার ‘লাভ অফ দ্য লাইফ’। ডোডি’র অগাধ পয়সা ছিল, এবং ডায়ানাকে তিনি রানির চোখেই দেখতেন। ‘লেটস গো টু ডিনার’ বলে প্রাইভেট জেটে ডায়ানাকে নিয়ে সোজা প্যারিস উড়ে এসে রিটজ-এর মতো সেরা হোটেলে পার্টি– এসব কোনো ব্যাপার ছিলোনা ডোডির কাছে। কিন্তু এত করেও, ডোডি হয়তো ডায়ানার মনের তল পাননি। প্রিন্সেসের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা স্পষ্টই মনে করেন, অকালে দুর্ঘটনায় প্রাণ না হারালে, ডোডির সাথেও ডায়ানার সম্পর্ক বেশিদিন টিকত না, আর ডোডিকে তিনি বিয়েও করতেন না।

ব্রিটিশ পাকিস্তানী চিকিৎসক হাসনাত চিরকালই ডায়নার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছেন। ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবি-তে ডায়ানার পারলৌকিক ক্রিয়ায় হাসনাত উপস্থিত ছিলেন, এবং ২০০৮ সালে জাস্টিস স্কট বেকারকে দেওয়া এক লিখিত বিবৃতিতে হাসনাত স্বীকারও করে নেন তাঁদের সম্পর্কের কথা। পাশাপাশি হাসনাত এটাও জানান যে, বিয়ে সংক্রান্ত কথাবার্তা তাদের মধ্যে হয়েছিল ঠিকই,যদিও, ঠিক কী কারণে তাঁদের সম্পর্কটা ভেঙে গেল, এটা নিয়ে হাসনাত কখনও গণমাধ্যমে মুখ খোলেননি। ডায়ানা ও তিনি, একে অপরের জীবনে ঠিক কতটা পরিপূরক ছিলেন সেই সম্পর্কে কোনও গল্প চাউর হোক এটা হাসনাত চাননি কখনওই। প্রচারবিমুখতা ও পারস্পরিক সম্মানের দৃষ্টান্ত রেখেই ডায়ানার মৃত্যু-পরবর্তী তদন্ত যখন জোরকদমে চলছে, হাসনাত নিজের প্র্যাকটিস ছেড়ে কিছুদিনের জন্য পাকিস্তান চলে যান। যদিও হাসনাত খান নাকি পরিবারের কাছে বলেছিলেন, যে তিনি ও ডায়ানা দু’জনে দুটো আলাদা গ্রহের, তাদের বিয়ে হলেও সেটা বছরখানেকের বেশি টিকত না। হাসনাত একান্ত আলাপচারিতায় স্বীকার করেছেন যে ডায়ানার সাথে ওই দু’বছরের প্রেম, এখনও তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রভাব ফেলেছিল।হাসনাত খানের মতে,‘দিনের শেষে ডায়ানা আমার কাছে একজন সাধারণ মানুষই, যার অনেক অসাধারণ গুণ আছে আবার কিছু কু-অভ্যেসও আছে।” মানুষ যেমনটা হয়, সব কিছু মিলিয়েই বলেছেন তিনি।

আজও নিত্যনতুন  তথ্য মিলছে প্রিন্সেস ডায়ানা ও তাঁর তথাকথিত প্রেমিকদের নিয়ে।লেডি ডায়ানার জীবন ও মৃত্যু নিয়ে রয়েছে অজস্র কাহিনী। তাঁর দুর্ঘটনা নিয়ে চলেছে বহু কাটাছেঁড়া। প্রাক্তন ব্রিটিশ যুবরানী ডায়ানার মৃত্যু রহস্য আজও অজানা তথাপি তাঁর মৃত্যু রহস্যের মধ্যে কোনওভাবেই হারিয়ে যায় না প্রিন্সেস ডায়ানা প্রেমের আখ্যানমালা।।

About Post Author