পুরন্দর চক্রবর্তী সময় কলকাতা :
“..আসলে, কবির শেষ মুহূর্তটি মোটামুটি আনন্দেই কাটলো
মাটিতে পড়ে থাকা ছিন্ন হাতের দিকে তাকিয়ে তিনি বলতে চাইলেন,
বলেছিলুম কিনা, আমার হাত শিকলে বাঁধা থাকবে না!” কবির মৃত্যু, লোরকা স্মরণে,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
তিনি শুধু খ্যাতনামা কবি, নাট্যকার বা থিয়েটার পরিচালক-ই ছিলেন না তিনি যেন ছিলেন ভবিষ্যতদ্রষ্টা।তাঁর খ্যাতি কম নয়, তাঁকে জড়িয়ে রয়েছে বিতর্ক আর তিনি ছিলেন সেই আশ্চর্য শিল্পী যিনি কিনা যেন অভ্রান্ত ভাবে দেখতে পেয়েছিলেন নিজের মৃত্যুকে।তাঁর লেখাই তাঁর প্রমাণ।
ফেদ্রিকো গারসিয়া লোরকার জন্ম ১৮৯৮সালের ৫ জুন।স্পেনের গ্রেনাদায় জন্মেছিলেন তিনি।বাবা কৃষক মা স্কুল শিক্ষিকা।৩৮ বছর বয়সে ঘাতকের গুলিতে তাঁকে খুন হতে হয়েছিল।

একথা বলাবাহুল্য,লোরকার কবিতা যুগোত্তীর্ণ। ১৯২১ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ লিবরো দা পোয়েমাস। এরপরে প্রচুর লিখেছেন তিনি। তিনি বিপ্লব এনেছিলেন স্পেনের চিন্তা ও মননের জগতে।
লোরকার সমসাময়িক তরুণ শিল্পী ও মেধা রূপে পরিচিত মানুষদের সঙ্গে প্রবল বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে যারমধ্যে সালভাদর দালি ও বুনুয়েল ছিলেন উল্লেখযোগ্য। এরমধ্যে চিত্রশিল্পী সালভাদর দালির সাথে লোরকার সম্পর্কটা হয়তো নিছক পেশাগত বন্ধুত্বই ছিল না, লোরকা হয়ে পড়েছিলেন দালির প্রতি প্রণয়াসক্ত। অন্তত সালভাদর দালি পরবর্তীতে তেমনটাই উল্লেখ করেছেন। এলেন বুশকেটের কনভার্সেশন অফ ডালি বইয়ে পাওয়া যায় লোরকাকে নিয়ে ডালির বিশ্লেষণ -“যেমনটা সকলেই জানে সে ছিল সমকামী, আর সে আমার প্রেমে পড়েছিল পাগলের মতো।” দালির বক্তব্য ছিল,লোরকা একাধিকবার তার সাথে শারীরিক সম্পর্কের চেষ্টা করেন এবং দালি তা বিরক্তির সাথে প্রত্যাখ্যান করেন, কেননা তিনি সমকামী ছিলেন না। বলা হয়, নিজের এই সমকামী প্রবণতা নিয়ে বরাবরই লোরকা একধরনের হীনমন্যতায় ভুগতেন। আত্মবিশ্লেষণ করে কবির মনে হতে থাকে সমকামী পুরুষ এবং কবি এই দুরকমের অস্তিত্বের মধ্যে কোথাও তিনি বন্দী।

এরপরে স্পেনের গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই স্বৈরশাসক ফ্র্যাঙ্কোর ফালাঙ্গিস্ত বাহিনীর বিষ নজরে পড়েন লোরকা, যদিও রাজনীতির সাথে সরাসরি তার কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। গুমখুন করা হয় লোরকাকে যার কারণ কারণ নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। তথাপি মনে করা হয় খোলামেলা মতের প্রবক্তা এক শিল্পী হওয়াই লোরকার কাল হয়।বামপন্থী মতাদর্শের সমর্থক ছিলেন খোলামেলাভাবেই।এও মনে করা হয়,ফ্র্যাঙ্কোর বাহিনী যুদ্ধের শুরু থেকেই কবি-লেখকদের বিনাশের পরিকল্পনা করে, তার একটি ধারাবাহিক কার্যক্রম ছিল লোরকাকে হত্যা।
১৯৩৬ সালে লোরকা স্পেনের গৃহযুদ্ধের তিনদিন আগে গ্রেনাদার উদ্দেশ্যে মাদ্রিদ ত্যাগ করেন। সেখানেই তাকে গ্রেফতার করা হয়। ঠিক পরের দিন ১৯শে আগস্ট শহরের বাইরে প্রত্যন্ত পর্বত প্রান্তে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মৃতদেহ আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। বহু খননকার্য হয়েছে তবুও লোরকার মৃতদেহের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তাঁর ফেবল অ্যান্ড রাউন্ড অফ দ্যা থ্রি ফ্রেন্ডস কবিতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ –
“আমি জেনেছি আমাকে খুন করা হয়েছে,
তারা গির্জা, কাফে আর গোরস্তান করল ওলোটপালট
খুলে দেখল মদের পিপে আর আলমারিগুলো,
তিনটে কঙ্কাল ভেঙেচুরে তারা নিয়ে গেল সোনায় বাঁধানো দাঁত
কিন্তু তারা আমাকে পায়নি খুঁজে।
আমাকে পায়নি খুঁজে?
না, তারা আমাকে খুঁজে পায় নি ।”
এই সেই শব্দবন্ধ যা কবি মৃত্যুর বহু আগে লিখে গিয়েছেন। তিনি যেন জানতেন এভাবেই হয়তো চলে যেতে হবে।।


More Stories
হরমুজ প্রণালী, রান্নার গ্যাস ও তেল এবং ভারত -ইরানের সম্পর্ক
যুদ্ধের জাঁতাকলে ভারত
ইতিহাস গড়তে পারল না নেপাল, ইংল্যান্ডের কাছে হার মাত্র ৪ রানে