Home » শিবরাম ও শরৎচন্দ্র : শ্রদ্ধা, মৈত্রী ও মতান্তর

শিবরাম ও শরৎচন্দ্র : শ্রদ্ধা, মৈত্রী ও মতান্তর

(রবিবারের কড়চা)  সময় কলকাতা ডেস্ক :

” ভেলির বিনাশ নাই, ভেলি অবিনাশ ” এই লাইনটি তীব্র শ্লেষপূর্ণ হাসির এক ছোট লিমেরিক। এই শব্দবন্ধের লেখক ছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী। যে সময় এই একটি লাইনটি লিখেছিলেন শিবরাম,সমসাময়িক সাহিত্যিক ও সাহিত্যিক মহলের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা যারা শিবরাম চক্রবর্তীকে চিনতেন তাঁরা লাইনটির অর্থ ধরতে পেরেছিলেন। তাঁরা এই লাইনটিতে তীব্র কষাঘাতের মধ্যে পেয়েছিলেন সাহিত্যরসের সন্ধান। তাঁরা এও বুঝেছিলেন, কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ওপরে শিবরামের ক্ষোভ দূর হওয়ার নয়।অথচ একদা শরৎচন্দ্র ও শিবরামের সম্পর্ক ছিল মধুর। সময়ের সাথে পাল্টে গিয়েছিল সম্পর্কের সমীকরণ।কী ছিল এই লিমেরিকের অন্তর্নিহিত বিষয় আর কী ছিল এই লেখার প্রেক্ষাপট?

ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা ও ভালোবাসা পৃথিবী ঈশ্বর – শিবরাম চক্রবর্তীর দুটি পর্বে লেখা আত্মজীবনীমূলক আলেখ্য। এখানে সন্ধান মেলে অনেক আশ্চর্য মনিমুক্তোর । খোঁজ মেলে তাঁর একসময়ের প্রণম্য ও শ্রদ্ধার মানুষ কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি শিবরামের শ্রদ্ধা বিরাগে রূপান্তরিত হওয়ার তথ্য।

শরৎচন্দ্র তখন খ্যাতির মধ্যগগনে। হাসির রচনায় সিদ্ধহস্ত শিবরাম ছিলেন তাঁর অনুরাগী ভক্ত। শরৎচন্দ্রের কাছে নিজের বইয়ের পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশক জোটার আশায় দু লাইন লিখিয়ে এনেছিলেন শিবরাম। তিনি প্রচন্ড শ্রদ্ধা করতেন শরৎচন্দ্রকে । কথাসাহিত্যেকের লেখা ‘দেনাপাওনা’ কে ষোড়শী হিসেবে নাট্যরূপও দিয়েছিলেন শিবরাম। নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ী নাটকটিকে মঞ্চস্থ করেছিলেন। অসাধারণ মঞ্চ সাফল্য পেয়েছিল নাটকটি। টাকার অভাবে কষ্টে ছিলেন শিবরাম।নাট্যকার হিসেবে টাকার আর্জি জানান নাট্যাচার্যর কাছে অথচ নাটকের বেনিফিট শোয়ের দিন শিশিরকুমারের কাছে টাকা চাইতে গিয়ে শুনলেন নাট্যকারের প্রাপ্য টাকার সম্পূর্ণ একা নিয়ে গেছেন শরৎচন্দ্র। শিবরাম চক্রবর্তী বিয়ে করেন নি তাই শিবরামের টাকার প্রয়োজন থাকতে পারে না, এরকম যুক্তি খাড়া করে শিবরামকে বঞ্চিত করে, কানাকড়ি না দিয়ে,নাট্যকারের প্রাপ্য টাকা নিয়ে যান কথাশিল্পী। এই ক্ষোভ সারাজীবন ছিল শিবরামের।

এই ঘটনা হতাশ করেছিল শিবরামকে। এরই হয়তো ফলশ্রুতি শিবরামের ছড়ার ছন্দে লেখা একটি বিদ্রুপে ভরা লাইন। উল্লেখ্য,শরৎচন্দ্রের স্তাবক ও অনুগত ছিলেন অবিনাশ। অবিনাশ শরৎচন্দ্রের সর্বক্ষণের সঙ্গী এবং শরৎচন্দ্রকে প্রভুর মত মান্য করতেন। আর ভেলি ছিল শরৎচন্দ্রের পোষা কুকুর।ভেলি নামের কুকুরটি মারা গেলে ভেলির শোকগাঁথায় শরৎচন্দ্রের অনুগত অবিনাশকে ভেলির আসন দিয়েছিলেন শিবরাম। তাঁর হয়তো মনে হয়েছিল যারা শরৎচন্দ্রকে কাছের থেকে দেখে,জেনেশুনেও শ্রদ্ধা করবে তাঁদের মর্যাদা ভেলি নামক কুকুরের বেশি হতে পারে না। তাই শিবরামের ‘ভেলি অবিনাশ’ শব্দবন্ধ হয়ে উঠেছিল অমর। ব্যঙ্গ করে সাহিত্যের মাধ্যমে ক্ষোভের প্রকাশ শিবরাম ছাড়া কেই বা করতে পারতেন?

 

About Post Author